ঢাকা ২ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিশ্বকাপ ইতিহাসে নাম লেখালেন ভোজিনিয়া-ইয়ামাল শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিল নবাগত কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ অভিষেকে রেকর্ড গড়ল কেপ ভার্দে দুই ছেলের নামে ২ ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে যা জানালেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মানবিক রাষ্ট্র গঠনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী প্রথমার্ধে স্পেনকে আটকে দিল কেপ ভার্দে চট্টগ্রামে মেরিন সার্ভেয়ারদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত মতলবে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিকে স্বাগত জানাল বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ বিশ্বকাপে শুরুতেই বড় হার, ম্যাচ শেষ হতেই কোচ বরখাস্ত নবজাতকের মরদেহ টানাটানি করছিল কুকুর, উদ্ধার করল পুলিশ গোপালগঞ্জে যৌতুকের জন্য স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হুইলচেয়ারে মাঠ ছাড়লেন কুবো, জাপান শিবিরে উদ্বেগ মৌলভীবাজারে তিন মাসের ভোগান্তির পর চিকিৎসাসেবা পেল চা-বাগানবাসী শার্শায় প্রবাসীর স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৩ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামেও বসবে এআই ক্যামেরা: চসিক মেয়র স্পেনের একাদশে নেই ইয়ামাল ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত জন প্রত্যাশা পূরণ হয়নি’ রাজশাহীকে বাসযোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত শহর গড়ার প্রত্যয় আরডিএ’র নতুন চেয়ারম্যানের কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না ইস্তিগফারের এমন ক্ষমতা জানলে আপনি অবাক হবেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সালিশ বৈঠকে প্রতিপক্ষের হামলায় শ্রমিক দল নেতা নিহত জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী পর্তুগালের পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কিশোর আইসিইউতে সোনালী লাইফের ‘M.G.Q Leaders Club Awards Program 2024-2025’ অনুষ্ঠিত বাউয়েটের ২৩তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত পুশইন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়নে একমত উভয় পক্ষ
Nagad desktop

শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:১৮ পিএম
আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:২৩ পিএম
শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি

বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার প্রবণতা কমলেও বাংলাদেশে এই অপমৃত্যুর হার এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বলে জানা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরী তথা তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এর বাইরেও সামাজিক অস্থিরতা, মাদকাসক্তি, ঋণগ্রস্ত হওয়া এবং মানসিক অসুস্থতা থেকে বিভিন্ন বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। এরই মধ্যে কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গত ২০ মাসে ১৬৯ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তির মানসিক অসুস্থতা উপেক্ষিত থাকায় আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বাড়ছে। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকেন। অন্যদিকে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে ওঠার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ রোগটি হচ্ছে মানসিক বিষণ্নতা। এমনই এক প্রেক্ষাপটে আজ বুধবার বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আত্মহত্যা সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন করে সহানুভূতিশীল ও সহায়ক আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলা’।
 
এদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে সারা দেশে আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’ একটি জরিপ প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে সারা দেশে ৩১০ জন, ২০২২ সালে ৫৩২ এবং ২০২৩ সালে ৫১৩ জন আত্মহত্যা করেছে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে কিশোর-কিশোরীরা, যা মোট আত্মহত্যার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা বেশি। এই হার ৪৬ শতাংশের ওপরে। এর পরে আছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের তথা স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।
ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের নবনির্মিত রবীন্দ্র ভবনের নিচে সঞ্জু বারাইক (২৩) নামের এক শিক্ষার্থীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা করেন ওই শিক্ষার্থী।
 
আরেক ঘটনায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আনিকা মেহেরুন্নেসার (২৪) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর খিলগাঁওয়ে বাবা-মার সঙ্গে অভিমান করে নিজের রুমে আত্মহত্যা করে দিয়া জামান সুরমা (১৪)। দিয়া খিলগাঁও কোয়ালিটি এডুকেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এরকম আরও অনেক করুণ ঘটনা অতি সম্প্রতি ঘটেছে বলে জানা যায়।
 
আঁচল ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা যায়, স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ স্কুলশিক্ষার্থী ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে কলেজ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া গত বছর ঢাকা বিভাগে আত্মহত্যার হার ছিল অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় বেশি; ২৯ শতাংশ। এর পরে রয়েছে খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগ। সবচেয়ে কম আত্মহত্যা সিলেট বিভাগে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, মানসিক রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা এমনিতেই বেশি। তার ওপর আরও কিছু কারণ আছে, যা থাকলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে আত্মহত্যার জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়। সেরকম ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে একাকিত্ব (অবিবাহিত বা ডিভোর্সি), অতি আপন বা প্রিয়জনের মৃত্যু অথবা বিচ্ছেদজনিত শোক, বেকারত্ব বা চাকরিচ্যুতি, অস্থির বা দুষিত সামাজিক পরিবেশ, পরিবারের কারও মানসিক রোগ, মাদকাসক্তির ইতিহাস, দুরারোগ্য বা যন্ত্রণাদায়ক শারীরিক রোগ। মানসিক রোগাক্রান্ত ব্যক্তি একবার আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালানোর পর তা থেকে বেঁচে গেলেও পরে তার আবারও আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালানোর ঝুঁকি থাকে অনেক বেশি।

ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, এসব ক্ষেত্রে আগে থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে বেশির ভাগ আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। সে জন্য আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা দরকার। কারণ, যত দিন যাবে ঝুঁকি তত বাড়তে থাকবে। শনাক্তের পর আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আক্রান্ত হলে মানসিক স্বাস্থ্যের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকাসক্ত হলে তা রোধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটি গবেষণার তথ্যমতে, ১০ শতাংশ সিজোফ্রেনিক রোগী আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া মাদকাসক্তদেরও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশি। অ্যালকোহলে আসক্ত বা মাদকাসক্তদের ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া হেরোইন আসক্তদের আত্মহত্যার ঝুঁকি মাদকমুক্ত ব্যক্তিদের তুলনায় ২০ গুণ বেশি।
 
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করে। কিন্তু যখন সে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে সমন্বয় করতে পারে না, তখন সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এ ছাড়া সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় সে একাকিত্বে ভোগে এবং আত্মহননের পথ বেছে নেয়।’ 

ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, উন্নত দেশগুলোতে স্কুলের সিলেবাস অনুসরণ করে পড়াশোনার পাশাপাশি মানসিক কাউন্সেলিংও করানো হয়। আমাদের দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়) মানসিক কাউন্সেলিংয়ের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। এই দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

একই প্রসঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘পারিবারিক কলহ, বেকারত্ব, প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া, ঋণগ্রস্ত থাকা, মাদকাসক্তি ও বাবা-মায়ের সঙ্গে অভিমান করেও অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে থাকে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শিক্ষার্থী এবং উঠতি বয়সীদের কাউন্সেলিং করাতে পারলে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকটা রোধ করা সম্ভব।’ 

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০ মাসে ১৬৯ জনের আত্মহত্যা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আত্মহত্যার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে গলায় ফাঁস দিয়ে ৫৯ জন এবং বিষপানে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। এসব ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছে পুলিশ। 
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত, অর্থাৎ গত ২০ মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে আত্মহত্যা করেছেন ১৬৯ জন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৬০ জন, শিবগঞ্জ উপজেলায় ৪৮ জন, গোমস্তাপুর উপজেলায় ২৯ জন, নাচোল উপজেলায় ২৫ জন ও ভোলাহাট উপজেলায় ৭ জন গলায় ফাঁস এবং বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. শাহীন কাউসার বলেন, ‘যখন কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি নিজেকে কোনো না কোনো ঘটনার জন্য দায়ী মনে করেন। তিনি নিজে অথবা অন্যকে সরাতে আত্মহত্যা করেন। এটা রোধ করার জন্য আমাদের পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার ড. আশরুফুজ্জান শাহিন বলেন, ‘শরীরের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ম নেওয়া খুব জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্যের সেবা দেওয়ার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও নার্সদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’

নামোশংবাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসলাম কবির বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ইদানীং পড়ালেখা এবং রেজাল্ট ভালো করা নিয়ে আগের চাইতে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন থাকে। পড়াশোনা এখন প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এই প্রতিযোগিতার চাপে কিশোর-কিশোরীদের কেউ কেউ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এ ছাড়া বয়ঃসন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদের নানা ধরনের মানসিক টানাপোড়েন, হতাশা ও অবসাদের মতো জটিল অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এ সময় পিতামাতাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।’

এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘আত্মহত্যা একটি সামাজিক সমস্যা। একে প্রতিরোধ করতে হলে সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা এবং সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করতে হবে।’

আতঙ্কে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামিরা

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ১১:৫১ এএম
আতঙ্কে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামিরা
ছবি: সংগৃহীত

একসময়ের মহাপ্রতাপশালী হিসেবে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ব্যাপক পরিচিত। যিনি বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময়ে অনেকের কাছেই ছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। বলা হয়ে থাকে– বেনজীর আহমেদ সে সময়ের অনেক মন্ত্রীর চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন। সেই বেনজীর আহমেদ এবার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ‘ইন্টারপোল’ এর সহায়তায় দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিদেশে পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা অন্য আসামিরাও এখন আতঙ্কে ভুগছেন বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

রবিবার (১৪ জুন) ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের ‘রেড নোটিশ’ তালিকায় সারা বিশ্বের ৬ হাজার ৪৪২ জন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ আসামির নাম, ছবি ও বয়সসহ প্রাথমিক তথ্য দেখা গেছে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি রয়েছেন ৫৯ জন। সাম্প্রতিক সময়ে এ তালিকায় নতুন মাত্র কয়েকজন যুক্ত হলেও অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে ওই ওয়েবসাইটের রেড নোটিশের তালিকায় প্রদর্শিত হয়ে আসছেন।

যদিও এই রেড নোটিশের তালিকায় গতকাল পর্যন্ত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নাম বা ছবি কোনো কিছুই দেখা যায়নি। তবে ইন্টারপোলের কাছে ‘অফিশিয়ালি’ বাংলাদেশ পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা চেয়েছিল বলে জানা গেছে। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের একজন এআইজি খবরের কাগজকে বলেন, ইন্টারপোলের পলিসি অনুসারে কিছু ক্ষেত্রে কোনো আসামির নাম বা ছবি তালিকায় না রেখে অপ্রকাশিত রাখা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদ ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তার নাম বা ছবি দেখা যায়নি।

এ কারণে দুবাইয়ে ‘বিপুল অর্থসম্পদ’ বিনিয়োগের তথ্য থাকা বেনজীর আহমেদ সেখানে গ্রেপ্তার হওয়ায় অন্য আলোচিত আসামিদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ইন্টারপোলের তালিকায় থাকা বা পলাতক হিসেবে বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে থাকা গুরুতর ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার আসামিরা অনেকটা আতঙ্কগ্রস্ত বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তার হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের আসামি যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যে ভীতি বা আতঙ্ক কাজ করবে। অনেকেই যারা আত্মগোপনে রয়েছেন, তারা একই জায়গায় বেশি দিন থাকবেন না। তারা গ্রেপ্তার এড়াতে অবস্থান পাল্টাবেন–এগুলো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘আমি মনে করি, এই ধরনের (বেনজীর) আসামি যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, ক্ষমতার চেয়ারে বসে রাষ্ট্রকে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন– তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি। কেননা, শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অন্যদের জন্য সতর্ক বার্তা বা শিক্ষণীয় হবে।

একই সঙ্গে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জায়গাগুলো আরও মজবুত হবে। ফলে বিদেশে গ্রেপ্তারেই যেন সবকিছু থমকে না থাকে। দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আইনানুসারে যথাযথ বিচার বা শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই প্রক্রিয়ার সার্বিক সুফল পাওয়া যাবে।

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তারা ক্ষমতার চেয়ারে বসে বেপরোয়া দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা বা অপেশাদার আচরণ করেন–এমন কর্মকর্তাদের জন্য সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অবশ্যই শিক্ষণীয়।

যদিও এমন বিভিন্ন ঘটনা থেকেও অনেকে শিক্ষা নেন না। তার পরও পুলিশ, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রেই কর্মকর্তাদের দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সরকারের জবাবদিহিমূলক কঠোর অবস্থান জারি রাখতে হবে। এতে সরকারের সঙ্গে জনগণের সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি (মহাপরিদর্শক) আব্দুল কাইয়ুম খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিটি সরকারি চাকরিতে বা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের নির্ধারিত রুলস বা বিধিবিধান রয়েছে। কিন্তু অনেকেই সেটি মনে রাখেন না। চেয়ার পেলেই অনেকেই হয়ে যান লাগামছাড়া। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অপেশাদার আচরণ তাদের এমনভাবে বাড়তে থাকে, যা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কিন্তু সবার মনে রাখা দরকার, কোনো চেয়ার বা ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। সেটা মাথায় রেখে শুধু পুলিশ কর্মকর্তা নন, যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে অসম্মানজনক পরিণতির শিকার হতে না হয়।

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘রেড নোটিশ’ বা লাল সংকেতের তালিকাটি হচ্ছে–বিশ্বব্যাপী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে এবং প্রত্যর্পণ, আত্মসমর্পণ বা অনুরূপ আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে তাকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তার করার একটি অনুরোধ। তবে রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মূলত অনুরোধকারী সদস্য দেশ বা আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল দ্বারা ‘ওয়ান্টেড’। সদস্য দেশগুলো কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের নিজস্ব আইন প্রয়োগ করে। অধিকাংশ রেড নোটিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ।

গতকাল পর্যন্ত ইন্টারপোলের রেড নোটিশের তালিকায় থাকা ৫৯ জন বাংলাদেশি হলেন–

রাজু ঢালি (৪২), মো. মিলন (৩৭), লিটন ব্যাপারী (৪৭), রবিউল ইসলাম রবিউল ওরফে আরাভ খান (৩৮), জাফর ইকবাল (৪৪), তানজিরুল (৪১), স্বপন (৩৪), নজরুল ইসলাম মোল্লা (৪৯), মিন্টু মিয়া (৪৭), ওয়াসিম (৪১), খোরশেদ আলম (৪৩), গিয়াস উদ্দিন (৫৬), অশোক কুমার দাস (৪৫), মিজান মিয়া (৪৮), কুমার চন্দ্র রায় (৪৬), রাতুল আহমেদ বাবু (৪৫), মো. সিরাজ মোস্তফা লালু (৩০), জাহিদ হোসাইন খোকন (৮৪), মো. সাঈদ হোসাইন ওরফে হোসেন (৭৪), মো. হাছান আলী সাঈদ ওরফে সৈয়দ মো. হাছান আলী (৭৮), আজিজুর রহমান (৫০), অজয় বিশ্বাস (৪৪), তরিকুল ইসলাম (৩৯), এন এ হানিফ (৪১), আলাউদ্দিন মোহাম্মদ (৫৩), মোহাম্মদ সবুজ ফকির (৫১), মোহাম্মদ মনির ভুঁইয়া (৬২), শফিকুল (৫৮), আমান উল্লাহ শফিক (৪৪) আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার (৭৯), জাহিদুল ইসলাম (৭০), সাজ্জাদ হোসাইন খান (৪৭), মো. নাঈম খান ইকরাম (৫৭), কালা জাহাঙ্গীর ওরফে ফেরদৌস (৪৮), মো. ইউসুফ (৭৯), আব্দুল আলিম শরীফ (৫৬), আহমেদ মজনু (৫৩), নুরুল দিপু (৪৯), মুহাম্মদ ফজলুল আমিন জাভেদ (৩৮), এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (৭৫), খন্দকার আবদুর রশিদ (৭৯), নাজমুল হোসেন আনসার (৭৩), শরিফুল হক ডালিম (৮০), আহমেদ শরিফুল হোসেন (৮৩), মুসলেম উদ্দিন খান (৮৮), এ এম রাশেদ চৌধুরী (৭৯), চৌধুরী মোহাম্মদ আতাউর রহমান (৬৪), আলহাজ মাওলানা মোহাম্মদ তাজউদ্দিন মিয়া (৫৩), সালাউদ্দিন মিন্টু (৪৬), গোলাম ফারুক অভি (৬০), হারুন শেখ (৫৫), তৌফিক আলম (৫১), আহমেদ জাফর (৫৬), রফিকুল ইসলাম (৫৫), জিসান আহমেদ (৫৬), আমীনুর রসুল (৬৮), নবী হোসেন (৫৬), প্রকাশ কুমার বিশ্বাস (৫৩) এবং আব্দুল জব্বার (৫৪)।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব নিয়োগ হয়নি তিন মাসেও

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব নিয়োগ হয়নি তিন মাসেও
ছবি: সংগৃহীত

প্রায় তিন মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘ এ সময়ে এই পদে নিয়োগ না হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে নতুন সরকারের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম। দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)। সরকারের নীতি বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমন্বয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ কার্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সচিব পদ শূন্য থাকলেও কার্যালয়ের কার্যক্রম থেমে নেই। তবে পূর্ণকালীন সচিব না থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নথি নিষ্পত্তি এবং সমন্বয়মূলক কিছু কর্মকাণ্ডে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত সময় লাগছে। মুখ্য সচিব অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পদটি কেবল একটি প্রশাসনিক পদ নয়; এটি সরকারের কেন্দ্রীয় সমন্বয় ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। মুখ্য সচিব নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো তদারকি করলেও সচিবের ওপর দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প তদারকি, কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যবস্থাপনা এবং দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার বড় দায়িত্ব থাকে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ পদ শূন্য থাকাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না অনেক কর্মকর্তা।

প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার এমন একজন কর্মকর্তাকে খুঁজছে, যিনি দক্ষতা, সততা, পেশাদারত্ব এবং প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পদায়নে শুধু জ্যেষ্ঠতাই নয়, বরং অতীত কর্মজীবন, পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং সরকারের আস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় লাগছে বলে মনে করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

তারা জানান, গত কয়েক মাসে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম আলোচনায় এলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই চলছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনের অভ্যন্তরে গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।

অতীতে বিতর্ক বা পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে, এমন কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্টদের কর্মজীবনের নানা দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদায়নকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার অপেক্ষাকৃত বেশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। শুধু তদবির বা লবিংয়ের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের সুযোগ আগের তুলনায় অনেক সীমিত বলে তারা মনে করেন।

এদিকে সচিব পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় মুখ্য সচিবের ওপর বাড়তি কাজের চাপ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বের পরিধি এমনিতেই ব্যাপক। এর সঙ্গে সচিবের দায়িত্বের অতিরিক্ত অংশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাড়তি চাপে রয়েছেন মুখ্য সচিব। এতে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ এই পদের শূন্যতা সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে। প্রশাসনসংশ্লিষ্টদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কিছুটা কমে যেতে পারে এবং সমন্বয়মূলক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। 

দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পদে নিয়োগের আলোচনায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম বিবেচনায় থাকলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। 

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলেও এতে খুব বেশি অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কারণ সেখানে মুখ্য সচিব, যুগ্ম সচিব, পিএস রয়েছেন। তারা সবাই প্রশাসনের কর্মকর্তা। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সচিবালয়ে অফিস করছেন, তাই সেখানে হাতের কাছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবও রয়েছেন। আমি মনে করি, হঠাৎ করে বা তড়িঘড়ি করে এই পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে বিব্রত হওয়ার চেয়ে একটু দেখেশুনে অপেক্ষা করে যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়াই শ্রেয়তর হবে।

পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
পরিদর্শন নেই, অরক্ষিত রেলপথ
ছবি: খবরের কাগজ

কাগজে-কলমে জনবল শতভাগ পূর্ণ থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তাদের দেখা মেলে না। নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির অভাবে অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে রেলপথ, যার ফলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনা। দায়িত্বে অবহেলা করলেও কর্মকর্তাদের নিয়মিত ‘মাসোহারা’ বা উৎকোচ দেওয়ার কারণে চাকরি হারানোর কোনো ঝুঁকি থাকে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) এ ধরনের অনিয়মই যেন এখন এক স্বাভাবিক চিত্র।

কতিপয় কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের যোগসাজশে ভেঙে পড়েছে সিআরবির চেইন অব কমান্ড, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। সিআরবির বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কাজ না করে হাজিরা, প্রশাসনের চোখে ধুলো

সিআরবির আওতাধীন উচ্চমান উপসহকারী প্রকৌশলী (এসএসএই-ওয়ে) এবং চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন রেলওয়ের প্রধান পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার ইয়ার্ডের (সিজিপিওয়াই) অধীনে মোট ১৪টি ওয়ার্কিং টিম বা গ্যাং কাগজে-কলমে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়ে চলছে। সূত্র বলছে, এখানে কোনো শূন্যপদ নেই।

এ ছাড়া মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানায় ১৪টি, ফেনীতে ১৪টি, লাকসামে ১৪টি এবং কুমিল্লায় ১৪টি গ্যাং চালু রয়েছে। প্রতি গ্যাংয়ে মেইট, কিম্যান ও ওয়েম্যানসহ সর্বোচ্চ ১১ জন এবং সর্বনিম্ন ৯ জন সদস্য থাকার কথা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ ওয়েম্যান লাইনে নিয়মিত কাজ করছেন না। তারা সহকারী প্রকৌশলী চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-৩, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের দপ্তরসহ সিআরবির বিভিন্ন অফিসে কর্মরত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১-এর অধীনে গ্যাং নং ১৪-তে মাত্র ৩-৪ জন কর্মী কাজ করছেন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বাংলাবাজার এলাকায় এসআরভি রেলস্টেশনে সিজিপিওয়াই গ্যাংয়ের অধীনে ৯ জন রেলপথকর্মী নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু তার বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ১ জন ওয়েম্যানকে। অন্য গ্যাংয়ে ১১ জনের বিপরীতে কাজ করতে দেখা গেছে মাত্র ২ থেকে ৩ জনকে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এসব জেনেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না বলে রেলওয়ে মহাপরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়েছে।

রেলের পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রামের মিরসরাই) চিনকি আস্তানার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং ফেনীর সহকারী প্রকৌশলী কার্যালয়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রেলপথ তদারকি কার্যক্রমে তারা দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন না। একই চিত্র দেখা গেছে, এসএসএই (ওয়ে)-চট্টগ্রাম ও এসএসএই (ওয়ে)-ষোলশহরসহ প্রতিটি দপ্তরে। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে এই নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে রেলপথ। এর আগে ২০২৪ সালে রেলওয়ের মহাপরিচালক দপ্তর থেকে ওয়েম্যানদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার আদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু সে নির্দেশ মানেননি রেলের অসাধু কর্মচারীরা। এতে যারা রেলপথে নিয়মিত কাজ করছেন, তাদের ওপর বাড়তি কাজের চাপ পড়ছে।

ওয়েম্যানরাই রেলপথের মূল তদারককারী। তাদের অনুপস্থিতিতে লাইনের নাট-বল্টু ঢিলা হওয়া বা ফাটল শনাক্ত না হওয়ায় লাইনচ্যুত হওয়া ও বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ‘নিয়মিত মাসোহারা’

অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএসএই (ওয়ে), সিজিপিওয়াই এবং গ্যাং মেইটের (রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণকারী দল বা ‘গ্যাং’-এর দলনেতা) যোগসাজশে অনেক ওয়েম্যান বা গ্যাংম্যান গরহাজির থাকছেন। শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘মাসোহারা’ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই মাসোহারার জন্য গ্যাং মেইটদেরও ‘চাপে রাখা হয়’ বলে জানিয়েছেন ওয়েম্যানদের একাংশ।

চট্টগ্রাম গ্যাং নং ৮, ৯, ১০, ১১, ১২–এই ‘মাসোহারা সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে গ্যাং মেইটরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন।

কর্মস্থলে না গিয়েও বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন নিয়মিত

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে রেললাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ওয়েম্যানদের একটি বড় অংশ কর্মস্থলে না গিয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাইনে কঠোর শ্রম দেওয়ার কথা থাকলেও অনেকে বিভিন্ন নেতার দপ্তরে কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাসাবাড়িতে অবস্থান করে মাস শেষে বেতন তুলছেন, আর মাসোহারা দিয়ে বছরের পর বছর চাকরি ধরে রেখেছেন।

রেলওয়ের মাঠপর্যায়ের একাধিক সাধারণ কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ফাঁকিবাজ কর্মীরাও রাতারাতি খোলস বদল করেন। বিগত সরকারের আমলে যারা আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে সুবিধা নিয়েছেন, তারা এখন শ্রমিক দলের নাম ভাঙিয়ে কিংবা তথাকথিত ‘সংস্কারপন্থি’ গ্রুপের ‘লেবাস’ ধরে একই ধারা বজায় রাখছেন।

কর্মচারীদের অভিযোগ, এই কর্মীরা সপ্তাহে বড়জোর এক দিন কিংবা ১৫ দিনে একবার এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যান, যাতে কাগজে-কলমে তাদের অনুপস্থিতি ধরা না পড়ে। মাস শেষে ঠিকই তারা পুরো মাসের বেতন তুলে নিচ্ছেন। একে রেলওয়ে ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য বড় ধরনের লোকসান ও ক্ষতি হিসেবে দেখছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

একজন রেল কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য একটা মানুষ পুরো রেলের ক্ষতি করছেন। অথচ এদের দেখার যেন কেউ নেই।’

নিয়মিত বিরতিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও কেন এই অনিয়ম ধরা পড়ছে না–এমন প্রশ্নে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা জানান, রেলের ব্রিটিশ আমলের নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীর ছয় মাসে একবার ট্রলিযোগে লাইন পরিদর্শনে আসার কথা। পূর্বাঞ্চলের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম কাজের বিষয়ে সচেতন হলেও এই পরিদর্শনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

কর্মচারীরা বলছেন, এখন অনলাইনের যুগ। প্রধান প্রকৌশলী পরিদর্শনে বের হওয়ার আগেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বার্তা পৌঁছে যায় যে ‘আগামীকাল স্যার ট্রলি করবেন’। ফলে পরিদর্শনের দিন সকাল সকাল সব ফাঁকিবাজ কর্মী লাইনে গিয়ে হাজির হন। তিনি পরিদর্শনে গিয়ে সবাইকে কাজ করতে দেখেন। কিন্তু তিনি চলে গেলেই পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়।

সাধারণ কর্মচারীদের মতে, অনিয়মের মূল গোড়াটি রয়েছে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্তরে। স্থানীয় এসএসএই (সিনিয়র সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) বা এইএন (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি কঠোরভাবে তদারকি না করেন, তবে প্রধান প্রকৌশলীর একক সচেতনতা দিয়ে এই দীর্ঘদিনের ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

যা বলছেন প্রধান প্রকৌশলী

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, রেলওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ এসব তথ্য বেশ সময়সাপেক্ষ। ফোনে সব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া মুশকিল। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। 
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, রেলপথে জনবলে নিয়োগ ও পরিচালনার পুরো বিষয়টি চট্টগ্রামের সহকারী কর্মকর্তা (এএন) পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ক্রমান্বয়ে বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিএন) এবং প্রধান পার্সোনেল অফিসার (সিপিও) উইংয়ের অধীনে পুরো পূর্বাঞ্চলের এই জনবল কাঠামো পরিচালিত হয়ে থাকে।

টেলিফোনে এই প্রশাসনিক কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘টেলিফোনে আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। আপনি যদি চট্টগ্রামের কার্যালয়ে আসতে পারেন তবে ভালো, অন্যথায় স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’

খবরের কাগজের এই প্রতিবেদক পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের বার্তাও পাঠান। কিন্তু তারা কেউ সাড়া দেননি। ঢাকায় রেল ভবনের প্রধান পার্সোনেল কর্মকর্তা জাকির হাসানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।’ বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনও খবরের কাগজের বার্তায় কোনো সাড়া দেননি।

গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
গৌরীপুর ও মুক্তাগাছায় পানির প্রকল্প: ২ বছরে অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার পাইকেশমোড়ে ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ মেঝে পর্যন্ত হয়েই বন্ধ রয়েছে। ছবি: খবরের কাগজ

গ্রামীণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল সাড়ে ১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প। ১৮ মাসের মধ্যে এই পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বড় অংশের বিল তুলে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যাদেশ বাতিলের জন্য প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ‘লার্জ পাইপড ওয়াটার সাপ্লাই স্কিম’ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। দুই উপজেলায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নূর অ্যান্ড কোং এই কাজ পায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে গৌরীপুর উপজেলার পুম্বাইল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। সেখানে কোনো শ্রমিক নেই। নির্মাণকাজের কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি। গৌরীপুরে শুধু একটি ঘরের আংশিক ইটের গাঁথুনি দাঁড়িয়ে আছে।

মুক্তাগাছার পাইকেশ মোড় এলাকায় প্রকল্প স্থানে গিয়েও দেখা যায়, নির্মাণকাজ কেবল মেঝে পর্যন্ত হয়েছে। অথচ দপ্তরের নথিতে কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ দেখানো হচ্ছে।

বাস্তবে কাজের অগ্রগতি খুব কম হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বড় অঙ্কের বিল তুলে নিয়েছে। কত টাকা ছাড় করা হয়েছে, সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকল্প ব্যয়ের মোটা অংশ এরই মধ্যে ঠিকাদারের হাতে চলে গেছে।

ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারকে একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে রহস্যজনক কারণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় গৌরীপুর এবং মুক্তাগাছায় পাম্প স্থাপন ও ট্যাংক নির্মাণ শেষ হলে মোট ৭০০ পরিবার বিশুদ্ধ পানি পাবে। উপকারভোগীরা মিটার অনুযায়ী পানির বিল পরিশোধ করবেন। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করেই মাসিক বিল নির্ধারণ করা হবে। 

কিন্তু প্রকল্প এলাকার বাসিন্দারা জানান, এ বিষয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে লোকমুখে তারা জেনেছেন পানি সরবরাহের জন্য পাম্প স্থাপন করা হবে। মাসে ১০০ টাকার বিনিময়ে পানি ব্যবহার করতে পারবেন গ্রামের মানুষ।

গৌরীপুরের পুম্বাইল গ্রামের বাসিন্দা আজিজ মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে মোটর আছে। বিশুদ্ধ পানিই খাই। আবার সরকারি পানি নেওয়ার দরকার কী?’ মুক্তাগাছার পাইকেশমোড় এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নামেমাত্র কাজ হয়। পরে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার মানুষও এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।’

মুক্তাগাছা প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিক শফিকুল ইসলাম জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে ২৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণসামগ্রী সময়মতো সরবরাহ না করায় কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। রড, সিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় মালামাল ঠিকমতো না এলে কাজ এগোবে না।

নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা ও গৌরীপুরের এই প্রকল্পের জমি কেনা হয়নি। দুটি ইউনিটেই জমি নেওয়া হয়েছে স্থানীয়দের দানের মাধ্যমে। ফলে জমি পেতেই অনেক সময় লেগে যায়। এরপর কাজ শুরু হলেও তা চলছে ধীরগতিতে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক নূর আলম টিটু কাজের ধীরগতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, কাজে কোনো অনিয়ম হয়নি। বিল উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তবে ঠিকাদারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিল উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জামাল হোসেনের দায়িত্বে থাকাকালীন এই প্রকল্প শুরু হয়েছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক স্বীকার করেন, ঠিকাদারকে বারবার মৌখিক ও লিখিত তাগাদা দেওয়া হয়েছে। অগ্রগতি না হওয়ায় কার্যাদেশ বাতিলে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০১ এএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
অর্থবিল বিশ্লেষণ: পার পাচ্ছেন সম্পদশালীরা
বাজেট ২০২৬-২০২৭

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খুব কায়দা করে প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব জাল বিছিয়েছেন। মোটাদাগে এ জালে সাধারণ মানুষকেই আটকে ফেলে বড়দের এড়িয়ে গেছেন। সম্পূরক শুল্ক কমবেশি করে হাজারের বেশি পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। ব্যবসায়ী অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির টানাপোড়নেও দেশি শিল্প বিকাশের অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে ছাড় দিলেও ছেড়ে দিলেন না। করপোরেট করহার বাড়ালেন না। 

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য মিলেছে। 

অর্থবিলে উপজেলা থেকে পাড়ার মোড়ের দোকানও ভ্যাটের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। 

অর্থবিলে সাধারণ মানুষ রাজস্ব পরিশোধ না করলে বিদ্যমান আইনের কঠোরতা বহাল রাখা হয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা আগামী পাঁচ অর্থবছর কয়েক ধাপে বাড়ানোর কথা বলে বাহবা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে মাত্র ২৫ হাজার টাকা, যা মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের জন্য তেমন স্বস্তির হবে না। অথচ সম্পদশালীদের কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার বন্ধ করতে সেই পুরোনো ঢিলেঢালা পথেই হেঁটেছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো বিভিন্ন দূতাবাসে রাজস্ব দপ্তর স্থাপন করে বিদেশে পাচারকারীদের সম্পদ চিহ্নিত করা এবং সেই দেশে আইন (ল ফার্ম) সংস্থা নিয়োগে পদক্ষেপ নিতে খোদ এনবিআরের সুপারিশ থাকলেও তা বাজেটে আনা হয়নি।

ঋণদানকারী সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) খুশি করতে অর্থবিলে রাজস্ব অব্যাহতির সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। এতে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাড়লেও জনজীবনে চাপ কমবে না, বরং বাড়বে। 

এতদিন ই-টিআইএন নিয়েও অনেকে করযোগ্য আয় না থাকলে শুধু রিটার্ন দাখিল করেছেন, একটি টাকার কর দিতে হয়নি। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত অর্থবিল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, করদাতার আয় যা-ই হোক না কেন, অতি জরুরি অনেক সেবা নিতে হলে শুধু ই-টিআইএন থাকলেই হবে না, রিটার্ন জমার বাধ্যবাধ্যকতায় কঠোরতা আনা হয়েছে। শূন্য রিটার্ন নিরুৎসাহিত করে শূন্য রিটার্নধারীর আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখার আইনি বিধান আনা হয়েছে। 

অর্থবিলে ব্যাংক হিসাব খুলতে ও ব্যাংকঋণ পেতে, পাসপোর্ট করতে, বিদেশ ভ্রমণ সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করতে, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি কেনা, গাড়ি কেনা এবং এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন করা থেকে যেকোনো ব্যবসায়ে লাইসেন্স পাওয়া বা নবায়ন করতে ই-টিআইএন নেওয়া ও রিটার্ন জমার পক্ষে প্রমাণপত্র জমায় কঠোরতা থাকছে। বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউলিটি সংযোগ নেওয়া থেকে এককালীন ৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সোনা, মুক্তা বা মূল্যবান গহনাসহ যেকোনো কেনাকাটায়ও একই কঠোরতা থাকছে। অর্থবিলে সরকারি সব কাজে বা সেবা পেতে বাধ্যতামূলকভাবে ই-টিআইএন ও রিটার্ন দাখিলের পক্ষে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। 

আগামী প্রস্তাবিত অর্থবিলে হিমায়িত মাছ, গুঁড়া দুধ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাখন, টমেটো, তাজা বা শুকনা আঙুর, কমলালেবু, আম, লেবুসহ প্রায় সব ধরনের ফল আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। সব ধরনের বিস্কুট, চকলেট ও ময়দাজাতীয় খাবার আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানো হতে পারে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়বে।

আয়কর অধ্যাদেশের ৬৮৮বি ধারা অনুসারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিএ) ১৯৮৪ ধারায় ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিকদের কাছ থেকে যানবাহন নিবন্ধন বা বার্ষিক ফিটনেস নবায়নের জন্য অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করে থাকে। ধাপে ধাপে এই অগ্রিম কর বাড়ানো হয়েছে। আগামীতে এই কর কমানোর আবেদন জানালেও অর্থবিলে গাড়ির ইঞ্জিনের ধারণক্ষমতা এবং গাড়ির মডেলের ধরনের ওপর অগ্রিম কর আগের মতোই বেশি থাকছে। 

সাধারণ আয়ের অনেক করদাতা বলেছেন, খাবারের খরচ অনেক বেড়েছে। বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা সবকিছুই এখন বেশি। এর মধ্যে সাধারণ আয়ের মানুষের ওপর কর পরিশোধে চাপ দেওয়া হলে ভোগান্তি বাড়বে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বাজেট বক্তৃতায় অনেক কিছু আনা হয়নি। কিন্তু অর্থবিলে উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচনা এড়াতেই সরকার এটা করেছে। 

অর্থবিলে সৃজনশীল অর্থনীতি হিসেবে অনেক খাত নতুনভাবে যুক্ত করে করের আওতায় আনা হয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সৃজনশীল খাত হিসেবে বিদেশে সরকার অনেক অর্থ আয় করে। ভারতেও এমন ব্যবস্থা আছে। 

অর্থবিল থেকে জানায় যায়, সৃজনশীল খাত হিসেবে উপজেলা পর্যায়ের কুটির শিল্প উৎপাদনকারীকেও আগামী অর্থবছর থেকে কর দিতে হবে। নাটক, সিনেমা বা স্টেডিয়ামে খেলা দেখার টিকিটেও কর বসানো হয়েছে। এমনকি কেউ কোনো রিসোর্টে বেড়াতে গেলেও বাড়তি কর গুনতে হবে।