চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ৯ বছর পূর্ণ হলো বুধবার (৫ জুন)। ২০১৬ সালের এই দিনে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় নগরীর জিইসি মোড়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন মিতু।
মিতু হত্যা মামলায় আসামি হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন নিহতের স্বামী বাবুল আকতারসহ পাঁচজন। কিন্তু সরকার পতনের পর থেকে এ মামলার ৯৬ সাক্ষীর মধ্যে কেউই সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেন না। শুধু একজন সাক্ষী গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে আসেন। তাও তিনি সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের এএসপি কামরুজ্জামান।
গত রবিবার চট্টগ্রাম আদালতে বাবুল আকতারের আইনজীবী কফিল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার পতনের পর থেকে ৯৬ সাক্ষীর মধ্যে একজন ছাড়া কেউ আসেন না। অথচ এর আগে পিবিআই সবাইকে হাজির করত। যারা এ মামলা নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিলেন তাদেরও অনেকে পলাতক।
আলোচিত মিতু হত্যা মামলা নিয়ে আরেক সাক্ষী ও পরে আসামি এহতেশামুল হক ভোলা একাধিকবার বক্তব্য দেন।
সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে তিনি সাংবাদিকের বলেন, ‘এটা পুরোটাই পিবিআইয়ের সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদার পরিচালিত নাটক। বাবুল আকতার রিয়াজউদ্দিন বাজারে চোরা স্বর্ণের মার্কেটে অভিযান চালান। এরপর থেকে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের একটি অংশ লেগে যায়। তিনি সৎ, যোগ্য কর্মকর্তা। বনজ বলেছিলেন সেই অভিযান না চালাতে। বাবুল স্যার শোনেননি। এটা প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব।’
তিনি বলেন, ‘আমি ছিলাম খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী। বাবুল স্যারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকায় আমাকেও ফাঁসানো হয়েছে।’ মিতু হত্যা মামলায় বাবুল আকতারের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী করতে তাকে হাত-চোখ বেঁধে ক্রসফায়ারের ভয় দেখানোর কথা উল্লেখ করে ভোলা বলেন, ‘আমার স্ত্রী-সন্তান সবাইকে জিম্মি করেছিল। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার আগে আমার বোন এ বিষয়ে জিডি করে। আমি আদালতকে জানিয়েছি আমাকে জোর করা হয়েছে।’
গত ৪ ডিসেম্বর পুলিশের সাবেক এসপি বাবুল আকতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন। এর আগে ২৭ নভেম্বর হাইকোর্ট তাকে ৬ মাসের অন্তর্বর্তী জামিন দেন। তবে তার শ্বশুর সেই জামিন আবেদন বাতিল চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। আদালত বিষয়টি শুনানির জন্য ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন।
বাবুল আকতারের আইনজীবী কফিল উদ্দিন খবরের কাগজকে রবিবার দুপুরে তার দপ্তরে বলেন, ‘২০১৬ সালের ৫ জুন এসপি বাবুল আকতারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু খুন হন। এ ঘটনায় বাবুল আকতার মামলা করেন। পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। এ সময়ে ৯ জনকে শনাক্ত করা হয়। সেখানে বাবুল আকতারের নাম ছিল না। ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফিউদ্দিন নিজ থেকে একটি আদেশ দেন।
আদেশে বলেন, এই মামলার অগ্রবর্তী রিপোর্ট পরের বছর ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দিতে হবে। ওই সময় মামলাটি তদন্ত করছিলেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এএসপি কামরুজ্জামান।
সূত্র জানায়, পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের নির্দেশে বাবুল আকতারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেনকে চট্টগ্রাম পিবিআইয়ে ডেকে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ১০ মে বাবুল আকতারকে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ঢাকা থেকে ডেকে এনে গ্রেপ্তার করা হয়। ১২ মে তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেনের কাছ থেকে একটি অভিযোগ নেওয়ার পর তার ওপর ভিত্তি করে বাবুলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।’
আইনজীবী আরও বলেন, ‘এ মামলায় ৯৬ সাক্ষীর মধ্যে কোনো সাক্ষীই এখন আসেন না। তার জামিনের পর থেকে ৪টা তারিখ পড়েছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এএসপি কামরুজ্জামান এসেছিলেন। সর্বশেষ তারিখ ছিল ২১ মে। মামলাটি বর্তমানে তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। আদালত পরবর্তী ১৯ জুন শুনানির জন্য দিন ধার্য রেখেছেন’ এ বিষয়ে পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা তো প্রতিবেদন দাখিল করে দিয়েছি। এরপর প্রসিকিউশনের কাজ। আমাদের আর কোনো কাজ নেই।’