তিন চাকার অবৈধ যানের অবাধ বিচরণ রাজশাহীবাসীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগর অথবা উপজেলা কিংবা গ্রামীণ সড়ক, সব খানেই ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা ও ভটভটি সমান তালে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অবৈধ এসব যানের কারণে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। প্রাণ যাচ্ছে মানুষের। পঙ্গু হচ্ছেন অনেকে। জেলাবাসী বলছেন, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় এসব অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এতে তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, কাটাখালী, শিরোইল স্টেশন, বিসিক শিল্পনগরী, পবা, গোদাগাড়ী, বাগমারা, চারঘাটসহ গ্রামীণ রাস্তাগুলোতে ঘুরে এসব অবৈধ যানের অবাধ বিচরণ দেখা গেছে। চালকদের অধিকাংশেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। যানবাহনেরও নেই বৈধ কাগজ। অনেক জায়গায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের যান চালাতে দেখা গেছে। ট্রাফিক আইন অমান্য করে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, রাস্তায় যানজট সৃষ্টিসহ নানা কারণে জনভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, গত এক বছরে রাজশাহী জেলায় ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজসহ (রামেক) বিভিন্ন হাসপাতালে সহস্রাধিক মানুষ ভর্তি হয়েছেন। যাদের বড় একটি অংশই অনিয়ন্ত্রিত গতি ও অবৈধ যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে।
জেলাবাসীর অভিযোগ, নিয়মিত নজরদারি ও আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবেই এমন নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সংকট নিরসনে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা পালনেরও অনুরোধ জানান তারা। পাশাপাশি যথাযথ রোড-সেফটি পরিকল্পনা ও জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়ারও পরামর্শ নগরবাসীর।
নগরের শিরোইল এলাকায় কথা হয় মোখলেছুর রহমান নামে এক পথচারীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ছোট ও ছিমছাম নগরী হিসেবে রাজশাহী দেশব্যাপী প্রশংসিত। নগরীর পাশ দিয়ে বাস চলাচল করায় যানজটও তেমন ছিল না। তবে ইজিবাইক ও রিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ইজিবাইকের ক্ষেত্রে দুটি রং নির্ধারণ করে সকাল-বিকেল ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। আবার, রিকশার ক্ষেত্রে এমন নিয়ম নেই। তাই নগরবাসী যানজটে নাকাল।’
আবদুল লতিফ নামে এক রিকশাচালক বলেন, ‘প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন না থাকলে তো চালকরা যে যার মতো চালাবেনই। ভাড়া বেশি পাওয়া দিয়ে কথা। এখন যে কেউ ইচ্ছে করলেই রিকশা ও অটোরিকশার চালক হতে পারেন। কিছু সিস্টেম চালু করা গেলে আমাদের জন্যও সুবিধা হবে।’
পবা হাইওয়ে থানার ওসি মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘বেলপুকুর থেকে নাটোরের বেলঘরিয়া বাইপাস পর্যন্ত পবা হাইওয়ের আওতায় পড়ে। ওই এলাকায় প্রতিদিন গড়ে এক-দুটি দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এর বাইরেও ছোটখাটো ধাক্কা লাগার মতো ঘটনা ঘটে। মূলত অটোরিকশা, টেম্পু, ভটভটি, নছিমন-করিমনসহ থ্রি-হুইলার গাড়ির কারণেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। তবে আমাদের অভিযান অব্যাহত।’
রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মুখপাত্র) রফিকুল আলম বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত জেলায় ৬৭টি সড়ক দুর্ঘটনা-সম্পর্কিত মামলা হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ৬৭ জন মারা গেছেন, আহত হয়েছেন আরও ১২ জন।’
রাজশাহী মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার নুর আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘বাজার এলাকায় এখন যে পরিমাণে যানজট, সেটা আগে আরও বেশি ছিল। অবৈধ রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান নিয়মিত চলছে। আমি সিটি করপোরেশন ও আরডিএকে বলেছি, তারা যেন আর নতুন করে অনুমোদন না দেয়। পাশাপাশি রিকশাগুলোকেও নির্দিষ্ট রঙের আওতায় আনার জন্য শক্তভাবে বলেছি, তারাও চেষ্টা করছেন। রিকশাগুলো দুটি কালারে হয়ে গেলে যানবাহনের পরিমাণ আরও কমে যাবে।’
চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজটা আমাদের না। এটা সিটি করপোরেশনের দেখার বিষয়, যেহেতু তারা এত পরিমাণে গাড়ির অনুমোদন দেয়। আবার তাদের যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকত, তাহলেও একটা কথা ছিল। আমরা তাদের নিয়ে প্রতি মাসেই কোনো না কোনো প্রোগ্রাম করছি।’
মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘কাগজপত্রহীন রিকশা ও অটোরিকশা জব্দের নির্দেশনা দেওয়া আছে। অভিযান চলছে। পাশাপাশি চালকদের নির্ধারিত কোনো নিয়মের মধ্যে আনা যায় কি না সে বিষয়ে রাসিকের সঙ্গে কথা বলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’