চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণ ক্ষমতার ১৯ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে নিলামযোগ্য কনটেইনার। দিন দিন বাড়ছে এ সংখ্যা। সঠিক সময়ে নিলাম না হওয়ায় বা নিলামের ধীরগতির কারণে এসব কনটেইনারের সংখ্যা বাড়ছে। নিলাম না হওয়ায় ইয়ার্ড খালি করা যাচ্ছে না। এসব কনটেইনারে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য জমা রয়েছে। এ ছাড়া এসব কনটেইনারের কারণে আমদানি-রপ্তানির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
রবিবার ( ১৩ জুলাই) পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে ইয়ার্ডে ১০ হাজার ১১৩ টিইইউএস নিলামযোগ্য কনটেইনার জমা আছে। বন্দরের ৫৩ হাজার ৫১৮ টিইইউএস ধারণ ক্ষমতার ইয়ার্ডে গতকাল পর্যন্ত ৪৪ হাজার ২৪৯ টিইইউএস কনটেইনার জমে যায়। ৪০ হাজার টিইইউএসের বেশি জমা হলে সাধারণত বন্দরের কনটেইনার জট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্মকর্তারা জানান, নিলামযোগ্য কনটেইনারের কারণে ১৫০ কোটি বকেয়া ভাড়া আটকে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের। নিলামযোগ্য কনটেইনার দ্রুত সরানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার জট চলে যেত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার ৬৪৪ কনটেইনার রয়েছে। যেখানে পণ্যের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ টন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৯ হাজার ৭৮৬ টিইইউএস কনটেইনার পণ্য, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে থাকতে দেখেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি দফায় দফায় চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করে নিলাম কনটেইনার সরানোর তাগাদা দিয়েছিলেন বন্দর ও কাস্টমসকে। এর পর নিলামে গতি এলেও পরে কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের কলমবিরতি ও নানা আন্দোলনে তা থমকে যায়। গত ডিসেম্বরে তাৎক্ষণিক নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রম চালু করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতি এখনো সমাধান হয়নি।
গত ১৫ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সরাসরি হস্তক্ষেপ করে বিশেষ আদেশ জারি করেছে। ই-নিলাম ও স্পট নিলামসহ, প্রয়োজন হলে সরাসরি বিক্রি বা স্থানান্তরের। বিপজ্জনক রাসায়নিক উপকরণগুলোকে আলাদা করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এ ছাড়া এনবিআরের নির্দেশনায় গত ৮ জুলাই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ‘অকশন কমিটি’ গঠন করা হয়। এ কমিটিকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩-এর আগে যেসব পণ্য পড়েছিল, তার জন্য দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উপ-জ্যেষ্ঠ কমিশনার মো. তফসির উদ্দিন ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) মোহাম্মদ এনামুল করিম বলেন, ‘বন্দরের নিলামযোগ্য কনটেইনারের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। নিলামের জন্য চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে বলা হয়। এ ছাড়া ধ্বংস করা কনটেইনারগুলো দ্রুত সরানোর জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি।’
চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিডার (নিলামকারী) মোহাম্মদ ইয়াকুব চৌধুরী বলেন, ‘দ্রুত নিলাম না হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। অনেক পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। অথচ সঠিক সময়ে নিলাম হলে রাজস্ব পাওয়া যেত। নিলামযোগ্য শত শত কনটেইনার পড়ে রয়েছে। কাস্টমসের উচিত আগের নিলামযোগ্য পণ্য চালানগুলো নিলামে তোলা। ধ্বংসযোগ্য পণ্য চালান ধ্বংসের উদ্যোগ নেওয়া।’
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার (নিলাম) মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, ‘যেকোনো পণ্যের চালান বন্দরের আসার পর ৩০ দিনের মধ্যে খালাস করতে হয়। না করলে নিলামযোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা হয়। আমদানিকারকরা এ সময় বাড়িয়েও নিতে পারেন। নিলামে তোলার ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্যের বা লটের নির্ধারিত মূল্যের ৬০ শতাংশ পূরণ হওয়ার একটি বিধি বিধান রয়েছে। এটা পূরণ না হলেও আমরা পণ্য চালান ছাড় দিতে পারি না। আবার অনেক পণ্য চালানে আমদানিকারকরা মামলা করেন। এটাও নিলামে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবার ২০২৩ সালের আগের পণ্য চালানের ক্ষেত্রে কিছুই লাগবে না। এসব চালান বিশেষ বিবেচনায় ছাড় দেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘বন্দরকে স্বাভাবিক ও সচল রাখা খুবই জরুরি। এ বন্দর দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আমরা শুনেছি ২০ বছরের পুরোনো কনটেইনারও বন্দরের পড়ে রয়েছে। সেসব কনটেইনার খোঁজে দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।