পানি উন্নয়ন বোর্ডে বগুড়া সার্কেলের অধীন পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ (পওর) বিভাগের কাজে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, এই দুর্নীতির পরিমাণ শত কোটি টাকার ওপরে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের নেতৃত্বে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অভিনব কায়দায় হয়েছে এসব দুর্নীতি। আংশিক অথবা কোনো কাজ না করেই শত কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই দুই কর্মকর্তা পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে নামমাত্র কাজ করিয়ে কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ না করেই পাউবোর বিভিন্ন প্রকল্পের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
চিঠিতে বলা হয়, দুর্নীতিবাজ দুই প্রকৌশলী পানি উন্নয়ন বোর্ডের লাইসেন্স ভাড়া করে নিজেরাই গোপনে ১০ শতাংশ কম দরে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেন। এরপর তারা আংশিক কাজ করে কিংবা কোনো কাজ না করেই বিল উত্তোলন করেন। এসব ঠিকাদারের বেশির ভাগই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিল বলে চিঠিতে দাবি করা হয়। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এনডিআর কর্মসূচির আওতায় প্রকাশিত ৭৭টি গ্রুপ টেন্ডারের (মোট প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা) মধ্যে মাত্র ৮-১০ জন নিয়মিত ঠিকাদারকে সীমিতসংখ্যক কাজ দিয়ে, বাকি সব কাজ তত্ত্বাবধায়ক ও নির্বাহী প্রকৌশলী মিলেমিশে ভাড়া করা লাইসেন্স হাতিয়ে নেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্পের নামে ইছামারা ও কামালপুরসহ বিভিন্ন স্থানে একই জায়গায় বারবার জরুরি কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়, অথচ বাস্তবে সেসব কাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন কিংবা একেবারেই করা হয়নি। এ ছাড়া ২০২৩ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এলটিএম এর ২০ গ্রুপ টেন্ডার প্রকাশিত হয়েছিল, যার বাজেট ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের নেতৃত্বে সম্পূর্ণ কাজ না করে বরাদ্দকৃত উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করে ভাগবাটোয়ারা করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কবির বিন আনোয়ার, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজুলল করিম সেলিম, সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, স্থানীয় সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান রিপু ও সাহাদারা মান্নানের সহযোগিতায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টেন্ডার ছাড়াই প্রায় ১০০ কোটি টাকার জরুরি কাজের বিল তৈরি করেন, যার অর্থাৎ প্রকৃত কাজের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ।
বগুড়ায় করতোয়া নদীর খনন কাজেও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে চিঠিতে।
২০২৪ সালের ২৭ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সেখানে বলা হয়, প্রকৌশলীরা তাদের পছন্দের ঠিকাদারকে লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে গোপনে দরের তথ্য জানিয়ে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন এবং এতে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। বগুড়া শহরের সাতমাথার কাছে সেউজগাড়ী সেন্ট্রাল স্কুলের পশ্চিম পাশে ও পানির ট্যাংকির দক্ষিণ পাশে একটি জমি রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া সাতানি বাড়ির দক্ষিণ পাশে ও শেরপুর বোর্ডের পূর্ব পাশে একটি ১০ তলা ভবনের ৫ম তলায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূ্ল্য কোটি টাকার ওপরে। এ ছাড়া তার এবং স্বজনদের নামে বেনামে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের মাধ্যমে না করে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, বুয়েটের প্রকৌশলী ও কমার্শিয়াল অডিটের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত টিম গঠনের মাধ্যমে করা হোক। তিনি মনে করেন, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আরও অনেক রাঘববোয়ালের নাম প্রকাশ্যে আসবে।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রকল্পের কাজের জন্য যে টেন্ডার দেওয়া হয় তা নির্বাহী প্রকৌশলীদের আন্ডারে হয়। টেন্ডারে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদেরই কথা বা যেকোনো ধরনের যোগাযোগ হয়। তাই এগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হক খবরের কাগজকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ যদি থেকে থাকে তবে তা মনিটরিংয়ের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আছেন, শক্তিশালী টাস্কফোর্স আছে যার মাধ্যমে প্রকল্পের কাজগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না তা দেখা হয়। সুতরাং এগুলোর সঙ্গে আমি একা জড়িত নই এবং কাজগুলো আমার একার হাতে মনিটরিং হয় না।