কোলাহল থেমে গেছে। ঘরময় ছোটাছুটি করত যে ছোট্ট সায়ান; সেই সায়ান এখন শুয়ে আছে অন্ধকার কবরে। মা শাম্মী আখতার সীমার দৃষ্টিতে কেবল শূন্যতা, বুক জুড়ে হাহাকার। ছোট্ট সায়ানকে কবরে শুইয়ে দিয়ে সেই হতভাগ্য মা ফেসবুকে লিখেছেন তার নিদারুণ যন্ত্রণার কথা। সন্তানকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতা যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে। সন্তানের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, ‘আমি এক ব্যর্থ মা, তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না।’
গত মঙ্গলবার (২২ জুলাই) ভোরে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সায়ান ইউসুফ (১৪)। তার শরীরের ৯৫ শতাংশই আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। তার বাবা এ এফ এম ইউসুফ বাবাও একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক । তিনি কলেজ শাখার রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
মা শাম্মী জানান, যুদ্ধবিমান তখন আঁছড়ে পড়েছে মাইলস্টোন স্কুলের হায়দার আলী ভবনে। চারদিকে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে। আগুন লেগেছিল ১৪ বছরের শিশু সায়ান ইউসুফের শরীরেও। সে জানত, মা না হয় বাবা এসে অপেক্ষা করছে স্কুল গেটে। তারা হয়ত ছুটে আসবে অথবা তার শ্রেণি শিক্ষক, সহপাঠীদের কেউ তাকে উদ্ধার করবে। ততক্ষণে তার শরীরে আগুন ছড়িয়েছে। অসহায় সেই শিশুটি তাকাচ্ছিল চারদিকে। স্কুলব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সে বের হতে চেষ্টাও করেছিল।
শাম্মী সেই মর্মন্তুদ দৃশ্য দেখেননি। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে যতটা শুনেছেন, ততটা লিখেছেন।
তিনি স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমার ছেলেটি দগ্ধ শরীরে চারদিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কিন্তু তখনও সে কাঁধের ব্যাগটা নিতে ভুল করেনি। আহারে পড়াশোনা! আহারে শিক্ষা! কী দরকার ছিল এমন শিক্ষার, যা আমার সন্তানের জীবনটাই কেড়ে নিল।’
গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় সায়ানকে উদ্ধার করে কলেজ শাখার শিক্ষার্থী অমিত। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সায়ানের শ্বাসনালী তখন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। সে অবস্থায় অমিতের ফোন দিয়ে সে কল করে মা শাম্মীকে। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান মা-বাবা।
শাম্মী সেদিনের কথা জানান তার স্ট্যাটাসে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি যখন ওকে দেখতে যাই, দেখি তার পুরো শরীর ঝলসে গেছে। আমি আমার ছেলেকে চিনতেই পারছিলাম না। আমার ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই খুব ভীতু ছিল। অথচ সেই ছেলেই আজ পাখির মতো ছটফট করেছে পুরো শরীর ঝলসে গিয়ে। কিন্তু আমাদের বুঝতে দেয়নি, যাতে আমরা দুশ্চিন্তায় না পড়ি। আইসিইউতে থাকা অবস্থায়ও ও আমাকে দেখতে চেয়েছিল।’
উত্তরার সেই বেসরকারি হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সায়ানকে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
মায়ের সঙ্গে সায়ানের শেষ দেখা আইসিইউতে। সে দেখায় মা তাকে দরুদ শরীফ পড়তে বলেন। কথা বলতে পারছিল না সায়ান। শুধু মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল। এটাই ছিল মায়ের সঙ্গে সায়ানের শেষ কথা।
শাম্মী লিখেছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তার স্বামী এ এফ এম ইউসুফ দেশের বাইরে চলে যেতে চাইতেন সপরিবারে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সায়ানকে ভর্তি করাবেন বলে প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। তবে মা-বাবার সেসব প্রয়াস এখন অর্থহীন।
সায়ান সম্পর্কে শাম্মী লিখেছেন, ‘প্রখর মেধাবী ছিল সে। একটু পড়লেই সবকিছু শিখে ফেলত। ছিল ভদ্র, নম্র, বিনয়ী। ক্লাস টু-তে পড়ার সময় থেকেই ৩০টি রোজা রাখত,পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। ইউসুফ আমাকে বলত- সীমা, আমার মনে হয় আমাদের ছেলে একদিন কিছু আবিষ্কার করবে।’
ছেলেকে বাঁচাতে না পারা মা শাম্মীর আর্তনাদ ফুটে ওঠে প্রতিটি শব্দে। অসহায় এ মা লিখেছেন, ‘আমি ও ইউসুফ হয়তো কোনো বড় ভুল বা অন্যায় করে ফেলেছি, যার জন্য আল্লাহ আমাদের এত বড় শাস্তি দিয়েছেন। আপনারা সবাই আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আমার ছেলেটিকেও (সায়ান) দয়া করে ক্ষমা করবেন। আমাদের ফুলের মতো নিষ্পাপ সন্তানটি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল, অথচ আমরা কিছুই করতে পারলাম না। সোনা, আমাকে ক্ষমা করে দিস। আমি এক ব্যর্থ মা। তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না।’
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোঝা বুকে চেপে মা শাম্মী আরও লিখেছেন, ‘এই সময়টা বড় কঠিন। আমি জানি না কিভাবে ওকে ছাড়া এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেব। দিন যেন শেষই হয় না। আমি কখন যাব আমার সোনা পাখির কাছে, সেটাই ভাবি। আমার আর সহ্য হচ্ছে না মা পাখি, আমাকে তুমি তোমার কাছে নিয়ে যাও।’
জয়ন্ত/পপি/