দিন দিন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। ইতোমধ্যে ঢাকার বাইরে বরগুনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীতে এখনো সে রকম পরিস্থিতি না হলেও সামনে পরিস্থিতি মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ইতোমধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এসব ওয়ার্ড হতে পারে ডেঙ্গুর হটস্পট।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো অভিযান হচ্ছে না। সরকার থেকে শুরু করে সবাই রাজনীতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত। জনস্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা ভাবনা নেই। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, এতে খুব একটা সুফল আসছে না। প্রতিবছরই অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকের প্রাণহানি ঘটছে। তাই স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য সরকারকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।
তারা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশের সড়কগুলো শিক্ষার্থীরা যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযানে নেমেছিল, সেই ধারাবাহিকতাও আর বজায় থাকেনি। সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘একটা লক্ষ্য ঠিক করতে হবে যে এত বছরের মধ্যে আমরা নিয়ন্ত্রণ করব। এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে। গঠন করতে হবে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি। এতে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। সেই কাজটি করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার করবে পরিচ্ছন্নতার কাজটি। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখবে চিকিৎসার বিষয়টি।’
তিনি বলেন, ‘সরকার বড় উদ্যোগ নিলে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের জায়গা থেকে অংশ নেবে। শিক্ষার্থীদের কাজে লাগাতে হবে, তারা তাদের বাসায় সচেতন করবে। যে বাসায় শিক্ষার্থী নেই, তারা সেই বাসায় গিয়ে সচেতন করবে। রোগী আছে কি না, তাও খুঁজতে তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। এ ছাড়া পরিচ্ছন্নতার কাজেও তারা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অভ্যুত্থানের পর যেটি আমরা দেখেছি। মাসে অন্তত একবার হলেও সেটির ধারাবাহিকতা রাখতে পারলে ভালো হতো।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার আওতাধীন জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে গত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে ডেঙ্গুর প্রাক-বর্ষা জরিপ চালানো হয়।
সেই জরিপে ঢাকার দুই সিটির ১৩টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব এলাকায় গড় ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর বেশি এবং তিনটি ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ৬৭ পাওয়া গেছে। কোনো এলাকায় এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয় ব্রুটো ইনডেক্সের মাধ্যমে। এই ইনডেক্স ২০-এর বেশি হলেই তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়।
ঢাকা দক্ষিণের ৩১ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ড এবং উত্তরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ব্রুটো ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৬৭ পাওয়া গেছে। এরপর ব্রুটো ইনডেক্স ২৩ দশমিক ৩৩ মিলেছে দক্ষিণ ঢাকার ৩, ৪৬ ও ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং উত্তর ঢাকার ২, ৮ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে। ব্রুটো ইনডেক্স ২০ ছিল দক্ষিণ ঢাকার ৪ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং উত্তর ঢাকার ১৩ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ড।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৩ হাজার ১৪৭টি বাসাবাড়ির মধ্যে ৪৬৩টিতে অর্থাৎ ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৯ শতাংশই বহুতল ভবন ও সর্বনিম্ন ৩ শতাংশ শূন্য প্লট। এ ছাড়া নির্মাণাধীন ২০ শতাংশ, ইনডিপেনডেন্ট ১০ শতাংশ ও ৯ শতাংশ সেমিপাকা ভবনে লার্ভা পাওয়া গেছে।
জরিপ চালানো এসব বাসাবাড়ির ২২ শতাংশ সিমেন্টের পানির ট্যাংকে, ২০ শতাংশ জমে থাকা পানিতে, ১৩ শতাংশ প্লাস্টিকের ড্রামে, ১১ শতাংশ পানির মিটারের গর্তে, ১০ শতাংশ প্লাস্টিকের বালতি, ৭ শতাংশ প্লাস্টিক পাইপে, ৬ শতাংশ পরিত্যক্ত টায়ারে, ৫ শতাংশ জমিয়ে রাখা পানিতে, ৪ শতাংশ সিমেন্ট পাত্রে এবং ফুলদানি ও ট্রেতে ২ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের মে মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকলেও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। নিয়ম অনুযায়ী সকালে ও বিকেলে মশার ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুব কম এলাকাতেই দেখা গেছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, বেশির ভাগ ওয়ার্ডে দিনের পর দিন কোনো ওষুধ ছিটানো হয়নি। বিশেষ করে খালি প্লট ও বাসাবাড়ির পাশের নালা-নর্দমায় জমে থাকা পানিতে অনায়াসেই এডিস মশার জন্ম হচ্ছে। অথচ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে উত্তর সিটির অন্তর্ভুক্ত মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, রামপুরা, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা মাসখানেক ধরে কোনো মশার ওষুধ বা ফগার মেশিন দেখেননি। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪২ দিন ধরে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সেখানেও কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে যে ৭টি ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে আমরা চিরুনি অভিযান চালিয়েছি। গত ২৪, ২৫ ও ২৬ জুন সকাল-বিকেল পালাক্রমে ওয়ার্ডগুলোতে অভিযান চালানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটালেই কাজ হবে না, জনসচেতনতা সৃষ্টি করা বেশি জরুরি। সে জন্য প্রতি শনিবার প্রতিটি ওয়ার্ডে সেমিনার করছি। মাঝখানে এটি বন্ধ ছিল, আগামী শনিবার থেকে আবার শুরু হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্মানিত টিম গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন যথাযথভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি জনসচেতনতায় আমরা উদ্যোগ নিয়েছে। জনসাধারণের সচেতন হওয়াও জরুরি।’