এক যুগেরও বেশি বাসাবাড়িতে পাইপ লাইনে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। যেসব বাসাবাড়িতে এর আগেই লাইন দেওয়া আছে সেখানেও ঠিকমতো গ্যাসের সরবরাহ নেই। গ্যাসসংকটের কারণে শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যানবাহনেও ঠিকমতো গ্যাসের সরবরাহ নেই। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট ও প্রচলিত জ্বালানির দুষ্প্রাপ্যতার এমন প্রেক্ষাপটে বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বাংলাদেশে এলপি গ্যাসের শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা একই মত জানিয়ে বলেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এ খাতের সমস্যার সমাধান করতে হবে। এতে এলপি গ্যাসের বাজার দ্রুত বড় হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম উপদেষ্টা খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশে গ্যাসসংকট রয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। সংকট ও চাহিদা- কাজে লাগিয়ে এলপি গ্যাসের ব্যবসা বাংলাদেশে একটি লাভজনক খাত হিসেবে স্থান করে নিতে পারে। ধীরে ধীরে সে দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এ ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে বেশ কিছু সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ ছাড়া বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছেন যারা অবৈধভাবে গ্যাস সিলিন্ডার কেনাবেচা করে থাকেন, যা এই ব্যবসার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এলপি গ্যাসের ব্যবসা বাড়াতে নীতি-সহায়তা দেওয়ার দাবি থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট আড়াই শতাংশ বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারে রেয়াতি সুবিধা ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি ওজনের এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১৪০৩ টাকা, ১৫ কেজি সিলিন্ডার ১৭৫৪ টাকা, ২০ কেজি সিলিন্ডার ২৩৩৯ টাকা, ২৫ কেজি সিলিন্ডার ২৯২৪ টাকা, ৩০ কেজি সিলিন্ডার ৩৫০৮ টাকা এবং ৪৫ কেজি সিলিন্ডার ৫ হাজার ২৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু খবরের কাগজকে বলেন, সিলিন্ডার উৎপাদনে ভ্যাট বাড়ানোর ফলে এলপি গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাবে। এতে এলপি গ্যাসের ব্যবসায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে এখনো পাইপ লাইনে গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা নেই। এসব এলাকাতে সিলিন্ডারে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষভাবে অনেক উপজেলা, এমনকি গ্রামেও এখন সিলিন্ডারে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। এখন গাড়িতেও এলপিজি ব্যবহার বাড়ছে, যা অটোগ্যাস নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষের চাহিদা সামনে রেখে জেলায় জেলায় গড়ে উঠছে অটোগ্যাস স্টেশন।
ব্যবসায়ী এ নেতা আরও বলেন, ‘অনেক শিল্প কারখানাতেও এখন এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে। এলপি গ্যাসের চাহিদার বড় অংশ আমদানি করা হয়। তবে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এলপিজি বোতলজাত করে রপ্তানিও করছে।’
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ‘এলপি গ্যাসের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ আছে। সরকার থেকে নীতি ও আর্থিক সুবিধা দিলে এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সরকারকে এলপি গ্যাস খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে নীতি সহায়তাসহ সব ধরনের সুবিধা দিতে হবে।’
এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হুমায়ুন রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, দেশে গ্যাসসংকট এবং বিদ্যুতের অভাবে এলপিজি গ্যাসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে এলপিজি গ্যাসের বাজার মূলত বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলপি গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভর করে আরও কয়েকটি খাতের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। বিশেষভাবে এলপি গ্যাস ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও রমরমা ব্যবসা হচ্ছে। তাই এলপি গ্যাস সরবরাহের ব্যবসা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল অনেক খাতের ব্যবসা বাড়বে।
এলপিজি গ্যাস ডিলারশিপ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স এবং পারমিট সংগ্রহ করতে হয়। এসব সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেকে ভোগান্তির শিকার হয়েছে। শিল্প খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে এ সেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা ব্যবসা শুরু করার আগে এলপি গ্যাসের বাজার সম্পর্কে ভালোভাবে গবেষণা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষভাবে চাহিদা, সরবরাহ, প্রতিযোগি প্রতিষ্ঠান কারা এবং তাদের সক্ষমতা কতটা- এসব যাচাই-বাছাই করার প্রস্তাব করেন।
গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনার দিকে নজর রাখার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিলিন্ডার সংগ্রহ করে অবৈধভাবে বেশি দামে বিক্রি করে থাকেন। গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেমন- অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। এ ছাড়া ব্যবসায় সততা বজায় রাখার কথাও বলেন তারা। গ্রাহকরা ন্যায্যমূল্যে গ্যাস পাবেন বলেও উল্লেখ করেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এলএনজি ও এলপিজি- দুটোই আমদানি করতে হয়। এলপিজির দর জ্বালানি তেলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই এলএনজির চেয়ে এলপিজি আগামীতে সাশ্রয়ী হতে পারে। এলপি গ্যাসের ব্যবসা একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা হতে পারে, তবে এর জন্য ভালোভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অনেক জায়গায় প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়া যায় না। ওই সব জায়গায় রান্নার কাজে, শিল্প প্রতিষ্ঠানে এলপিজির ব্যবহার বাড়তে পারে। একইভাবে পরিবহনেও এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৯ সালে দেশে এলপি গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয়। অনুমোদিত এলপিজি সরবরাহকারী বেসরকারি কোম্পানি ৫৮টি। এর মধ্যে সক্রিয় ২৯টি। এ ছাড়া এলপিজি কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি সরকারি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে বসুন্ধরা, বেক্সিমকো, ওমেরা, সেনা, যমুনা, টোটাল, ওরিয়ন, জি-গ্যাস, নাভানাসহ অনেক কোম্পানি বাজারে এলপি গ্যাস বিক্রি করছে। অনেক বড় কোম্পানি কাঁচামাল প্রোপেন ও বিউটেন আমদানি করে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে বিক্রি করছে বোতলজাত করে। কয়েকটি কোম্পানি এদের থেকে কিনে শুধু বোতলে ভরে এলপিজি বিক্রি করছে। দেশে ১২ থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন পরিমাণে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারে বিক্রি হয়। বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ ও ১৫ কেজির সিলিন্ডার। দাম যথাক্রমে ১৪০৩ ও ১৭৫৪ টাকা।
৩০-৪৫ কেজির সিলিন্ডার বেশি ব্যবহৃত হয় হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে। ৩০ কেজির দাম ৩৫০৮ টাকা আর ৪৫ কেজির দাম ৫২৬২ টাকা।
এলপি গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের বেশি। এই খাতে বিনিয়োগ ৪০ হাজার কোটি টাকা। গ্রাহক প্রায় ৪০ লাখ। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ৩ কোটির বেশি মানুষ এ গ্যাসের সুবিধাভোগী। তিন-চারজন সদস্যের একটি পরিবারের ১২ কেজির এক থেকে দেড়টি সিলিন্ডারে মাস চলে যায়। বর্তমানে বছরে এলপিজির মার্কেট ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এলপি গ্যাস দেশের জ্বালানি চাহিদার ৯ শতাংশ পূরণ করছে।
গৃহস্থালিতে ৮৪ শতাংশ, শিল্পকারখানায় ১২ শতাংশ ও পরিবহন খাতে ৪ শতাংশ এলপিজি ব্যবহার হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এলপিজির চাহিদা ৩০ লাখ টনে উন্নীত হবে। বাংলাদেশ মূলত কাতার, কুয়েত ও ইরান থেকে এলপিজি আমদানি করে।
অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুসারে, বর্তমানে এ শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবকাঠামো ঘাটতি। কর্ণফুলী নদীতে মাত্রাতিরিক্ত পলি জমার কারণে নদীর নাব্যসংকট দেখা দিয়েছে। এতে বড় জাহাজের বদলে ফিডার ভেসেলের মাধ্যমে এলপিজি টার্মিনালে আনতে হয়। ফলে আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। খরচ কমাতে এলপিজি ভর্তি ছোট জাহাজ দেশের নদীগুলোর মধ্য দিয়ে চলাচলে সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। এ কারণে কোম্পানিগুলোকে মোংলা, পায়রা বা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রিফাইনারি পর্যন্ত এবং সেখান থেকে দেশের পরিবেশকদের কাছে ট্যাংকারে করে এলপিজি পরিবহন করার সুযোগ দিতে হবে।