মায়ানমারের জান্তা সরকারের গণহত্যা ও নির্যাতনে সে দেশের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে হঠাৎ আগ্রহী হয়ে উঠেছে চীন। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নিতে চায় বেইজিং। প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতে আগামী সপ্তাহে চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সূত্রে জানা গেছে, চীন সফরে ড. খলিলুর রহমান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সেখানকার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা করবেন। আলোচনায় মায়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে এবং রাখাইনের নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কীভাবে সমঝোতা করা হবে তা নিয়ে কথা হবে।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে চীন কীভাবে মধ্যস্থতা করবে তা এই আলোচনায় উঠবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আট বছর ধরে জান্তা সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করে আসছে চীন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মহলের অংশগ্রহণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপায় নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা হবে। সেখানে চীনকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়টি চীন কখনোই চায়নি। তাই ২০১৭ সালেও যখন মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশের দিকে আসে তখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহল বেশ সোচ্চার ছিল।
কিন্তু চীন তখনো রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নেয় এবং সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে এই সংকট সমাধানে জান্তা সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে বাংলাদেশ সরকারকে উৎসাহিত করে। চীনের সেই আশ্বাসে দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি সম্পন্ন হলেও গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাও মায়ানমারে ফিরে যায়নি। এই সংকট সমাধানে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহল দূরে সরে যায়।
এদিকে মায়ানমারের রাখাইনে বাংলাদেশের ভেতর করিডর ব্যবহার করে জাতিসংঘের ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে অন্তর্বর্তী সরকার সরে আসার পর থেকে কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ। এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য মায়ানমার বা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেই। কেননা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জান্তা সরকার নাকি আরাকান আর্মির সঙ্গে সমঝোতা করবে বাংলাদেশ, তা নিয়ে রয়েছে মতপার্থক্য। বিষয়টি নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি ভালো চোখে দেখছে না জান্তা সরকার। নেপিডো তাদের আপত্তি কূটনৈতিকপত্র দিয়ে ঢাকাকে জানিয়েও দিয়েছে। অথচ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের দখল এখন আরাকান আর্মির হাতে। সেখানে জান্তা সরকারের কোনো আধিপত্য না থাকলেও আরাকান আর্মির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের বিষয়টি মেনে নিতে পারছে না নেপিডো।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছে যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিংয়ে বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি রাখাইনে ত্রাণ সহায়তা পাঠাতে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে মানবিক করিডর দেওয়ার বিষয়েও কথা হয়। মানবিক করিডরের প্রস্তাবটি জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরকালেও দিয়েছেন। কিন্তু ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস সম্প্রতি কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিকাবের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে রাখাইনে মানবিক সহায়তার জন্য করিডর দেওয়ার বিষয় আলোচনায় উঠেছিল। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘ জড়িত নয়। তার এই বক্তব্যে হতবাক হন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসনবিষয়ক কমিশনার মিজানুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। নতুন করে প্রতিদিন আসছে। মায়ানমারের রাখাইন থেকে নতুন করে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাদের মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজার জনের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে।
কিন্তু মে মাস ও চলতি জুন মাসে জাতিসংঘের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ আছে। ফলে এই দুই মাসে কত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, রাখাইনে আরাকান আর্মি তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে, মারধর করে, লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। এতে সেখানে খাদ্যসংকট ও নিরাপত্তার অভাবে তারা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে। নতুন করে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে তারা প্রথমে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা আত্মীয়দের বাড়িতে উঠছে।