আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতিমূলক কাজের সময়সূচিভিত্তিক রোডম্যাপের খসড়া চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বুধবার (২০ আগস্ট) অথবা আগামীকাল বৃহস্পতিবার কমিশন বৈঠকে অনুমোদনের পর নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে ইসি সচিবালয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে (রমজানের আগে) এই নির্বাচন হবে। এই হিসাব অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের জন্য বাকি আছে আর মাত্র পাঁচ মাস। ফলে আইন অনুযায়ী ভোটের ৫০-৬০ দিন আগে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করে নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকবে এই রোডম্যাপে।
নির্বাচন কমিশনের একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অন্যান্য সংসদ নির্বাচনের মতো ইসির এবারের নির্বাচনি রোডম্যাপেও থাকবে দুই ডজনের বেশি নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম। এসব কার্যক্রমের মধ্যে গুরুত্ব বিবেচনায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে অন্তত ১০টি কার্যক্রম। সেগুলো হলো নির্বাচনি আইন (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) সংস্কার, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, নতুন দলের নিবন্ধন, দল ও অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ, সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, প্রবাসীদের ভোট, নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সভা।
তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিসহ ইসির সামনে রয়েছে সাতটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেগুলো হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা, ভোটারদের আস্থায় আনা ও উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, অপপ্রচার ও এআইয়ের ব্যবহার বন্ধ করা, প্রার্থীদের আচরণবিধি মানানো, মাঠে দায়িত্বরতদের নিরপেক্ষ এবং ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমুক্ত রাখা।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচনবিষয়ক বিশ্লেষক আব্দুল আলীম খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘এটা ইসির খুবই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণার পর ভোট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের চলমান বিতর্ক ও অনাস্থা কেটে যাবে। ইসির কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
রোডম্যাপের মাধ্যমে মানুষ জানবে কত তারিখে ইসি কোন কাজটা করবে। এতে জনমনে ভোটের ব্যাপারে একধরনের পজিটিভ ধারণা তৈরি হবে। নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনরাও আস্থাশীল হবেন। তবে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে রোডম্যাপে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রস্তুতিমূলক সব কাজ শেষ করা এবং তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের দিন ও ভোট পরবর্তী নানা পরিস্থিতি তাদের মোকাবিলা করতে হবে।’
সম্প্রতি সরকারের নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় এবং ইসির রোডম্যাপ ঘোষণার সিদ্ধান্তকে বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে। তবে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের নির্বাচনের সময় নিয়ে রয়েছে আপত্তি। এ ছাড়া ভোটের মাঠে এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিত থাকার পরিস্থিতিসহ সার্বিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা ইসির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। কারণ এমন পরিস্থিতিতে সব দলের সহায়তার সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি এবং ভোটারদের আস্থা ফেরানো সংস্থাটির জন্য এবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিকল্পনা জানতে চাইলে ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ ভোটের সব ধরনের চ্যালেঞ্জকে ইসি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। রোডম্যাপ ঘোষণার পর আমি মনে করি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কারণ তখন যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন, তারা সবাই নির্বাচনমুখী হবেন। তফসিল থেকে ভোটের পর ১৫ দিন পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি, নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখার কর্তৃত্বও থাকবে ইসির। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সফল করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আশা করি প্রবাসীদের ভালো রেসপন্স আমরা পাব।’
এদিকে রোডম্যাপ ঘোষণার আগেই নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজই এগিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি ইসির নির্বাচনি রোডম্যাপে থাকা কার্যক্রমগুলোর সম্ভাব্য সময়ও জানা গেছে। অক্টোবরের মধ্যে মূল প্রস্তুতির কাজ সীমানা নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংস্কার, আচরণবিধিমালা জারি, ভোটার তালিকাসহ সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যাবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট নিতে প্রয়োজনীয় অ্যাপসহ আনুষঙ্গিক কাজ এবং তরুণ ভোটারদের নিয়ে সম্পূরক ভোটার তালিকার কাজ নভেম্বরে শেষ করতে চায় ইসি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ছোটখাটোসহ অন্তত ৪৪টি সংস্কার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বরে দল, অংশীজনের সংলাপ, প্রশিক্ষণ, কর্মকর্তাদের ব্রিফিং, আন্তমন্ত্রণালয় সভা, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কার্যক্রম, ম্যানুয়াল ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা মুদ্রণ, ভোটকেন্দ্রের সম্ভাব্য তালিকা ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল প্রস্তুত, নির্বাচনি সরঞ্জাম কেনাকাটা সরবরাহ, বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
হালনাগাদের পর খসড়া ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবে ৩১ আগস্ট। আর সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে অক্টোবরে। ৩১ অক্টোবর ভোটারযোগ্য তরুণসহ বাদ পড়াদেরও জাতীয় নির্বাচনে ভোটের সুযোগ দিতে সম্পূরক তালিকা হবে, যা নভেম্বরে চূড়ান্ত হবে। এ ছাড়া প্রবাসী ভোটারদের প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার দিতে অনলাইন নিবন্ধন অ্যাপ ও পোস্টাল ব্যালটের বিষয়টি নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী ২৪ আগস্ট থেকে সংসদীয় এসব আসনের খসড়া সীমানা নিয়ে আপত্তি আবেদনের শুনানি শুরু হবে। সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে এবার ৮৩টি আসন থেকে ১ হাজার ৭৬০টি দাবি আপত্তি আবেদন ইসিতে জমা পড়ে। এগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত সীমানা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। চলবে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত। নতুন দলের নিবন্ধন বাছাই শেষে বাদ পড়েছে ১২১টি আবেদন। বাছাইয়ে টিকে থাকা ২২টি দলের ব্যাপারে মাঠপর্যায়ে তদন্ত চলছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এবার অন্তত ৩১৮টি দেশি পর্যবক্ষক সংস্থার আবেদন বাছাই করছে ইসির কমিটি। আর নির্বাচনি সরঞ্জাম কেনাকাটা সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
এবার ভোটের সময় নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতেও পদক্ষেপ নিয়েছে ইসি। সেই লক্ষ্যে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটের অনিয়ম তদন্তে একটি কমিশনের কাজ চলছে। আলাদাভাবে তিন নির্বাচনে সম্পৃক্তদের বিষয়ে মামলাও হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন নির্বাচনের ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, নির্বাহী হাকিমদের তালিকাও সংগ্রহ করছে পুলিশের একটি সংস্থা। নির্বাচন কমিশনও বলছে, অনিয়মে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন কর্মকর্তাদের এবার দায়িত্বে রাখা হবে না। সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যাংক কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকেন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার মিলিয়ে প্রায় সোয়া ৯ লাখের মতো লোকবল দরকার হতে পারে আগামী সংসদ নির্বাচনে।