রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইস্যুগুলো নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গত ৩ জুন থেকে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে কমিশনের ১৮টি বৈঠকে এ পর্যন্ত ১৭টি মৌলিক ইস্যু উত্থাপন করা হয়েছে। তবে বারবার আলোচনার পরও এখনো বহুল আলোচিত আটটি মৌলিক ইস্যুতে ঐকমত্যে আসতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। আলোচনায় নেতৃবৃন্দের মতামতকে প্রধান্য দিয়ে একটি যৌক্তিক জায়গায় পৌঁছানো কমিশনের লক্ষ্য।
সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এমন টানাপোড়েন বিরাজ করলেও আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যেই জাতীয় সনদ বা জুলাই সনদ তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
যে ৭টি ইস্যুতে মতানৈক্য রয়ে গেছে সেগুলো হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, রাষ্ট্রের মূলনীতি পুনর্বিন্যাস, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট (উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি), রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি (ইলেক্টোরাল কলেজ ইত্যাদি), প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল নির্দিষ্টকরণ, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি (যা আগে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল- এনসিসি নামে প্রস্তাবিত) এবং সংসদে নারী আসন (সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি)।
এ বিষয়ে কমিশন সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘প্রস্তাবিত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইস্যুগুলোতে বারবার আলোচনার পরও দলগুলো ঐক্যে আসতে পারেনি। আর সব বিষয়ে যে তারা একমত হবেন না, এটাই বাস্তবতা। তার পরও এ পর্যন্ত ১০টি মৌলিক ইস্যুতে দলগুলো একমত হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের আলোচনায় সব মিলিয়ে যেসব বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে, সেই ইস্যুগুলো নিয়েই আমরা জুলাই সনদ চূড়ান্ত করতে চাই।’
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দলগুলোর মধ্যে ঐক্য হওয়া মৌলিক ইস্যুগুলো হলো- সংবিধান সংশোধন, সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদ সংশোধন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার, নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সম্পর্কিত বিধান, বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ (সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ ও উপজেলা পর্যায়ে অধস্তন আদালত সম্প্রসারণ), প্রধান বিচারপতির নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে না থাকার বিধান ও জরুরি অবস্থা ঘোষণা। এ ছাড়া পূর্বনির্ধারিত আরও দুটি বিষয় (নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ সম্পর্কিত প্রস্তাব এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব) আলোচনার জন্য উত্থাপন করতে পারেনি কমিশন।
অনৈক্যের ইস্যুগুলোতে যত বাধা
ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফা বৈঠকে সবচেয়ে বেশিবার আলোচিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে বাছাই কমিটি নিয়ে দলগুলো একমত হলেও কোন প্রক্রিয়ায় কমিটির সদস্যদের (নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তি) বাছাই করা হবে তা এখনো অমীমাংসিত। এর আগে ২০ জুলাই ১৫তম বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি ‘সমন্বিত প্রস্তাব’ উপস্থাপন করে। এতে একটি সংসদীয় বাছাই কমিটির মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবটি আরও পর্যালোচনা করে দলগুলোকে মতামত দিতে বলা হয়। এ বিষয়ে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. মিজানুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্দলীয়, নিরপেক্ষ এই সরকারের জন্য নিরপেক্ষ লোক পাওয়া খুবই কঠিন। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে আলোচনায় আমরা বিগত দিনে পরীক্ষিত ত্রয়োদশ সংশোধনীতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব করেছি।’ এ ইস্যুতে ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সংবিধানের মূলনীতি কী হবে- এই ইস্যুতে কয়েক দফা আলোচনার পরও ঐক্যে আসতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে কমিশনের ১৬তম বৈঠকে এ ইস্যুতে নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। তাতে সাম্য, মানবিক মর্যদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা- এই পাঁচটি বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে। জানানো হয় কেউ কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলে, তা জাতীয় সনদে উল্লেখ করা হবে। এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে সিপিবি, গণফোরামসহ বামদলগুলোর নেতারা।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বলেন, ‘সংবিধানে বিদ্যমান রাষ্ট্রের চার মূলনীতি পরিবর্তন কিছুতেই মানা হবে না। তবে কমিশন নতুন করে সংযোজন করতে চাইলে তাদের আপত্তি থাকবে না।’ একই সঙ্গে এই মূলনীতির পরিবর্তন কিংবা প্রতিস্থাপনে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে নয়, শতভাগ ঐকমত্যের ভিত্তিতেই করতে কমিশনের প্রতি আহ্বান তাদের।
দ্বিতীয় পর্যায়ে বৈঠকের ১৪তম দিনে অমীমাংসিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ইস্যুতে ফের আলোচনায় বসে কমিশন। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠায় সব দল একমত। তবে এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অনৈক্য রয়ে গেছে। এ বিষয়ে টানা তিন দিনের বেশি আলোচনার পরও ঐক্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কোনো কোনো দল বলছে, ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যদিকে আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেও উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আছে। যেহেতু রাজনৈতিক দল এবং জোটগুলো এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারছে না, তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভার পরে কমিশনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
জাতীয় সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর সুযোগ রেখে ১৭তম বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে না থাকার বিধান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না মর্মে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রাজনৈতিক দল ও জোট একমত হয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে দলীয় প্রধান ও সংসদপ্রধানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে কমিশনের এ সিদ্ধান্তে যেসব দল ও জোটের ভিন্নমত রয়েছে, তা জাতীয় সনদে নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে উল্লেখ থাকবে। তবে কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
এখনো অমীমাংসিত রয়েছে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি ইস্যু; যা আগে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) নামে প্রস্তাবিত ছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও ন্যায়পাল। এসব বিষয় গত বুধবার কমিশনের ১৮তম দিনের আলোচনার টেবিলে ওঠে। তবে আলোচনা হয় শুধু নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া ইস্যুতে। পরে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হলেও বাকি চারটি নিয়ে আলোচনাই হয়নি। এসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যাতে স্বচ্ছতা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হয়, এমন মত রাজনৈতিক দলগুলোর।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি (ইলেক্টোরাল কলেজ ইত্যাদি), প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল নির্দিষ্টকরণ এবং সংসদে নারী আসন (সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি) বিষয়েও কয়েক দফা আলোচনার পরও দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি কমিশন।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আমরা ঐক্য প্রতিষ্ঠার তাগিদবোধ তৈরির চেষ্টা করছি। কিছু মৌলিক ইস্যুকে বারবার আলোচনার টেবিলে আনা হয়েছে। বেশ কিছু ইস্যুতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড় দিয়ে একমত হয়েছেন- এ জন্য তাদের সাধুবাদ জানাই। এ পর্যায়ে জুলাই-আগস্টের শহিদদের প্রতি আমাদের যে দায়িত্ববোধ, তার প্রেক্ষিতে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আমরা একটি যৌক্তিক জায়গায় পৌঁছাতে চাই। সব মিলিয়ে যতগুলো বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য পৌঁছানো সম্ভব হবে, সেসব ইস্যুকে সঙ্গী করেই একটি ‘জাতীয় সনদ’ তৈরির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াই কমিশনের লক্ষ্য।