বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার প্রবণতা কমলেও বাংলাদেশে এই অপমৃত্যুর হার এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরী তথা তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এর বাইরেও সামাজিক অস্থিরতা, মাদকাসক্তি, ঋণগ্রস্ত হওয়া এবং মানসিক অসুস্থতা থেকে বিভিন্ন বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। এরই মধ্যে কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গত ২০ মাসে ১৬৯ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তির মানসিক অসুস্থতা উপেক্ষিত থাকায় আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বাড়ছে। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকেন। অন্যদিকে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রোগটি হচ্ছে মানসিক বিষণ্নতা। এমনই এক প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন করে সহানুভূতিশীল ও সহায়ক আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলা’।
এদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে সারা দেশে আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’ একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে সারা দেশে ৩১০ জন, ২০২২ সালে ৫৩২ এবং ২০২৩ সালে ৫১৩ জন আত্মহত্যা করেছে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে কিশোর-কিশোরীরা, যা মোট আত্মহত্যার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি। এই হার ৪৬ শতাংশের ওপরে। এর পরে আছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের তথা স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।
ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের নবনির্মিত রবীন্দ্র ভবনের নিচে সঞ্জু বারাইক (২৩) নামের এক শিক্ষার্থীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা করেন ওই শিক্ষার্থী।
আরেক ঘটনায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আনিকা মেহেরুন্নেসার (২৪) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর খিলগাঁওয়ে বাবা-মার সঙ্গে অভিমান করে নিজের রুমে আত্মহত্যা করে দিয়া জামান সুরমা (১৪)। দিয়া খিলগাঁও কোয়ালিটি এডুকেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এরকম আরও অনেক করুণ ঘটনা অতি সম্প্রতি ঘটেছে বলে জানা যায়।
আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা যায়, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থী ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে কলেজ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া গত বছর ঢাকা বিভাগে আত্মহত্যার হার ছিল অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় বেশি; ২৯ শতাংশ। এর পরে রয়েছে খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগ। সবচেয়ে কম আত্মহত্যা সিলেট বিভাগে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা এমনিতেই বেশি। তার ওপর আরও কিছু কারণ আছে, যা থাকলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে আত্মহত্যার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। সেরকম ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে একাকিত্ব (অবিবাহিত বা ডিভোর্সি), অতি আপন বা প্রিয়জনের মৃত্যু অথবা বিচ্ছেদজনিত শোক, বেকারত্ব বা চাকরিচ্যুতি, অস্থির বা দুষিত সামাজিক পরিবেশ, পরিবারের কারও মানসিক রোগ, মাদকাসক্তির ইতিহাস, দুরারোগ্য বা যন্ত্রণাদায়ক শারীরিক রোগ। মানসিক রোগাক্রান্ত ব্যক্তি একবার আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালানোর পর তা থেকে বেঁচে গেলেও পরে তার আবারও আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালানোর ঝুঁকি থাকে অনেক বেশি।
ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, এসব ক্ষেত্রে আগে থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে বেশির ভাগ আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। সে জন্য আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা দরকার। কারণ, যত দিন যাবে ঝুঁকি তত বাড়তে থাকবে। শনাক্তের পর আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আক্রান্ত হলে মানসিক স্বাস্থ্যের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকাসক্ত হলে তা রোধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
একটি গবেষণার তথ্যমতে, ১০ শতাংশ সিজোফ্রেনিক রোগী আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া মাদকাসক্তদেরও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশি। অ্যালকোহলে আসক্ত বা মাদকাসক্তদের ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া হেরোইন আসক্তদের আত্মহত্যার ঝুঁকি মাদকমুক্ত ব্যক্তিদের তুলনায় ২০ গুণ বেশি।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু যখন সে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে সমন্বয় করতে পারে না, তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ ছাড়া সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় সে একাকিত্বে ভোগে এবং আত্মহননের পথ বেছে নেয়।’
ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, উন্নত দেশগুলোতে স্কুলের সিলেবাস অনুসরণ করে পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক কাউন্সেলিংও করানো হয়। আমাদের দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়) মানসিক কাউন্সেলিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
একই প্রসঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘পারিবারিক কলহ, বেকারত্ব, প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া, ঋণগ্রস্ত থাকা, মাদকাসক্তি ও বাবা-মায়ের সঙ্গে অভিমান করেও অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে থাকে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শিক্ষার্থী এবং উঠতি বয়সীদের কাউন্সেলিং করাতে পারলে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকটা রোধ করা সম্ভব।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০ মাসে ১৬৯ জনের আত্মহত্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আত্মহত্যার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে গলায় ফাঁস দিয়ে ৫৯ জন এবং বিষপানে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। এসব ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত, অর্থাৎ গত ২০ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৬৯ জন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬০ জন, শিবগঞ্জ উপজেলায় ৪৮ জন, গোমস্তাপুর উপজেলায় ২৯ জন, নাচোল উপজেলায় ২৫ জন ও ভোলাহাট উপজেলায় ৭ জন গলায় ফাঁস এবং বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহীন কাউসার বলেন, ‘যখন কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি নিজেকে কোনো না কোনো ঘটনার জন্য দায়ী মনে করেন। তিনি নিজে অথবা অন্যকে সরাতে আত্মহত্যা করেন। এটা রোধ করার জন্য আমাদের পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার ড. আশরুফুজ্জান শাহিন বলেন, ‘শরীরের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ম নেওয়া খুব জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্যের সেবা দেওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও নার্সদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’
নামোশংবাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসলাম কবির বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ইদানীং পড়ালেখা এবং রেজাল্ট ভালো করা নিয়ে আগের চাইতে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন থাকে। পড়াশোনা এখন প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার চাপে কিশোর-কিশোরীদের কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এ ছাড়া বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের নানা ধরনের মানসিক টানাপোড়েন, হতাশা ও অবসাদের মতো জটিল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এ সময় পিতামাতাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।’
এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘আত্মহত্যা একটি সামাজিক সমস্যা। একে প্রতিরোধ করতে হলে সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করতে হবে।’