রাজধানীর উত্তরায় র্যাবের পোশাকে কোটি টাকার বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনাটি সুপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ‘নগদের’ কর্মীদের বিপুল টাকা (১ কোটি ১১ লাখ) নিয়ে যাওয়ার খবরটি কোনোভাবে ছিনতাইকারীদের চক্রটি আগেই জানত। সে অনুসারে ঘটনাস্থলে এক ব্যক্তি আগেই পৌঁছে ‘রেকি’র দায়িত্ব পালন করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কালো রঙের মাইক্রোবাসসহ র্যাবের পোশাক পরিহিত চক্রটি এসে দুর্ধর্ষ ওই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায়।
ওই সময় টাকার ব্যাগসহ তিনজনকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে চক্রটি। যদিও ঘণ্টাখানেক পর ওই তিনজনকে উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরে হাত-পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয়। কিন্তু ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও র্যাব বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুর্ধর্ষ ওই ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আসলে কারা ঘটিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। র্যাবের পোশাকে যেহেতু ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে, এ কারণে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। র্যাবসহ একাধিক সংস্থা এ বিষয়ে তদন্ত করছে। এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় র্যাবের কোনো সদস্যের জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। আমরা প্রযুক্তিগত এবং নানা কৌশলে মাঠে কাজ করছি। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
এদিকে ঘটনার দুজন প্রত্যক্ষদর্শী হলেন, ১২ নম্বর সড়কে গাড়িটি যেখানে দাঁড়িয়েছিল তার পরের বাড়িটির দারোয়ান ইসমাইল হোসেন এবং একই সড়কের ৪৯ নম্বর বাড়ির দারোয়ান কমলা বেগম। গতকাল সোমবার খবরের কাগজের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপকালে ওই ঘটনার বর্ণনা দেন তারা। এ সময় তারা জানান, গত ১৪ জুন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কের মোড় থেকে একটু দূরেই কালো রঙের একটি মাইক্রোবাস এসে দাঁড়ায়। আশপাশের বেশির ভাগ দোকান তখনো বন্ধ। এ সময় পাশের রাস্তা থেকে গাড়ির সামনে এসে পায়চারি করছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি মাঝে মাঝে এদিক-সেদিক দেখছিলেন। মাঝেমধ্যেই ফোনে কিছু একটা করছিলেন। ৮টা ৫২ মিনিটে ওই মাইক্রোবাস থেকে র্যাবের পোশাক পরা কয়েকজন বের হয়। ঠিক তখন দুটি মোটরসাইকেলে ওইদিক দিয়ে কোটি টাকাবোঝাই ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছিলেন ‘নগদের’ চার কর্মী। হঠাৎ তাদের ব্যারিকেড দেয় র্যাবের পোশাকে থাকা দুর্বৃত্তরা। তখন নগদের ওই কর্মীরা চিৎকার করতে থাকেন। তবে পরিস্থিতি এমনভাবে সাজানো হয় যেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরতে র্যাবের অভিযান চলছিল। স্থানীয়রাও কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যাগসহ (টাকার) নগদের তিনজনকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে কালো রঙের সেই মাইক্রোবাস। আর সেই মাইক্রোতেও ওঠে যান পায়চারি করা সেই ব্যক্তি।’
কমলা বেগম বলেন, ‘আমাদের বাড়ির সামনের ফুটপাত দিয়ে একজন লোককে পায়চারি করতে দেখি। কিছুক্ষণ তিনি ফুটপাতেও বসেছিলেন। তার পরনে একটি গেঞ্জি (টি-শার্ট) আর প্যান্ট, মুখে একটা মাস্কও ছিল। কিছুক্ষণ পরপর পকেট থেকে মোবাইল বের করে কথা বলে আবার রেখে দেন। আবার উঠে হাঁটাহাঁটি করেন। আমরা গেটেই বসে দেখছিলাম। তখন কিছু মনে হয়নি।’
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা খবরের কাগজকে বলছেন, ছিনতাইয়ের এ ঘটনাটি সুপরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। কারণ সকালে উত্তরার ওই বাসা থেকে টাকার ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার তথ্য ছিনতাইকারীরা জানত। কেউ তথ্য না দিলে তারা কীভাবে জানবে। আমরা সন্দেহ করছি, নগদের ডিস্ট্রিবিউটিং অফিসের কোনো কর্মী বা কেউ ছিনতাইকারীদের তথ্য দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত কালো রঙের মাইক্রোবাসটির যে রেজিস্ট্রেশন নম্বর সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটি ভুয়া নম্বর ছিল। অপরাধীরা নিজেদের ছিনতাইয়ের কাজেও গাড়ির নম্বর বদল করেও ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। ছিনতাইয়ের এ ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশও তদন্ত করছে। ঘটনার পর গত শনিবার রাতে নগদ ডিস্ট্রিবিউটরের পক্ষ থেকে আবদুর রহমান বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেছেন। ওই মামলায় অজ্ঞাত ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ঘটনায় রাতদিন কাজ করছে পুলিশ। আমরা ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়েছি। তদন্ত চলছে, তবে এখনো কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’
নগদের কেউ জড়িত রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সন্দেহ করছি, তবে তাদের কেউ জড়িত থাকার কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনো আমরা পাইনি। তবে আমরা তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। হতেও পারে নগদকর্মীদের পরিচিত, বন্ধু বা পরিচিত কেউ তাদের অফিসে আড্ডা বা যাতায়াত করা বা কথা প্রসঙ্গে জেনে বা অন্য কেউ তাদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে এই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে সব বিষয়ে মাথায় রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে।’
সোমবার (১৬ জুন) দুপুরে থেকে মামলার বাদী আবদুর রহমান ও নগদের ডিস্ট্রিবিউটরের একজন মো. তারিকুজ্জামানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র্যাব। তারা জানিয়েছেন, ঘটনা প্রসঙ্গে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়া কারও প্রতি সন্দেহ আছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুমন মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ ঘটনায় তদন্ত চলছে, পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও ডিবি পুলিশও তদন্ত করছে। এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছিনতাইয়ের ঘটনাটি পরিকল্পিত ঘটনা। আসামি ধরা গেলেই সব বেরিয়ে আসবে।’