রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে সরকার প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর মেয়র পদ নিয়ে আলোচনা ছিল না বললেই চলে। তবে এই দুই সিটির (ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) মেয়র পদ নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ঘোষণা করে আদালত রায় দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই নিয়ে রাজনৈতিক এবং আদালত অঙ্গনে চলছে আলোচনা।
এদিকে মেয়র পদে শপথ নেবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত জানতে বর্তমানে ইশরাক লন্ডনে অবস্থান করছেন। দলীয় সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আরেক নেতা তাবিথ আউয়াল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে বসার জন্য আইনি পদক্ষেপ এগিয়ে নেবেন কি না। সে কারণে তিনিও বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
ইশরাক আদালতের রায় পাওয়ার পর ডিএনসিসির মেয়র পদে তাবিথ আউয়ালকে নিয়ে আলোচনা চলছে সমানতালে। এই সমানতালে আলোচনার কারণও সমান সমান। তা হচ্ছে তারা দুজন একই তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন নগরপিতা হওয়ার জন্য। নির্বাচনে অনিয়মের প্রায় একই অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন তারা। একই দল বিএনপির হাইকমান্ডের দেওয়া নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলা করেছিলেন এই দুই নগর নেতা।
তবে দুজনের হাতে সময়-সুযোগ একই আছে এমন নয়। বরং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে পক্ষে রায় পাওয়া ইশরাককে আগামী ১৫ মের মধ্যে শপথ নিতে হলেও তাবিথ শপথ নেওয়ার জন্য সময় পাবেন ১২ মে পর্যন্ত। অর্থাৎ হাতে সময় ইশরাকের চেয়ে ৩ দিন কম হলেও তার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্নই হয়নি।
প্রসঙ্গত, রাজধানী ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ভোটে পরাজিত হন বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে ভোটে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে তারা মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তা নিষ্পত্তি হয়নি। গত ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর একটি মামলার রায় আসে। রায়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র ঘোষণা করা হয়েছে ইশরাক হোসেনকে। ওই রায়ের আলোকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রজ্ঞাপন জারি হলেই মেয়র পদে শপথ নিতে পারবেন তিনি।
উল্লেখ্য, এর আগে একই প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) মেয়র হয়েছেন দলটির আরেক নেতা শাহাদাত হোসেন। সব মিলে এখন তাবিথ আউয়ালের ভক্ত-অনুসারীরা তাকে মেয়র পদে দেখার আশায় দিন গুনছেন।
যদিও হাতে থাকা স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাকে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এই বিষয়ে তাবিথ আউয়ালের আইনজীবী এ কে এম এহসানুর রহমান গত সপ্তাহে ঈদুল ফিতরের আগে বলেছেন, ‘ঈদের ছুটি শেষেই আমরা আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেব।’
মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনের পর অনিয়মের অভিযোগ তুলে ওই বছর ২ মার্চ নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন তাবিথ আউয়াল। মামলায় অভিযোগ তুলে ধরে নির্বাচনের সামগ্রিক ফল বাতিল চাওয়া হয়। আইনজীবীর অভিযোগ, আদালতের অসহযোগিতার কারণে এতদিন মামলাটি শুনানি হয়নি।
নির্বাচনে সন্তোষজনক-সংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাননি। যারা গেছেন, তারাও সঠিকভাবে ভোট দিতে পারেননি। নির্বাচন কমিশন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ভোট কারচুপি করে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলামকে নির্বাচিত ঘোষণা করে বলেও মামলায় অভিযোগ আনা হয়।
তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা এবং ওই নির্বাচনে মেয়র ঘোষণা হওয়া আতিকুল ইসলামসহ আটজনকে বিবাদী করে ওই মামলা করা হয়।
২০২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে করা তাবিথের মামলা চলার আদেশ দেন হাইকোর্ট। তাবিথ আউয়ালের পক্ষে তখন তার আইনজীবী অনীক আর হক (বর্তমানে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল) বলেছিলেন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এতে ভোট কারচুপির অভিযোগে তাবিথ আউয়াল নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন।
তবে মেয়র আতিকুল ইসলাম (বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে) একটি আবেদন করে বলেন, সেখানে মামলাটি চলতে পারে না। পরে ট্রাইব্যুনাল তাবিথের আবেদনটি খারিজ করে দেন। এর বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন।
হাইকোর্ট শুনানি শেষে বলেছেন, ইভিএমে কারচুপির বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে সিদ্ধান্ত হবে। অবিলম্বে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মামলাটি এখন নিম্ন আদালতে চলমান।
এদিকে ২০২০ সালের ১৩ মে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেন মো. আতিকুল ইসলাম। সেই অনুসারে চলতি বছরের ১২ মে ওই কাউন্সিলের মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হবে। অর্থাৎ ইশরাকের মতো তাবিথও যদি আদালত থেকে মেয়র ঘোষণা পান, তবে তাকে আগামী ১২ মে তারিখের মধ্যেই শপথ নিতে হবে।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আতিকুল ইসলাম এবং শেখ ফজলে নূর তাপস। ওই দিন নবনির্বাচিত কাউন্সিলররাও শপথ নেন।
শপথ গ্রহণ করলেও দায়িত্ব বুঝে নিতে আড়াই মাসের মতো অপেক্ষা করতে হয় নির্বাচিত ঘোষিত দুই মেয়রকে। উত্তর সিটির মেয়র হিসেবে আতিকুল ইসলাম ওই বছর ১৩ মে দায়িত্ব বুঝে নিলেও দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকনের মেয়াদ শেষে নতুন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ১৬ মে দায়িত্ব নেন। ফলে ওই সিটির ৫ বছর পূর্ণ হবে আগামী ১৫ মে। এক কথায় ইশরাককে শপথ নিতে হবে আগামী ১৫ মে তারিখের মধ্যে, আর তাবিথকে শপথ নিতে হবে আগামী ১২ মে তারিখের মধ্যে।
সিফাত/