দেশে গ্যাসের সংকট চলছে। প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় এই সংকট। সংকট নিরসনে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না থাকায় দেশের শিল্প খাতে উৎপাদনও কমতে শুরু করেছে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরাও পড়েছেন বিপাকে। আর আবাসিক এলাকায় গ্যাসসংকটের কারণে রান্নার কাজে ব্যাপক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ কম থাকার পাশাপাশি চুরি ও অপচয়ের কারণে গ্যাসের এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত রবিবার (২০ এপ্রিল) গ্যাস সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৬৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট, ঘাটতি ছিল প্রায় দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দৈনিক ৩২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে লাইন থেকে। এতে এই খাতের বড় আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে।
২০২৪ সালের পেট্রোবাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাস মজুত ৩০ দশমিক ১৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। ১৯ দশমিক ৫ টিসিএফ এরই মধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যবহার অনুযায়ী আগামী ৯-১০ বছর এই মজুত চলবে। সারা দেশে দৈনিক মোট ২ হাজার ৬৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৮৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট ও আমদানি করা এলএনজি থেকে ৮২২ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে মজুত গ্যাস থেকে দৈনিক সাপ্লাই দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে মজুত গ্যাস শেষের দিকে চলে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমদানি ও বিক্রয়মূল্য যৌক্তিক করতে হবে। আর চুরি ও অপচয়ের মাধ্যমে যে সিস্টেম লস হচ্ছে, তা কমিয়ে আনতে হবে। তা না হলে দেশের এই খাত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি শিল্প-বিদ্যুৎসহ নানা খাত হুমকির মুখে পড়বে। বসতবাড়ির অসুবিধাও শেষ হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর পার্শ্ববর্তী সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীতে শিল্প-কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় দৈনিক ১৫ ঘণ্টাও গ্যাস থাকে না। থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। গত শুক্রবার বিমানবন্দর ও খিলক্ষেত এলাকায় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গ্যাস ছিল না। আগে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় গ্যাসসংকট দেখা যেত। এখন রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায় গ্যাসসংকট চলছে। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, আজিমপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় গ্যাসসংকটের কারণে রান্নার কাজে ব্যাপক অসুবিধা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার আওতাধীন ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, কর্ণফুলী, পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির মাধ্যমে আট শ্রেণির গ্রাহকের কাছে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে আটটি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত লোড ৫ হাজার ৩৫৬ এমএমসিএফডি। প্রতিদিন গ্যাসের স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ এমএমসিএফডি। এই চাহিদার বিপরীতে দেশে উৎপাদিত গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ করা হয় গড়ে প্রায় ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার এমএমসিএফডি। প্রতিদিনই ঘাটতি থাকে গড়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের হিসাব বলছে- সরবরাহ করা গ্যাসের ৪২ শতাংশ যায় বিদ্যুতে, ১৯ শতাংশ শিল্পে, ১৮ শতাংশ ক্যাপটিভ পাওয়ারে, ১১ শতাংশ গৃহস্থালিতে, ৫ শতাংশ সারে, ৪ শতাংশ সিএনজিতে এবং ১ শতাংশ বাণিজ্যিক ও চা-বাগানে ব্যবহৃত হয়।
সংশ্লিস্ট তথ্যে জানা গেছে, দেশে একসময় দিনে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো। ২০১৮ সালের পর থেকে উৎপাদন কমতে থাকে। ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকে যায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোয় তেমন জোর দেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদন কমে এখন ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। গত বছরও এটি ২০০ থেকে ২১০ কোটি ঘনফুট ছিল।
তিতাস সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের বর্তমান চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যাপক ঘাটতি আছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। তাই সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে সরবরাহ যাই বাড়ানো হয়- বিভিন্ন মাধ্যমে তা চলে যায় বিদ্যুৎ খাতে। তাই শিল্প ও আবাসিক খাতে উন্নতির তেমন সুযোগ নেই। বর্তমানে আমদানি করা এলএনজি থেকে আসছে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। চুরি ও অপচয় হচ্ছে প্রায় ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ।
গত শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিতাস গ্যাস জানায়, সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক আবাসিক/বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ/লোড বৃদ্ধি বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি কিছু প্রতারক চক্র আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কথা বলে জনগণের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতারক চক্র থেকে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হলো। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানানো হলো।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ গ্যাসের সংকট নিয়ে গতকাল কয়েক দফায় বৈঠক করেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, গ্যাসের সাপ্লাই বাড়লে এ সমস্যাগুলো হবে না। সাপ্লাই না বাড়ালে পূর্ণ সমাধান হবে না।
তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় মজুত ও সরবরাহ মিলিয়ে গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন না হলে সাপ্লাই দেওয়া যাবে না। কিছু অপচয়ের বিরুদ্ধে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি উৎপাদনের কাজও চলমান রয়েছে।’
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসসংকট মোকাবিলায় চলতি বছরে ১৬টি কূপ সংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি কূপের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বেড়েছে। সংকট সমাধানে প্রয়োজনে ৫০টি কূপ খনন ও সংস্কার করতে হবে। তাহলে সমস্যার সমাধান হবে। সে লক্ষ্যে কাজও চলমান রাখা হয়েছে।
গত ২২ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ) কূপ খনন নিয়ে একটি সভা করে। সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন। কূপ খননে গুরুত্ব দিয়ে তিনি সভায় বলেছেন, একদিকে গ্যাসের মজুত কমছে কিন্তু চাহিদা বাড়ছে। বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। তাই তিনি কূপ খনন ও সংস্কারের দিকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। এদিকে কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে তিতাস কর্তৃপক্ষ।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে তেলের সরবরাহ কমাতে হবে। তেলকূপ খনন বাড়িয়ে এলএনজি আমদানি কমালে গ্যাসের ঘাটতি কমে আসবে।’ আমাদের প্রচুর সিস্টেম লস হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তা বন্ধ করতে পারলে আমাদের সংকট কমে আসবে। যেখানে ১৩ শতাংশ লস হচ্ছে, সেখানে ১১ কিংবা ১২ শতাংশ উদ্ধার করা গেলে সংকট কমানো যেতে পারে। এসব পদক্ষেপ না নিলে সমস্যার সমাধান হবে না।’
সিফাত/