ছাদে ওঠার জন্য কোনো সিঁড়ি রাখা হয়নি। চারতলা সিল করে দেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সব কটি মালামাল ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলোর গুণগতমান সন্তোষজনক নয়। কিছু জায়গায় ফাটল ধরেছে। দেয়ালের কিছু কিছু অংশের রং উঠে গেছে। লিফট না থাকায় বয়স্করা সেবা নিতে পারছেন না। এই হচ্ছে ‘উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের সিলেট জেলা সদরের উপজেলা সম্প্রসারিত প্রশাসনিক ভবনের বাস্তব চিত্র। অন্য উপজেলা কমপ্লেক্সেও বিভিন্ন ত্রুটি ধরা পড়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বহু টাকা খরচ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলেও কয়েক বছর না যেতেই এ রকম দুরবস্থা হয়েছে।
একই ছাদের নিচে সরকারি সব নাগরিক সেবা দিতে প্রকল্পটি ২৩৩ উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু ডিজাইনে ত্রুটির কারণে ওই সব উপজেলা ভবনে সমাজসেবা অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ ১৭টি দপ্তরের অফিস সংকুলান হচ্ছে না। তাই এসব ভবন ১০ তলা করা প্রয়োজন।
এ প্রকল্প তিন বছরে বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও বাস্তবে লেগেছে ১১ বছর। এটি বাস্তবায়ন করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
১৭টি দপ্তরের মধ্যে মাত্র ৭টির সংকুলান হচ্ছে
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে যেসব উপজেলা ভবনের অবকাঠামো খুবই পুরোনো, দুর্বল, ঝুঁকিপূর্ণ ও নতুনভাবে উপজেলা হয়েছে এমন ২৩৩টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) ছাড়াই তা করা হয়েছে।
১৯৮২ সালের অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা ভবনে ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গা থাকার কথা। কিন্তু অধিকাংশ ভবনে তা ছিল না। তাই একই ছাদের নিচে সব নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য তৎকালীন সরকার ২০১১ সালের ২৯ মার্চ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। তখন খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৭৫ কোটি টাকা। ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের জুনে তা শেষ করতে বলা হয়। কিন্তু ৫ বার সংশোধন করে ২০২২ সালের জুনে শেষ করা হয়। খরচ বাড়িয়ে দ্বিগুণের মতো ১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ধরা হয়। তবে প্রকৃত খরচ হয়েছে ১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এভাবে টাকা খরচ করা হলেও ভবনগুলোর আয়তন প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ডিজাইন অনুযায়ী এসব ভবনের কোনো কোনোটিতে ৩০টি, কোনোটিতে ৩৫টি এবং কোনো কোনোটিতে ৪৮টি কক্ষ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দরকার ৭০ থেকে ৮০টি কক্ষ। ছয়তলা ফাউন্ডেশনবিশিষ্ট ভবনগুলো চারতলা করা হয়েছে। এতে ১৭টি দপ্তরের মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৭টি দপ্তরের সংকুলান হচ্ছে। তাই সব দপ্তরের সংকুলানের জন্য চারতলা ভবনের পরিবর্তে ১০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন।
ডিজাইন ত্রুটির ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১১ বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে। আমি ২২ দিনের সর্বশেষ পিডির দায়িত্বে ছিলাম। কাজেই যারা প্রথমে ছিলেন, তারাই বলতে পারবেন।’
সিলেট অফিসসহ বিভিন্ন উপজেলা কমপ্লেক্সে নির্মাণকাজের ত্রুটির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘যারা নির্মাণকাজের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অবহেলা ছিল। এটা অস্বীকার করা যাবে না। সিলেট অফিসে ছাদে ওঠার সিঁড়ি নেই। তাই পরে ভেতর দিয়ে লোহার সিঁড়ি করা হয়েছে।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাকি উপজেলাগুলোতে এসব কমপ্লেক্স আটতলা করা হবে। সবার মতামত নিয়ে বাকি উপজেলা কমপ্লেক্স আটতলা বিল্ডিংয়ের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে সম্প্রতি একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আশা করি, সেগুলোতে সব অফিস সংকুলান হবে।’
আইএমইডির সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক (ডিজি) এ বি এম শওকত ইকবাল শাহিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো প্রকল্পে ভুলভ্রান্তি থাকলে আমরা সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয়কে তা ধরিয়ে দিই। সংশোধন করবে কি না তাদের ব্যাপার। এই প্রকল্পে ডিজাইন ও সিলেটসহ কিছু অফিসের কাজে ত্রুটি পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। যাতে সমজাতীয় কোনো প্রকল্পে আর ভুল না হয়।’
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালে এসব উপজেলা কমপ্লেক্স ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করা হলেও তিন বছরের মধ্যে বিভিন্ন ভবনে ত্রুটি দেখা গেছে। উজিরপুর উপজেলা কমপ্লেক্সের টয়লেট ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। দেবীগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্সের বেসিন ভেঙে গেছে। অজুর স্থান অপরিচ্ছন্ন হয়ে গেছে। দেয়ালে ড্যাম্প ধরে গেছে। স্যানিটারি পাইপ লিক হয়ে গেছে। কাউনিয়া উপজেলা কমপ্লেক্সের বেসিনও অকার্যকর হয়ে গেছে। দেওয়ালের রং চটে গেছে। এভাবে বিভিন্ন উপজেলা কমপ্লেক্সে ত্রুটি দেখা দিয়েছে।
বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতাগ্রহীতার সুবিধার্থে একই ছাদের নিচে সব সেবা প্রদানের কথা বলা হলেও চারতলা ভবনগুলোতে নেই লিফটের ব্যবস্থা। গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। নারীদের জন্য নামাজের কক্ষ নেই। টয়লেট ও বাথরুমের জায়গা কম। ভবনে সেবাগ্রহীতাদের জন্য কোনো অপেক্ষাগার নেই। প্রতিবন্ধীদের জন্য ভবনের চারতলায় উঠতে র্যাম্প নেই। জরুরি মুহূর্তের জন্য জেনারেটরের ব্যবস্থা নেই। ভবনের চারদিকে কোনো বাউন্ডারি ওয়াল নেই। ফলে কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়। আইএমইডি এর আগে ২০১৯ সালে এসব উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন পরিদর্শন করেছে। তারা এসব দুর্বলতার কথা বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির কাছে তুলে ধরলেও তার কোনো সুরাহা হয়নি।
পাঁচজন প্রকল্প পরিচালক কাজ করেছেন ১১ বছরে
প্রকল্পটি এলজিইডির প্রধান কার্যালয় আগারগাঁও থেকে বাস্তবায়ন করা হয়। এতে প্রকল্প পরিচালকসহ ১৩ জন লোকবল ছিল।
এই প্রকল্পের মোট পাঁচজন কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমে ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত ৩ বছর ১১ মাস পূর্ণকালীন পিডির দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আওলাদ হোসেন। এরপর মো. মোসলে উদ্দিন ২ বছর ১ মাস পূর্ণকালীন পিডির দায়িত্বে ছিলেন। তৃতীয় পিডি হিসেবে প্রভাস চন্দ্র বিশ্বাস ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ বছর ১০ মাস দায়িত্ব পালন করেন। এরপর জিপি চৌধুরী ২০২২ সালের ৮ মে পর্যন্ত ২ বছর ৩ মাস প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ ২২ দিনের জন্য ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পিডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মো. মাহাবুব আলম। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিন মাস পর পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা আয়োজনের বিধান থাকলেও দীর্ঘ ১১ বছরে মাত্র ৫টি সভা হয়েছে। প্রথম তিন বছরে নিয়মিত অডিট কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরের ৮ বছরে তা হয়নি।
এ প্রকল্পে ১৮ একর ভূমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ১০০ ভাগ পূরণ হয়েছে। তবে ২৩৩টি প্রশাসনিক ভবন ও হলরুম নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। স্থান নির্বাচন জটিলতার কারণে ৮টি সম্প্রসারিত ভবন ও ১৬টি হলরুমের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রসারিত ভবন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে ৯৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং হলরুম নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে ৯৩ শতাংশ। এ ছাড়া স্থান নির্বাচনের সমস্যার কারণে ৪৬টি আবাসিক ভবন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ২৫টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্জন হয়েছে মাত্র ৫৪ শতাংশ।