চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিষ্ঠার ১৩৮ বছর চলছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিঅ্যান্ডএফ ও শিপিং এজেন্ট, বেসরকারি ডিপোসহ সব স্টেকহোল্ডারের অবদানে অনেকটাই এগিয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বছর বছর নিজের অবস্থানও ধরে রেখেছে লন্ডনভিত্তিক লয়েডস লিস্টে। কিন্তু বন্দরকে আরও এগিয়ে নিতে কিছু টার্মিনাল এবং প্রকল্প বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিতে চায় সরকার। এ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বন্দর ব্যবহারকারী আর বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।
গত ১৪ মে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রাম সফরে এসে বলেছেন, বিশ্বের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দর অনেক পিছিয়ে। এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর সেরা যারা, তাদের হাতে যেভাবেই হোক বন্দর ব্যবস্থাপনা ছেড়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে মানুষকে এটা বোঝাতে হবে। আর এটা করার জন্য তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে বিডা চেয়ারম্যান ও নৌপরিবহন উপদেষ্টাকে বারবার চট্টগ্রামে পাঠিয়েছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার দায়িত্বে আসা আগের সব চেয়ারম্যান সব সময় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, স্ক্যানার ও ডিজিটালাইজেশনের কারণে বন্দর দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বলে গল্প শুনিয়েছেন। কিন্তু তার পরও কেন বন্দর পরিচালনায় বিদেশি ব্যবস্থাপনার কথা আসছে, কী চায় সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ, কেনই-বা এ নিয়ে চলছে বিক্ষোভ-আন্দোলন-প্রতিবাদ। এসব নিয়েই খবরের কাগজ বন্দর কর্তৃপক্ষ, বন্দর ব্যবহারকারী, বিক্ষোভকারী বিভিন্ন সংগঠন, ব্যবসায়ী এবং কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে কথা বলেছে। সরকারের বহুল আলোচিত এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
এক পক্ষ বলছে, সরকার যেটা ভালো বুঝবে সেটা করবে। বন্দর পরিচালনার ভার যাকেই দেওয়া হোক, তারা চায় কম ব্যয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সুন্দর পরিবেশ। আরেক পক্ষ বলছে, বন্দর নিয়ে যা চলছে, তা নিয়ে তারা যথেষ্ট সন্দিহান। বিদেশিদের দায়িত্ব দেওয়া হলে বন্দরের বিভিন্ন চার্জ বেড়ে যাবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাক কারখানার মালিক বলেন, ‘কী হবে না হবে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। একধরনের ধোঁয়াশা কাজ করছে। তবে সরকার যা-ই করুক, আমরা চাই কম ব্যয় ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা।’
চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী ইমাম মাহমুদ বিলু বলেন, ‘নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। তাহলে সেটা কেন বিদেশিদের হাতে যাবে? এনসিটি তো স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখানে নতুন করে বিনিয়োগের কিছু নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এনসিটি পরিচালনায় এসে কোথায় বিনিয়োগ করবেন? এখানে তো নতুন করে আর বিনিয়োগের সুযোগ নেই। আমরা উদ্বেগ বোধ করছি। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটি সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হলো। দেখা গেল, বন্দরে আমরা যে লেবার চার্জ দিচ্ছি, তার চেয়ে বেশি চার্জ সেখানে আমাদের দিতে হচ্ছে। কাজেই বিদেশি অপারেটরদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা আসলে কতটা সুবিধা পাবেন, আমরা এখনো নিশ্চিত নই। বিষয়টি অস্পষ্ট। এ কারণে আমরা শঙ্কিত।’
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিপক্ষে না। তবে বে-টার্মিনাল, লালদিয়ারচরসহ অন্যান্য নতুন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত নামকরা বিদেশি বিনিয়োগকারী এলে ভালো হয়। এতে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। আমরা নতুন নতুন বন্দর পাব। কারণ জাহাজের ধরনে কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের জেটিগুলো পুরোনো। নতুন বিনিয়োগকারীরা এসে যদি অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে, তাহলে আমাদের দুই ধরনের লাভ হবে। বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে এবং সেই বিনিয়োগ হবে দীর্ঘদেয়াদি। এতে আগামী ৫০ বছরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।’
বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমের সঙ্গে পণ্য পরিবহন খাতও জড়িত। বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান ট্রাক প্রাইমমুভার পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরাও শঙ্কিত ছিলাম। আজ সকালে এ বিষয়ে আমরা একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর তো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। শুধু এনসিটি পরিচালনার ভার দেওয়া হচ্ছে। বন্দরের বর্তমান মানকে উন্নত করতেই এ সিদ্ধান্ত। আর নামকরা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি চক্র এর বিরোধিতা করছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে মনে করে আন্দোলন করছে।’
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার ভার বিদেশিদের না দিতে নিয়মিত প্রতিবাদী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ, গণঅধিকার পরিষদ, জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন সংগঠন।
তারা বলছেন, গত বছর আওয়ামী লীগ সরকার পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার ভার দেয় সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে। এই প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়ে বন্দর বা দেশের কী লাভ হয়েছে? এ ছাড়া একটি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিতে গেলে পরামর্শক নিয়োগ দিতে হয়, তারা প্রতিবেদন দেবে, এরপর কাকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, এসব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করেই চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক, গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে চায় সরকার। এমনকি তা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর পরিচালনার কাজ দিতে যতটা এগিয়েছিল, বর্তমান সরকার বাকিটা এগিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে চরম সন্দেহের জন্ম হয়েছে।
চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা এম এ হাশেম রাজু বলেন, ‘আমরা বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে না। আমরা চাই এই দেশটাকে নতুন করে সাজিয়ে তোলা হোক। কিন্তু বন্দরের এনসিটি টার্মিনালের মাধ্যমে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ হ্যান্ডলিং হচ্ছে। এখানে তো আমাদের সক্ষমতা আছে। তাহলে সক্ষমতার জায়গাগুলো কেন বিদেশিদের দেওয়া হবে? দেশীয় কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তুলতে হবে। যদি বিদেশিদের দিতে হয় তাহলে জুলাইয়ের সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক দল, স্টেকহোল্ডারসহ সবাইকে নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সেটি না করে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না।’
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সিসিটি, এনসিটিসহ অন্যান্য টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমি বহুবার শোকজ পেয়েছি। আমাদের বন্দরকে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য একটি মহল ফ্যাসিস্ট সরকারের আমল থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে সিসিটি, এনসিটিকে কোনো অবস্থাতেই দেশি-বিদেশি কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানকে দিতে আমরা রাজি নই। প্রধান উপদেষ্টাকে প্রতিনিয়ত বন্দর থেকে ভুল তথ্য প্রদান করে এই সিসিটি, এনসিটিকে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বন্দরের এনসিটি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। খরচ হয়েছে সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা। এখানেও যা খরচ হয়নি তার চেয়ে বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। তার পরও আমাদের ৮০০ কোটি টাকা লাভ হয়েছে। এই দুটি টার্মিনালকে তা সত্ত্বেও প্রধান উপদেষ্টার কাছে ‘লস প্রজেক্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর এটা করেছে বন্দরের নিয়োগ করা অডিট ফার্ম মোস্তফা অ্যান্ড কোং। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি, অথচ এই প্রতিষ্ঠানের ২১ জনকে পাস ছাড়াই বন্দরের ভেতর প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে।’
বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের উপপরিচালক লে. কমান্ডার সৈয়দ সাজ্জাদুর রহমানের কাছে বন্দরের ভেতর অবৈধ প্রবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে বন্দর সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, বন্দরের ভেতর পাস ছাড়া কোনো অবস্থাতেই কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। সুতরাং এ অভিযোগটি ভিত্তিহীন।
বন্দরকে বিদেশি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্দর তো নিজের সিদ্ধান্তে কখনো কিছু করতে পারে না। সরকার যে পরামর্শ ও পরিকল্পনা দিয়েছে, বন্দর কর্তৃপক্ষ তা-ই বাস্তবায়ন করে।
এ বিষয়ে জানতে খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ মঈনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেছেন, ‘বিষয়টি আমার পছন্দ না। দেখা যাক তারা কী করতে চায়।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নঈম হাসান আওরঙ্গজেব বলেন, অব্যবস্থাপনা ও দক্ষতার প্রশ্ন যখন আসে, তখনই বিদেশি বিনিয়োগকারী নিয়োগের কথা ওঠে। বন্দরে অনেক অব্যবহৃত সম্পদ পড়ে থাকে। এগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। ফলে এমন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে হবে- যারা অনেক দক্ষ, যাদের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা আছে।
সবাই মিলে বন্দর অচল করে দেব
যত টাকা লাগে দেব, আপত্তি নেই। যা করার করেন, সবাই মিলে বন্দর অচল করে দেব। কথাগুলো চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা’ নামের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের। কথাগুলো বলেছেন বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে যুক্ত প্রভাবশালী অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের মালিক তরফদার রুহুল আমিন এবং বিএনপি নেতা নাজিমের। বিষয়টি গত ১৪ মে চট্টগ্রামে এসে তুলে ধরেন নৌ উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন। তবে বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র বলছেন তরফদার রুহুল আমিন। তিনি বলেছেন, ‘যাদের কথা বলা হয়েছে, ওই লোকগুলোর সঙ্গে আমার গত ছয় মাস কথাই হয় না।’
সিফাত/