অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে গত সাড়ে ৪ বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে আটকা পড়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ বছরে ৯৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও চার্জশিট দিয়েছে দুদক। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ মাসে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এ সময়ে আরও ৪ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এ সময়ে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন ছাগলকাণ্ডে এনবিআরের সদস্য (বরখাস্ত) মতিউর রহমান। চলতি বছর জানুয়ারিতে দুদকের মামলায় সপরিবারে আসামি হয়েছেন তিনি। এ ছাড়া এনবিআরের অতিরিক্ত কমিশনার কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল, রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সহকারী পরিচালক বদরুন নাহার, কাস্টমস বিভাগের সাবেক সহকারী কমিশনার মোখলেছুর রহমানের দুর্নীতিকাণ্ডেও সারা দেশে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছিল।
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুদকের মামলায় অভিযুক্ত এনবিআরের ৯৫ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকায় আছেন- ঢাকা কাস্টমস ভ্যালুয়েশন অ্যান্ড ইন্টারনাল কমিশনারেটের সাবেক কমিশনার মামুনুর রহমান, সাবেক সহকারী কমিশনার মনিরুল হক সরকার ও মোখলেছুর রহমান খান (সাহান), কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাটের কাপ্তাই সার্কেলের সাবেক কাস্টমস পরিদর্শক নিজাম উদ্দিন। রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন-মোহাম্মদ এনামুল হক, মিজানুর রহমান, গোলাম কিবরিয়া হাজারী, হারুন-অর-রশিদ, আব্দুস সামাদ, জয়নাল আবেদীন, সাইফুন্নাহার জনি, হাবিবুল ইসলাম ও সুলতান আহম্মদ। মামলা ও চার্জশিটে তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ মাসে ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এ ছাড়া বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছেন দুদক কর্মকর্তারা। মামলার আসামিদের মধ্যে অন্যতম হলেন- এনবিআরের সদস্য (বরখাস্ত) মতিউর রহমান, সাবেক কমিশনার নুরুল ইসলাম, অতিরিক্ত কমিশনার কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল ও সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট রফিকুল ইসলাম।
এদিকে গত মাসে (জুলাই) বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুজন সদস্য, দুই কমিশনারসহ অন্তত ১৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। যাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে, তারা হলেন- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য লুৎফুল আজীম, সদস্য (আয়কর নীতি) এ কে এম বদিউল আলম, বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. কামরুজ্জামান, ঢাকা পূর্ব কাস্টমস এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার কাজী মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, আয়কর বিভাগের অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকা, ভ্যাটের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) অতিরিক্ত কমিশনার আবদুর রশীদ মিয়া, অতিরিক্ত কর কমিশনার (ঢাকা কর অঞ্চল-৮) মির্জা আশিক রানা, কর গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন, যুগ্ম কমিশনার তারেক হাসান, যুগ্ম কর কমিশনার (বিসিএস কর একাডেমি) মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন খান, উপ-কর কমিশনার (ঢাকা কর অঞ্চল-১৬) মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, অতিরিক্ত কমিশনার (নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, মূল্য সংযোজন কর) হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার, অতিরিক্ত কমিশনার (কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট-ঢাকা দক্ষিণ) সাধন কুমার কুণ্ডু, কর অঞ্চল-১৬-এর উপ-কর কমিশনার মোহাম্মদ শিহাবুল ইসলাম, উপ-কর কমিশনার মো. মামুন মিয়া ও কর পরিদর্শক লোকমান আহমেদ।
দুদক সূত্র জানায়, কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে করদাতাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এনবিআরের কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য সরকারের নির্ধারিত পরিমাণ কর কমিয়ে দিচ্ছেন মর্মে দুদকে অভিযোগ এসেছে। অসাধু কর্মকর্তাদের এ ধরনের অপকর্মের কারণে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্বপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা ঘুষ না পেয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার মিথ্যা মামলা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিককে হয়রানি করে থাকেন। এমন নানা অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযোগসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে দুদকের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে করদাতাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এনবিআরের কর্মকর্তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য সরকারের নির্ধারিত পরিমাণ কর কমিয়ে দিচ্ছেন মর্মে দুদকে অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ অনুসারে, এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তাদের এ ধরনের অপকর্মের কারণে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা ঘুষ না পেয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার মিথ্যা মামলা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিককে হয়রানি করে থাকেন। এমন নানা অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযোগসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে।’