দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা দিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে চাইছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ লক্ষ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ ইতোমধ্যে শুরু করেছে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। স্বচ্ছ, কর্মঠ, পেশাদার কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ দিতে কর্মকর্তাদের ভাইভা নেওয়া শুরু হয়েছে।
মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ডিসিরাই নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। একজন ডিসি সংশ্লিষ্ট জেলার শীর্ষ নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটকেন্দ্র স্থাপনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রধান করে কমিটি করার বিধান ইতিমধ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাখা হয়েছে নির্বাচন কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব। এমন সব সংশোধনী এনে গত ৩০ জুন ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন এবং ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫’ গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
সরকার এসএসবির মাধ্যমে এমন কর্মকর্তা বাছাই করতে চাইছে, যাদের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হলে ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’ বা ‘দিনের ভোট রাতে’ এমন অভিযোগ বা বিতর্ক না ওঠে এবং নতুন সরকারের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না ওঠে। উল্লেখ্য, দেশে অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সর্বাগ্রে নিরপেক্ষ মাঠ প্রশাসন প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিসি নির্বাচন ঘিরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে চাইছে প্রশাসন।
সরকারের এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন রয়েছে প্রশাসনে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের জীবনবৃত্তান্ত, অতীত কর্মক্ষেত্রে ভূমিকা, পারিবারিকসহ ছাত্রজীবনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। তারই ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে ডিসিদের। এ কারণেই ইতোমধ্যে ডিসি ফিটলিস্টে উত্তীর্ণ ২৫ ও ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদেরও তথ্যও নতুন করে মাঠ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে। চার মাস আগে বর্তমানে ডিসি পদে দায়িত্ব পালনকারী ২৪ ব্যাচের ২১ জন কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। তবে সেসব জেলায় তাদের পরিবর্তে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে পারেনি সরকার। সরকারের চলমান এসব প্রক্রিয়া শেষ হলেই প্রত্যাহার করা ডিসিদের পদে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়ার আদেশ জারি করবে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই গত সেপ্টেম্বরে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম দফায় প্রণীত তালিকায় বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৪, ২৫ ও ২৭ ব্যাচের ১০৬ জন কর্মকর্তাকে রাখা হয়। এর মধ্যে ৬৪ জনকে ডিসি করা হয়। পরে পুরোনো তালিকা অনুসরণ না করে নতুন ফিট লিস্ট করে ডিসি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে ১১ জানুয়ারি নতুন তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। ২৪ ব্যাচের ২১ জন ডিসি চার মাস আগে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও তাদের জেলা থেকে এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।
২০০৬ সালের ২১ আগস্ট ২৫তম এবং ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে নিয়োগ পান। তারাই এখন ডিসির দায়িত্বে রয়েছেন। প্রথম দফায় ২৪, ২৫, ২৭ ব্যাচের উপসচিবদের ডিসি মনোনয়নে ফিটলিস্ট প্রস্তুত করা হয়। তাদের বিভিন্ন সময়ে এসএসবির মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ডাকা হয়। পরে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের নিয়োগ দেওয়া সব জেলার ডিসিদের প্রত্যাহার করে এই তিন ব্যাচ থেকেই ডিসি পদে নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
ইতোমধ্যে উপসচিব (ডিসি) থেকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া ২১ কর্মকর্তাকে মাঠ থেকে উঠিয়ে এনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পদায়নের কার্যক্রম শুরু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে সেই সব জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ প্রয়োজন। এই জেলাগুলো হলো ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, ঝিনাইদহ, পঞ্চগড়, মাগুরা, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, চাঁদপুর, হবিগঞ্জ, পিরোজপুর, চুয়াডাঙ্গা, মানিকগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, মাদারীপুর, গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ডিসি পদে নিয়োগে যাতে কোনো বিতর্ক না হয়, সে জন্য এবার অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তাই কর্মকর্তাদের নিবিড়ভাবে বাছাই করা হচ্ছে। সৎ, যোগ্য, পেশাদার কর্মকর্তাদের বিশেষ বিবেচনায় আনা হবে। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাকে বিবেচনায় আনা হবে না। নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে বিধায় নতুন ডিসি নিয়োগে কিছুটা সময় লাগছে। বাছাই তালিকা চূড়ান্ত শেষে পদোন্নতি পাওয়া ডিসিদের স্থলে নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হবে।