ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয় রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন বহুদূর চকরিয়ায় বাক প্রতিবন্ধী যুবককে ধাক্কা দিয়ে পালালো গাড়ি বিশ্বকাপের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলবেন নয়্যার কৌশলগত সম্পর্কের পথে ঢাকা-বেইজিং নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা মধুখালীতে দুইদিনে দুই মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর কমল দাদার পাঠশালা এমপি আসলে আগে পায়ে একটা মেরে দিব: এমপির পিএ ও যুবদল কর্মীর অডিও ভাইরাল লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১৬ মেহেরপুর সীমান্তে ৪ জনকে পুশইনের চেষ্টা বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৬০ হাজার ৫৮৮ হাজি, মৃত্যু ৫৪ ‘দোষ সব আমার, খেলোয়াড়দের ওপর থেকে নজর সরান’: প্যারাগুয়ে কোচ শুক্রবারের নির্ধারিত মার্কিন-ইরান আলোচনা বাতিল : সুইজারল্যান্ড মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায় আর্থিক সংকটে ভর্তি অনিশ্চিত, শিক্ষার্থীর পাশে প্রতিমন্ত্রী অনুবাদ হয় না মানুষের স্মৃতির ভেতর অন্ধকারের গান প্রেমের এলিজি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত দুবাইগামী যাত্রীর লাগেজ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ রেকর্ড থেকে ৫ কদম দূরে দিবু মার্তিনেস সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা জুহান্নুস: ফিনল্যান্ডের সেই অনন্য উৎসব, যখন পুরো দেশ চলে যায় প্রকৃতির কোলে জামিন পেয়েও নতুন মামলায় আটক সাবেক শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী হাইতি ম্যাচে পরিবর্তনের আভাস আনচেলত্তির

ছয় ইসলামি ব্যাংক থেকে ছাঁটাই সাড়ে চার হাজার কর্মী

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৩ এএম
ছয় ইসলামি ব্যাংক থেকে ছাঁটাই সাড়ে চার হাজার কর্মী
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

ইসলামি শরিয়াভিত্তিক ছয়টি ব্যাংক থেকে গত এক বছরে প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ব্যাংক। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়েছে। এর পর পরই এই ব্যাংকগুলোতে গণহারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাঁটাই করা হয়েছে। এতে নিদারুণ কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন এই কর্মকর্তারা। 

তারা বলছেন, সব ধরনের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কোনো কারণ ছাড়াই, এমনকি ব্যাংকিং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। এদিকে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখনো ছাঁটাই-আতঙ্ক আছে বলে জানা গেছে। 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনের পর পরই ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। একইভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৩৮ জন, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৮০০, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে ৫৪৭, ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ৪০০ এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ৭ জন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই চট্টগ্রামের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত ছিলেন। 

তবে চট্টগ্রামের বাইরেও, এমনকি প্রধান কার্যালয়ের অনেক কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। 

এভাবে গণহারে ছাঁটাইয়ের ফলে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তারা বলছেন, ছাঁটাই প্রক্রিয়াটি ছিল সম্পূর্ণ অন্যায় এবং নিয়মবহির্ভূত। কর্মীদের কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অনেক কর্মী সকালে অফিসে গিয়ে দেখতে পান যে তাদের কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড কাজ করছে না। কাকে, কী কারণে বা কী অভিযোগে ছাঁটাই করা হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি কর্তৃপক্ষ; যা ব্যাংকিং নিয়মাবলির পরিপন্থি। ছাঁটাইয়ের কারণ জানতে চাইলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শুধু জানিয়েছে, এটি ‘হাই অথরিটির নির্দেশ’। সেই কর্তৃপক্ষ কারা, তা স্পষ্ট করেনি ব্যাংক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা নোটিশ ছাড়াই ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৭৫০ কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা হয়েছে। ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন চট্টগ্রামের। এই আকস্মিক ছাঁটাইয়ের ফলে কর্মীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ অমানবিক’ এবং সার্ভিস রুলসের পরিপন্থি। তিনি বলেন, বিবিএ ও এমবিএ শেষ করে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই তিনি ২০১৬ সালে সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে বেকার এবং তার জন্য পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ব্যাংকটিতে অতিরিক্ত কর্মী ছিলেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যাংকে কোনো অতিরিক্ত কর্মী ছিলেন না। যদি থাকতেন, তাহলে ব্যাংক আবার নতুন করে কর্মী নিয়োগ দিত না। 

একদিকে ছাঁটাই করার পাশাপাশি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গোপনে নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। এই নতুন নিয়োগগুলো বেশির ভাগই চট্টগ্রামের বাইরে থেকে করা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যেখানে ব্যাংক আর্থিক সংকটের কথা বলছে, সেখানে নতুন কর্মীদের দুই-তিন ধাপ ওপরে পদোন্নতি ও বেতন বাড়িয়ে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যেমন- যিনি অন্য ব্যাংকে প্রিন্সিপাল অফিসার ছিলেন, তাকে এখানে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এসভিপি (SVP) বা এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ইভিপি (EVP) পদে উচ্চতর বেতনে নিয়ে আসা হয়েছে।

এদিকে ইসলামী ব্যাংকে নতুন পরিচালনা পর্ষদ নিযুক্ত হওয়ার পরই ব্যাংকটি থেকে গণহারে ছাঁটাই করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের শুধু গণহারে ছাঁটাই করা হয়েছে তা-ই নয়, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত কর্মীদের কোনো রিলিজ অর্ডার বা অভিজ্ঞতার সনদপত্র দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে আমরা অন্য কোথাও চাকরির আবেদন করতে পারছি না। আমাকে যদি এখন এখান থেকে একটা রিলিজ অর্ডার দেওয়া না হয়, তাহলে আমি তো অন্য ব্যাংকে বা কোথাও আবেদন করলে আমাকে চোর মনে করবে, অথচ আমি তো চুরি করি নাই।’ 

তিনি আরও বলেন, এই ঘটনার পেছনে বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। একটি ‘অদৃশ্য শক্তি’ এই পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ব্যাংকিং খাতকে অস্থিতিশীল করতে এবং চট্টগ্রামের কর্মকর্তাদের ব্যাংকিং পেশা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এটি একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ হতে পারে।

গত জুলাইয়ে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার ৫৪৭ জন কর্মকর্তাকে পৃথক ই-মেইলের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করেও তারা চাকরি ফেরত পাননি। 

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাবি করেছে, ২০২১ সাল থেকে ব্যাংকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসংগতি রয়েছে। কোনো ব্যাংক নিজেদের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি প্রকাশ করে না। অথচ এই ব্যাংক নিজেদের দোষ জনসমক্ষে প্রকাশ করছে।’ 

অপর একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘যদি আপনি আমাকে অবৈধ নিয়োগ বলে টার্মিনেট করেন, তাহলে আপনার পুরো অথরিটিকেই টার্মিনেট করতে হবে। কেননা আমার ওই নিয়োগের সঙ্গে সে সময় আপনিও সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্পৃক্ত ছিল।’ 

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ব্যাংকটির চট্টগ্রাম শাখার জোনাল অফিসের হেড হিসেবে যিনি নিয়োগ পেয়েছেন, তিনি এর আগে ব্র্যাক ব্যাংকে কাজ করেছেন। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে তার কোনো ধরনের অভিজ্ঞতাই নেই। তাহলে তিনি কিভাবে ইসলামী ধারার একটি ব্যাংকে এতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেলেন?  

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২১ সাল থেকে ব্যাংকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে বেশ কিছু অনিয়মের চর্চা হয়েছে। নতুন পর্ষদ যাচাই-বাছাই করে অযোগ্যদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছে বলেও দাবি করেছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকের বর্তমান প্রশাসনের এই দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক প্রায় এক হাজার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছে। অনেকের বাড়ি শুধু চট্টগ্রাম হওয়ার কারণেও নাম ছাঁটাইয়ের তালিকায় উঠে আসে। ইউনিয়ন ব্যাংক থেকেও প্রায় ৪০০ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। 

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেসব ব্যাংকে নতুন করে ছাঁটাই-আতঙ্ক শুরু হয়েছে। আতঙ্কে ভুগছেন বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাইয়ের নামে মূল্যায়ন পরীক্ষাসহ নানা কৌশল নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। 

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে আবার নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকা করা হয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। যদিও এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, নতুন করে ছাঁটাইয়ের কোনো পরিকল্পনা নেই। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একীভূতকরণের যে কৌশল দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, একীভূত হওয়ার তিন বছরের মধ্যে কারও চাকরি যাবে না। 

জানতে চাইলে এসআইবিএল ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) নাজমুস সাদাত খবরের কাগজকে বলেন, এসআইবিএল ব্যাংকে এখন নতুন করে ছাঁটাইয়ের কোনো পরিকল্পনা নেই। 

জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে তিনিও এই ব্যাংকের বাদ পড়াদের তালিকায় ছিলেন। পরে তাকে আবার নিয়োগ দেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। 

একই বিষয়ে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘অনেক ব্যাংকেই কর্মকর্তাদের ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। পটপরিবর্তনের পর কর্মী ছাঁটাই করছে কিছু ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ। তবে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে কোনো ছাঁটাইয়ের ঘটনা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণের যে রূপরেখা দিয়েছে, সেখানেও ছাঁটাইয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে, একীভূতকরণের তিন বছরের মধ্যে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হবে না।’ 

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, অন্যায়ভাবে কাউকে চাকরিচ্যুত করা হলে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কর্মকর্তাদের ইচ্ছামতো চাকরিচ্যুত করা যাবে না বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে নির্দেশনা রয়েছে, তা এখনো বহাল আছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাচের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যদি অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলো ব্যবস্থা নিতে পারবে। তবে বেছে বেছে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের জানুয়ারিতে এক প্রজ্ঞাপনে নির্দেশনা দেয়, লক্ষ্য অর্জন না করার অজুহাত তুলে ব্যাংকারদের চাকরিচ্যুত করা যাবে না। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শুধু নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারা বা অদক্ষতার অজুহাতে ব্যাংক-কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত কোনো অভিযোগ না থাকলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করা বা পদত্যাগে বাধ্য করা যাবে না।

নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
নিত্যপণ্যের বাজারে নেই মূল্যতালিকা
ভোগ্যপণ্যে ঠাসা মুদি দোকানে দেখা যায়নি কোনো মূল্যতালিকা। ছবিটি চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকা থেকে তোলা/ মোহাম্মদ হানিফ।

চট্টগ্রামে নিত্যপণ্যের বাজারে অধিকাংশ দোকানেই মূল্যতালিকা দেখা যায় না। ফলে একই পণ্য সব দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পণ্যের প্রকৃত মূল্য নিশ্চিত হতে না পেরে প্রতিদিনই বিভ্রান্তি ও ভোগান্তির মুখে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, মূল্যতালিকা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছেন। ফলে তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে নিয়মিত তদারকি এবং মূল্যতালিকা প্রদর্শন জরুরি বলে মনে করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরীর কাজীর দেউড়ি, চকবাজার, বহদ্দারহাট, হালিশহর, রিয়াজউদ্দিন বাজার এবং রাস্তার পাশের খুচরা দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে মূল্যতালিকা নেই। কিছু কিছু দোকানে থাকলেও তারিখ ও পণ্যের দাম পরিবর্তনের দিকে বিক্রেতার খেয়াল নেই। আবার বিভিন্ন দোকানে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কাজীর দেউড়ি বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তার পাশে ব্যাটারি গলিতে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন অলিগলির খুচরা বাজারে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ (হালি জাত) বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। অথচ রিয়াউদ্দিন বাজার থেকে বের হয়ে দেখা যায়, একই পেঁয়াজ ভ্যানগাড়িতে ৩ কেজি ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ৩৩ টাকা। বাজারভেদে মাছ, মাংস, সবজির দামেও এ রকম হেরফের দেখা গেছে। 

এদিকে মূল্যতালিকা না থাকার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর মেলেনি। ব্যবসায়ীদের একেক জনের রয়েছে একেক রকম যুক্তি। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তাদের কাছে একাধিক মূল্যতালিকা রয়েছে, কিন্তু বাজারে মূল্যতালিকা কেউ টাঙায় না। তাই তিনিও রাখেননি। আবার কেউ জানিয়েছেন, মূল্যতালিকা রাখলে বা কম দামে পণ্য বিক্রি করলে, যারা বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করে তাদের সঙ্গে ঝগড়া হয়। তাই ঝগড়া এড়াতে এবং যে যার মতো করে ইচ্ছামতো দামে পণ্য বিক্রি করতে মূল্যতালিকা রাখেন না। 

রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী মো. শওকত বলেন, ‘আপনি পুরো বাজার ঘুরে দেখেন কোনো মূল্যতালিকা নেই। সবাই যেহেতু মানছে না, আমি আর একা মূল্যতালিকা রেখে লাভ কী!’

হালিশহর কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী মো. আলম বলেন, ‘আমার কাছে ৩টা মূল্যতালিকা আছে। কিন্তু রাখা হয়নি। কারণ একটি পণ্য একেক জায়গায় একেক দামে বিক্রি হয়। আমি একটি পণ্যের দাম পাশের দোকানদারের তুলনায় কম লিখলাম। তখন আমাদের ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হয়।’ 

নগরীর ফইল্যাতলী এলাকার বাসিন্দা আল আমিন বলেন, ‘এক লিটার গরুর দুধ কিনতে গেলাম। এক দোকানে ৮০ টাকা, পাশের আরেক দোকানে ৯০ টাকা। অন্য ভোগ্যপণ্যের দামেও একই অবস্থা। অর্থাৎ দামে কোনো স্বচ্ছতা নেই। তাই এখন বাজার করতে গেলে আগে পুরো বাজার ঘুরি। যেখানে কম দাম বলে সেখান থেকেই কিনি। কিন্তু এটা তো আমাদের জন্য কষ্টদায়ক। সব জায়গায় একই দাম থাকলে যে যেখান থেকে ইচ্ছা কিনতে পারেন। ক্রেতারাও বিভ্রান্ত হন না।’ 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ জানান, যখনই কোনো বাজারে অভিযান চালানো হয়, সেখানে কেউ বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করছে কি না, মূল্যতালিকা ও কেনা-বেচার পাকা রসিদ আছে কি না- ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখা হয়। 

ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘মূল্যতালিকা রাখা বা বেশি দামে পণ্য বিক্রির বিষয়ে বিভিন্ন সভা, সেমিনার করেও কোনো লাভ তো হচ্ছে না। পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ী দুজনই নানা কায়দায় জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়। বাজারকে কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে। ফলোআপ করতে হবে। তাহলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’

পোলাওয়ের চাল ১৯০ টাকা কেজি!

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:২৩ এএম
পোলাওয়ের চাল ১৯০ টাকা কেজি!
ছবি: সংগৃহীত

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন। এই বাজেটের কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই থেকে। কিন্তু ইতোমধ্যে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে বাজেটে মসলাসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের দাম কমাতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু সাত দিন চলে গেলেও এক টাকা কমেনি এসব পণ্যের দাম। আগের মতোই বেশি দামে চাল, ডাল, মসলা বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া, পাঙাশসহ অন্য মাছের দামও কমেনি। কোরবানি ঈদের পর চাহিদা কমলেও আগের মতো চড়া দামে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। বাজার সবজিতে ভরা থাকলেও অধিকাংশ সবজির দাম ১০০ টাকার বেশি।

বিক্রেতারা বলছেন, সরকার মুখে বললেও বাজার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই তো কোনো জিনিসের দাম কমে না। ভরা মৌসুমেও এক কেজি পোলাওয়ের চাল  বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করে সরকার। তাতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই রাজস্ব আদায়ে অর্থমন্ত্রী বেশ কিছু পণ্য ও সেবায় দাম কমার প্রস্তাব করেছেন সাধারণ মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে। ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি পণ্যের দাম কমাতে উৎসে কর এবং খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়ার মতো মসলার দাম কমাতে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক কমার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু গতকাল বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে এসব জিনিসের দাম এক টাকাও কমেনি।

মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের মো. বাবু মিয়াসহ অন্য বাজারের খুচরা বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার যাই বলুক বাজার চলছে বাজারের মতো । মিল থেকে দাম না কমালে আমরা কীভাবে কম দামে বিক্রি করব। কাজেই মিলে যাতে দ্রুত দাম কমে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারব। ভোক্তারাও কম দামে কিনতে পারবেন। বর্তমানে সব পণ্যের দাম ঝিম ধরে আছে।’

বেশি দামেই চাল বিক্রি

গতকালও আগের মতো মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, আটাশ ৬০ থেকে ৬৫ ও মোটা চাল ৫০ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হয়। দেশি মসুর ডাল ১৬০ টাকা, আমদানি করা ডাল ১২০ টাকা, ছোলা ৯০ থেকে ১০০ টাকা, ২ কেজির প্যাকেট আটা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, চিনি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।  

টাউন হল বাজারের মায়ের দোয়া রাইস স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রিয়াদ হোসেন বলেন, ‘বোরো ধান ওঠা শেষ। তার পরও চালের দাম কমছে না। ব্যবসায়ীরা গোডাউনে ধান ভরে নিয়েছেন। মিল থেকে এখনো বেশি দামে পুরোনো চাল বিক্রি করছে। মিলমালিকদের না ধরলে চালের দাম কমবে না। প্রাণ, চাষি গ্রুপসহ অন্যরাও ইচ্ছামতো পোলাও চালের দাম বাড়িয়েছে, যা ১৯০ টাকা কেজি। আজব এ দেশ।’

কোরবানির ঈদের আগে আদার দাম বাড়লেও গতকাল তা ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, আলু ৩০ টাকা, দেশি রসুন ১০০ টাকা, চায়না রসুন ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়। শুল্ক কমানো হলেও মসলার দাম কমেনি। আগের মতো গতকালও  লবঙ্গের কেজি দেড় হাজার টাকা, দারুচিনি ৫২০ টাকা, জিরা ৬৫০ টাকা ও এলাচ সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।’ খেজুর বিক্রেতারাও জানান দাম কমেনি। নিউ মার্কেটের মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আগের দামেই সব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। বাজেটের পণ্য দেশে এলে কমতে পারে।’

অধিকাংশ সবজি ১০০ টাকার ঘরে

বাজারে এখনো শীতের কপি, টমেটো বিক্রি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালের সবজিও ভরে আছে। তার পরও বেগুনসহ অধিকাংশ সবজি যেন ১০০ টাকা কেজিতে স্থির হয়ে গেছে। বিভিন্ন বাজারে টমেটো ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শসা ৭০ থেকে ১০০, বরবটি ও কচুরলতি ৮০ থেকে ১০০, কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৪০, শজনেডাঁটা ২০০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ৪০ থেকে ৬০, পটোল ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। গ্রীষ্মকালের ঝিঙা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গাও ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৬০ থেকে ৭০ টাকার কমে মেলে না। নিউ মার্কেট বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. সবুজসহ অন্য বিক্রেতারা খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর প্রভাবে সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। আড়তে সব সবজিই বেশি দামে কেনা। তাই কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’

কমেনি মাছের দাম

কোরবানির ঈদের পরও মাছের দাম কমেনি। তেলাপিয়া মাছও আকারভেদে ২২০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। রুই, কাতল মাছও আগের মতো ৩৬০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি, নদীর চিংড়ি, কাজলি, ট্যাংরাসহ নদীর অন্য মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। তবে চাষ করা এসব মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। আগের সপ্তাহের মতোই গতকালও সোনালি মুরগির কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা, ব্রয়লার ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ ও  খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। তবে ডিমের দাম ১০ টাকা কমে ১১০ থেকে ১২০ টাকা ডজন বিক্রি হয়।

পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
পশুর শিংয়ে নান্দনিক শিল্পকর্ম কসাইয়ের
রাজশাহীর কসাই রিপন আলীর সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার শিং ও মাথার খুলি দিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম। ছবি: সংগৃহীত

পেশায় তিনি কসাই। প্রতিদিন পশু জবাই ও মাংস বিক্রিই তার কাজ। কিন্তু এই পেশার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন এক ভিন্ন জগতের সন্ধান। অন্যরা যেখানে পশুর মাথা ও শিংকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেন, সেখানে রাজশাহীর রিপন আলী সেগুলোকে রূপ দিচ্ছেন দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্মে। গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার পরিত্যক্ত মাথা সংগ্রহ করে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তৈরি করছেন ব্যতিক্রমী শোপিস, যা এখন দর্শনার্থীদের কৌতূহল ও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

৪০ বছর বয়সী রিপন আলী রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকার বাসিন্দা। গত এক দশক ধরে তিনি এই ব্যতিক্রমী শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তার সংগ্রহে শতাধিক নান্দনিক শোপিস জমা হয়েছে। বাড়ির একটি কক্ষজুড়ে সাজিয়ে রেখেছেন এসব শিল্পকর্ম। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রচুর মানুষ তার এই সংগ্রহ দেখতে ভিড় করছেন।

রাজশাহী নগরীর উপশহর এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রথমে কৌতূহল থেকে দেখতে এসেছিলাম। এখানে এসে আমি সত্যিই মুগ্ধ। সাধারণত যেসব জিনিস আমরা বর্জ্য হিসেবে দেখি, সেগুলোকে এত সুন্দর ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করা যায়, তা কল্পনাও করিনি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংগ্রহের ছবি দেখে এখানে এসেছি। কাছ থেকে দেখে আরও ভালো লাগছে। প্রতিটি শোপিসের পেছনে যে শ্রম, ধৈর্য ও মেধা রয়েছে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। একজন কসাইয়ের হাতে এমন ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’

জানা গেছে, রিপনের এই শিল্পযাত্রার শুরুটা হয়েছিল একেবারেই সাধারণ একটি ঘটনা থেকে। কসাইপট্টিতে কাজ করার সময় একটি বড় মহিষের শিং তার নজর কাড়ে। শিংটির সৌন্দর্য দেখে তিনি ভাবেন- এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান।

প্রথমদিকে কাজটি সহজ ছিল না। পশুর মাথা সংরক্ষণ ও দুর্গন্ধমুক্ত রাখার কোনো কার্যকর পদ্ধতি তার জানা ছিল না। এ বিষয়ে জানতে তিনি বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি। এরপর নিজেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। বছরের পর বছর চেষ্টা, ব্যর্থতার পর তিনি একটি কৌশল বের করেন। এই কৌশলের ফলে পশুর মাথা ও শিং দীর্ঘদিন পচনমুক্ত রেখে শৈল্পিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়।

রিপন জানান, ২০১৭ সাল থেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে এই কাজ শুরু করেন। তবে সব ধরনের পশুর মাথা তিনি সংগ্রহ করেন না। যেসব পশুর শিং বা মাথার গঠন দেখতে আকর্ষণীয় ও নান্দনিক, সেগুলোই বেছে নেন। পরে সেগুলো পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও শৈল্পিক উপস্থাপনের মাধ্যমে শোপিসে রূপ দেন।

এই কাজে তাকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। পশুর হাড় ও মাথা সংগ্রহ করে বাড়িতে রাখার কারণে একসময় পরিবার ও প্রতিবেশীদের সমালোচনা শুনতে হয়। দুর্গন্ধ ও অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেকে তাকে নিরুৎসাহিতও করেছিলেন। বর্তমানে পরিস্থিতি  বদলে গেছে। একসময় যারা তার এই কাজকে অদ্ভুত ভাবতেন, তারাই এখন প্রশংসা করছেন। এই শিল্পকর্মের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও অনেকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

রিপন আলী বলেন, আমি শুধু বাজার থেকে সংগ্রহ করা গৃহপালিত পশুর মাথা ও শিং ব্যবহার করি। কোনো সংরক্ষিত বা বন্যপ্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করি না। আমার বিশ্বাস, গৃহপালিত পশুর হাড় ও শিং দিয়ে তৈরি নান্দনিক শোপিস জনপ্রিয় হলে বন্যপ্রাণীর অঙ্গ দিয়ে ঘর সাজানোর প্রবণতা কমবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উদ্যোগ একদিন ক্ষুদ্র শিল্পে পরিণত হবে।

ছড়িয়ে পড়ছে এইডস: আক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
ছড়িয়ে পড়ছে এইডস: আক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইডস রোগী, বাড়ছে মৃত্যু। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একসময়ে এইচআইভি সংক্রমণ নগর ও শহরকেন্দ্রিক ছিল। এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে জেলা পর্যায়েও। এইডসে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন নতুন করে এইচআইভি সংক্রমণ কমছে, এইডসে মৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। তবে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চলতি বছর জেলা পর্যায়ে সমকামী তরুণদের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নজরে আসে সংশ্লিষ্টদের। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ (এসটিডি) কন্ট্রোল প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ১ হাজার ৪৩৮ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৯১ জনে, যা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ২০২৫ সালে এইডসে ২৫৪ জন মারা যান। অন্যদিকে চলতি বছরও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সময়েই আক্রান্তের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। সংক্রমিতদের বড় অংশের বসবাস ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের হার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে নতুন শনাক্তদের মধ্যে অবিবাহিতদের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই শ্রেণিতে সংক্রমণের হার ১০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এই হার চলতি বছরে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্ক, পর্যাপ্ত পরীক্ষা সুবিধার সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। অনেক মানুষ এখনো স্বেচ্ছায় এইচআইভি পরীক্ষা করাতে চান না। অন্যদিকে বিদেশগামী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, যা সংক্রমণ শনাক্তকরণকে আরও কঠিন করে তুলছে। খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যেও দেখা গেছে এইডস সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র। 

প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইডস সংক্রমণ। চলতি বছরের সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি এইডস এইচটিসি (এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং)/ এআরটি (অ্যান্ট্রি রিট্রোভাইরাল থেরাপি) সেন্টার। আর গত মে মাসে এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে জেলায় ৩৮৫ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিচ্ছেন।

বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গত মাসের শেষ দিকে জেলার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে তিন হাজারের বেশি মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে ২০ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ জনই উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। 

এআরটি সেন্টারের কাউন্সেলর জসিম উদ্দিন জানান, আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই এইচএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বয়স ১৭ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বরিশালে এসে তারা পড়াশোনা বা বসবাস করছেন।

সিলেট ব্যুরোপ্রধান জানান, জেলায় চলতি বছর ২২ জন এইডস আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, সিলেটে ২০২৪ সালে ৩১ জন, ২০২৫ সালে ৬৬ জন এবং ২০২৬ সালের মে মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত ২২ জন এইডস আক্রান্ত হয়েছেন। এটা সেনসেটিভ বিষয় তাই কারণ বলা যাবে না। সিলেটে রোগীদের অ্যান্টিভাইরাল ট্রিটমেট দেওয়া হয়। এইডস আক্রান্ত কেউ হাসপাতালে ভর্তি নেই।

যশোরের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ জন এইচআইভি সংক্রমিত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ১০ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী। এর মধ্যে ৯ জন তরুণ শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে সংক্রমিত ও আক্রান্ত হওয়া ৪৫ জনের মধ্যে ২৫ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো–আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ জনই শিক্ষার্থী। যেখানে ২০২৪ সালে মোট আক্রান্ত ২৫ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিলেন ১২ জন।

রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান জানান, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (সিএস) ডা. বায়েজীদ-উল ইসলাম বলেন, জেলায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১ হাজার ২১৯ জনের স্ক্রিনিং করে ৩৪ জন এইচআইভি পজিটিভ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ ও ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের। এর মধ্যে পুরুষ ৩১ জনের মধ্যে ৬ জন বিবাহিত ও বাকি ২৫ জন অবিবাহিত। বয়সের হিসাবে ৯ জন ২৫ বছরের নিচে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস (এইচটিসি) সেন্টার থেকে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২৪৮ জন এইচআইভি সংক্রমিতকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৪৩ জন, ২০২৫ সালে ৩৮ জন ও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১৮ জনের শরীরে এইচআইভি ধরা পড়েছে। ময়মনসিংহ জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় শ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। বাকিরা নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরসহ আশপাশের জেলার বাসিন্দা। 

ময়মনসিংহ থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. আবদুল আল মামুন বলেন, এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সমকামী পুরুষ। তাদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, যাদের বেশির ভাগই মেসে থেকে পড়াশোনা করেন। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এইচআইভি সংক্রমণের বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটে অরক্ষিত যৌন মিলনের কারণে। এইচআইভিতে আক্রান্ত পুরুষের মাধ্যমে স্ত্রীও আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমিত বাচ্চারও জন্ম হয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। এইডসে প্রথম মারা যান ২০০০ সালে। বর্তমানে দেশে অনুমিত এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ জন। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৩ জন। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন, তবে এখনো ২৬ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের চিত্রও উদ্বেগজনক। শনাক্ত সংক্রমিতদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ পুরুষ সমকামী, ১৪ শতাংশ পুরুষ যৌনকর্মী, ১২ শতাংশ প্রবাসী, ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং ৬ শতাংশ শিরায় মাদক গ্রহণকারী। নারী যৌনকর্মী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণের হার ১ শতাংশ করে। বাকি ২২ শতাংশ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শনাক্ত হয়েছে।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তদের সবচেয়ে বড় অংশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। মোট আক্রান্তের ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের হার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের উপস্থিতি রয়েছে। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এদিকে এইডস হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন (এএইচএফ) জানিয়েছে, দেশের ৪১টি জেলায় এখনো এইচআইভি পরীক্ষা চালানো যাচ্ছে না। ফলে দেশের বড় একটি অংশ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট সংক্রমিতদের প্রায় ১৮ শতাংশ এখনো শনাক্ত হয়নি। আবার শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ চিকিৎসা গ্রহণ করছেন না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এইচআইভি এমন একটি ভাইরাস, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ে অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম (এইডস) দেখা দেয়। বর্তমানে এই রোগের কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই। তবে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) ব্যবহারের মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমনের পর তাদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের বিস্তৃতি দেখা গেছে। তারা যেহেতু আমাদের দেশে রয়েছে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও অসামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণ বিস্তারের ঘটনা ঘটে।’

তিনি বলেন, আগে দেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। তবে বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার সামাজিক লজ্জা, কুসংস্কার ও বৈষম্যের ভয়ে অনেকেই পরীক্ষা বা চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী থাকেন। ফলে সংক্রমণ অজান্তেই আরও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

একসময়ে এইচআইভি সংক্রমণ প্রধানত বড় শহরকেন্দ্রিক থাকলেও এখন তা জেলা ও প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কেবল চিকিৎসা নয়, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই বিশেষজ্ঞ।

নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
নারায়ণগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি গেছে শ্রমিক লীগ নেতার ভাটায়
নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে পদ্মার উড়াল সেতুর পিলারের মাটি কেটে জলাশয়ে পরিণত করেছেন ঠিকাদারের লোকজন। ছবি: খবরের কাগজ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পদ্মা সেতুর রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলারের নিচে থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিয়েছেন ঠিকাদার। পিলারের নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লক তুলে ফেলা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে মাটি কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মাটি কাটায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত পদ্মা রেলসেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার্স কোর। প্রকল্পটির প্রধান নির্মাতা চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। তবে বাংলাদেশের সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে রিংটেক লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান আলীগঞ্জ ভায়াডাক্ট (উড়াল সেতু) নির্মাণে যুক্ত ছিল। দুটি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনো তারা প্রকল্পের বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করে যাচ্ছে। এমনকি বিক্রি থেকে বাদ যায়নি মাটিও।

গতকাল মঙ্গলবার আলীগঞ্জ উড়াল সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক্সক্যাভেটর (ভেকু) দিয়ে মাটি কাটার কারণে রেললাইনের সংযোগ সেতুর পাঁচটি পিলারের নিচের দুই পাশে মাটি নেই। রেললাইনের ৮৫ নম্বর পিলার থেকে শুরু করে ৮৯ নম্বর পিলার পর্যন্ত পিলারের প্রায় ১৭৫ মিটার এলাকাজুড়ে গভীর করে মাটি কাটায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকগুলো তুলে ওপরে ফেলে রাখা হয়েছে। এতে পদ্মা সেতুর সংযোগ রেললাইনের উড়াল সেতুর পিলারের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় প্রতিবাদ জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে স্থানীয় একটি ইটভাটার মালিক পরিচয়ে পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে ট্রাকভর্তি করে দাপা এলাকায় নিয়ে গেছে। এলাকাবাসী বাধা দিলে ইটভাটার মালিক কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার এবং ফতুল্লা শ্রমিক লীগ নেতা আবু বক্কর তা মানেননি, বরং রেলসেতুর পিলারের পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার পাশাপাশি মাটির নিচে থাকা সিমেন্টের ব্লকও তুলে ফেলা হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে চলাচলের রাস্তাও। মেম্বার এলাকাবাসীকে জানিয়েছেন, ঠিকাদারের কাছ থেকে তার ভাটার জন্য তিনি মাটি কিনেছেন। পরে মাটি কাটার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের লোকজন মাটি কাটা বন্ধ করে দেন। তবে মাটি ফেরত এনে খনন করা গর্ত ভরাট করা না হলে রেল চলাচলের অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। 

ভিডিও দেখে মাটি কাটা বন্ধ করে দেওয়া সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ওইখানে রেলওয়ের লোকজনসহ ঠিকাদারদের মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছি। রেললাইনের সংযোগ উড়াল সেতুর পিলার রক্ষার পরবর্তী কাজ করবে রেল কর্তৃপক্ষ।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাটি কাটার কোন বৈধ অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক রায়হান কবির। তিনি খবরের কাগজে বলেন, মাটি কাটার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে দেশি-বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে নথিপত্রসহ হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু তাদের মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসন তাই মাটি কাটা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি গর্ত ভরাটে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

মুঠোফোনে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, রেলওয়ে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মাটি কাটার অনুমতি দেয় না। যারা মাটি কেটেছে তাদের মাটি নেওয়ার চুক্তিও নেই। তাদেরকে মাটি অপসারণের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অনুমোদনহীন মাটি কাটার বিষয়ে ইতোমধ্যে রেলওয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তদন্ত কমিটিই পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।