অন্তর্বর্তী সরকারের ১০ মাসে অর্থনীতির বহিঃস্থ খাতে স্থিতিশীলতার আভাস দেখা গেছে। ডলারের বাজার আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল। বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরও ডলারের দাম খুব বেশি বাড়েনি। রপ্তানিতে কমবেশি গতি আছে; রেমিট্যান্স বা প্রবাসী-আয়ে স্ফীতি আছে। তবে আমদানি কমে গেছে; কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
অর্থনীতির প্রাণ, অর্থাৎ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি নেই বললেই চলে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র হয়ে যেতে পারেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে বিনিয়োগে গতি আসবে না। অর্থনীতিবিদদের অভিযোগ, সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অর্থনীতিতে সামগ্রিক সংস্কারের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
১৮ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের দায় রেখে গত ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। এরপর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই থেকে অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা দেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
বিভিন্ন সংস্থার হালনাগাদ তথ্য বলছে, দু-একটি বাদে অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক এখনো নিম্নমুখী। সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে মূল্যস্ফীতি। এটি একদিকে মানুষের সঞ্চয়ের টুঁটি চেপে ধরছে, অন্যদিকে ক্রেতার সক্ষমতায় চিড় ধরিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। এতে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। সরকারের রাজস্ব আয়েও বিরাট ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
আবার সরকারের আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংক থেকে ঋণ করার প্রবণতা বাড়ছে, যা কমিয়ে দিচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ঋণ পরিস্থিতিতে চলছে ভাটা।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরকার চিত্র উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। শেয়ারবাজারের পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে আপাতত খুব বেশি সুখবরের আভাস মিলছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বিগত সরকার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল। সেই জায়গা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছে। কিছু জায়গায় সফলতা এসেছে। কিছু জায়গায় আরও অনেক কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এই সরকারের সময়ে সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল করা। এটা না হলে পুরো অর্থনীতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এই সরকার দায়িত্ব নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল করেছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে, ফলে রিজার্ভ স্থিতিশীল রয়েছে। আর একটি বড় সফলতা হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আদানির বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, সেই আশঙ্কাসহ নানা ধরনের সংকট ছিল। তার পরও এই সরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে। বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধিও কিছুটা বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না। আগামীতে কী হবে, সেটাও পরিষ্কার না। বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছিল দেশের ব্যাংকিং খাত। খাতটা ভেঙে পড়বে কি না, সেই আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। তবে সেই খাত এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, আতঙ্ক আর নেই।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে এখনো স্থিতিশীলতা পুরোপুরি আসেনি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো আসছেন না। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজস্ব আদায়েও মনোযোগ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার উদ্যোগ চলছে। এখন দেশ থেকে অর্থ পাচারও অনেকাংশে কমেছে। তবে পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকারকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রপ্তানি আয় বাড়াতে পণ্যবৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। এই বিষয়গুলোতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত সময়েই ঘুরে দাঁড়াবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সার্বিকভাবে শুল্ক ও কর আদায় হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। ১০ মাসে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আলোচ্য সময়ে ঘাটতির পরিমাণ হয়েছে ৭১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
মূল্যস্ফীতি কমছে, তবে ধীরে। আড়াই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির তাপে পুড়ছেন দেশের মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিক এবং দিনমজুরদের এ বিষয়ে ক্ষোভ ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। সেই জায়গা থেকেই তারা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের উচ্ছ্বাস ছিল অন্য রকম। কিন্তু আট মাস পর এসে তাদের মুখে আগের সেই উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতি সুদহার তিন দফায় বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ঋণের সুদহারও বাড়ছে। তার পরও মূল্যস্ফীতির পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানা যাচ্ছে না। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা বাস্তবতায় এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে ঘোরাফেরা করেছে। সম্প্রতি তা ৯ শতাংশে নামলেও খুব বেশি স্থায়ী হবে না বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন বলছে, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে।
আমদানিতে গতি নেই
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশে দীর্ঘদিন ধরে আমদানিতে চলছে কড়াকড়ি ও নানা বিধিনিষেধ। এই সরকারও সেসব বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে নেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) আমদানিতে ঋণপত্র বা এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি দুই-ই কমেছে। এ সময়ে বেশি কমেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি।
বিনিয়োগে স্থবিরতা
একদিকে কমছে আমদানি, অন্যদিকে বাড়ছে ব্যাংকঋণের সুদহার। ফলে নতুন বিনিয়োগে যেতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। এতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও কমে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত মার্চের শেষে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকটি কমে ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশে নেমে গেছে। সেই সঙ্গে লক্ষণীয়ভাবে কমছে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি এ সময় বিদেশি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৯ মাস শেষে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৮৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১৬ কোটি। সেই হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৬ শতাংশ।
ব্যাংকে গ্রাহকের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি
বিগত সরকারের সময়ে প্রভাব বিস্তারকারী সালমান এফ রহমানসহ আরও কয়েকজনের নিয়ন্ত্রণে ছিল বেশ কয়েকটি ব্যাংক। ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা তলানিতে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গ্রাহকের আমানতের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়া হবে। এ জন্য গ্রাহকদের আরও কিছুটা সময় ধৈর্য ধারণ করতে হবে। ১৪টি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইসলামি ধারার ৫টি ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে এসব ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
খেলাপি ঋণের উদ্বেগ কমছে না
ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের চিত্র অর্থনীতিতে ভয়ংকর রকমের উদ্বেগ তৈরি করেছে। লাফিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। কেবল টাকার অঙ্কে নয়, বেড়েছে শতকরা হিসেবেও। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। আগামীতে এই ঋণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।