রাজধানীজুড়ে তীব্র গ্যাসসংকট চলছে। কয়েক মাস ধরে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় কঠিন বিপাকে পড়েছেন নগরের বাসিন্দারা। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে খেতে হচ্ছে। অথচ সমাধানের কোনো আশ্বাসও দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে শুরু করে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গ্যাস থাকছে না। সন্ধ্যার দিকে গ্যাস এলেও তার চাপ থাকে কম। রান্নাবান্না আর করা যায় না। কিছু সময় থেকে আবার চলে যায়। পরিপূর্ণভাবে গ্যাস আসে রাত ৯টার দিকে। আগে এলাকাভিত্তিক সংকট থাকলেও এখন প্রায় গোটা রাজধানীতেই এই সমস্যা দেখা দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার। একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করেন তিনি। চাকরিজীবী স্বামী, স্কুল পড়ুয়া মেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে তার সংসার। বেলা ২টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতে হয় নাসরিনকে। সকালে স্বামী অফিসে যাওয়ার পথে মেয়েকে স্কুলে দিয়ে যান। তাদের জন্য ঘুম থেকে উঠেই নাসরিনকে চুলার কাছে দৌড়াতে হয়।
শাশুড়িকে নিয়ে ফজরের নামাজের পর পরই তাকে রান্নার কাজ শুরু করতে হয়। সকালের নাশতার পাশাপাশি দুপুরের রান্নাও সেরে নিতে হয়। কারণ সকাল ৭টার পরই গ্যাস থাকে না। তাই উনুনে আর আগুন জ্বলে না। সন্ধ্যার দিকে যখন গ্যাস আসে নাসরিন তখন থাকেন নিজের কর্মস্থলে।
একই অবস্থা মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের বাসিন্দা তাসলিমার। গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে তা দিয়ে রান্না করা যায় না। ফলে সময়মতো খাবার রান্না হয় না বাসায়। বেশির ভাগ সময় তাকে বাইরে থেকে আনা খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
৫ দিন ধরে গ্যাস নেই, তাই ফ্রিজে রাখা ঠাণ্ডা খাবার খেতে হচ্ছে শিরীনা আক্তারের পরিবারকে। রাজধানীর পশ্চিম ধানমন্ডির শংকর জাফরাবাদ এলাকার বাসিন্দা তিনি।
শিরীনা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই এলাকায় সারা দিন গ্যাস থাকে না। লাইনের গ্যাস পাওয়া যায় সন্ধ্যার পর ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে। তা থাকে ভোর ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত। অনেক দিন এই সময়ও ঠিক থাকে না। লাইনের গ্যাসে রান্না করতে হলে রাত জেগে সকাল-দুপুরের খাবার একসঙ্গে রান্না করতে হয়- এটা খুব কষ্টের ও ঝামেলার।’ তিনি বলেন, এমন সংকটের মাঝেই গত তিন দিন ধরে রাতেও একেবারে গ্যাস আসছে না। ফলে রান্নার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে রাইস কুকার ও ইনডাকশন চুলার ওপর। সারা দিনে মাত্র একবার রান্না করে ঠাণ্ডা খাবার খেতে হচ্ছে।
এতদিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, উত্তরা, আজিমপুর, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসসংকটের খবর পাওয়া গেছে। গত চার মাসেরও বেশি সময় ধরে এসব এলাকায় চলছে গ্যাসসংকট। ইদানীং নগরের মগবাজার, ইস্কাটন, গুলশানসহ অনেক অভিজাত এলাকাতেও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে গ্যাসের প্রয়োজন রয়েছে ৩ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ এমএমসিএফডি (মিলিয়ন কিউবিক ফিট পার ডে)। কিন্তু সর্বশেষ দুই দিন গ্যাস পাওয়া গেছে ২ হাজার ৬৫০ এমএমসিএফডি। এর প্রভাব পড়ছে দেশের আবাসিক-শিল্পকলকারখানাসহ সব খাতে।
গত শনিবার গ্যাসের দাবিতে রাস্তায় দাঁড়ায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। এ ছাড়া মুগদা আইডিয়াল স্কুলের সামনে মানববন্ধন করেন স্থানীয়রা। তাদের ব্যানারে লেখা ছিল- ‘গ্যাস নাই-গ্যাস চাই’, ‘গ্যাসসংকট সমাধানে এলাকাবাসীর আবেদন; সংকট সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।’
দেশে পেট্রোবাংলার আওতাধীন ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি যথাক্রমে তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ, কর্ণফুলী, পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির মাধ্যমে আট শ্রেণির গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বিতরণের কাজ করে তিতাস। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের আসলে প্রয়োজনের তুলনায় সাপ্লাই নেই। তাই এত সংকট। কারণ আমাদের যে গ্যাস কোম্পানিগুলো রয়েছে, এর মধ্যে ৬০ শতাংশ গ্যাস তিতাস বিতরণ করে। তাই বাকি কোম্পানির চেয়ে সবার দৃষ্টি তিতাসের দিকে।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু গরম পড়ছে, তাই সরকারের নির্দেশনা মেনে আমাদের আবাসিক এলাকা থেকে কমিয়ে আবার বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস দিতে হচ্ছে। একদিকে সাপ্লাই নেই, অন্যদিকে বিদ্যুতের চাহিদাও মেটাতে হচ্ছে।’