বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চলে নৌকায় বসবাস করা একটি জনগোষ্ঠীর নাম মান্তা সম্প্রদায়। নদীর জলে ভাসা এই মানুষগুলোর আয়ের প্রধান উৎস মাছ শিকার। কিন্তু মা-ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ সৃষ্টির জন্য গত ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের নদ-নদীতে মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে মান্তা সম্প্রদায়ের আয়ের উৎসও বন্ধ হয়ে গেছে। বলতে গেলে তাদের চুলা জ্বলছে না। নদীর বুকে নৌকায় বসবাস করায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত। জেলে হিসেবেও নেই নিবন্ধন। ফলে সরকারি মানবিক খাদ্যসহায়তা থেকেও তারা বঞ্চিত। নদীর তীর ও চরে অবস্থান করায় আভিযানিক দলের হাতে আটক হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।
বরিশালের ১০ উপজেলায় মান্তা সম্প্রদায়ের কত মানুষ বসবাস করেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সরকারি দপ্তরে পাওয়া যায়নি। তবে এসব উপজেলার বিভিন্ন নদীর তীরে কম-বেশি এই সম্প্রদায়ের মানুষই বসবাস করেন। তাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ১০ উপজেলায় কমপক্ষে ৫ হাজার পরিবার বসবাস করছে। এ পরিবারগুলোতে ১২ হাজারের মতো মানুষ রয়েছেন।
বরিশাল সদরের বুখাই নগর এলাকার মান্তা সম্প্রদায়ের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের আয়ের প্রধান উৎস মাছ ধরা। ভাসতে ভাসতে যেখানে নৌকা নোঙর করি, সেখানেই আমাদের বসতি। স্থায়ী বসতি না থাকায় জন্মনিবন্ধন, জন্মসনদ কিংবা মৃত্যুসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছি না। ফলে নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে জেলেদের জন্য দেওয়া মানবিক খাদ্যসহায়তার তালিকাতেও আমাদের নাম ওঠে না। নৌকা, বড়শি আর জাল ছাড়া আমাদের কিছু নেই।’
একই উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকার জোসনা বেগম বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই দেহি পানি আর পানি। বাবা-মাকে দেখছি মাছ ধরে জীবন চালাইতে। মোরাও (আমরাও) একইভাবে চলতে আছি (চলছি)। এখন মাছ ধরা বন্ধ। তাই নদীর তীরে থাকতে হয়। তয় ডর লাগে, পুলিশ বা কোস্টগার্ড কখন মোগো (আমাদের) ধরইলা লইয়া যায়।’
এ ছাড়া লাহারহাটের খোকন মিয়া বলেন, ‘এক দিন মাছ না ধরলে না খাইয়া থাকতে হয়। কিন্তু জেলে হিসেবে সরকার স্বীকৃতিও দেয় না। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলছে। আয় বন্ধ। পুঁজি যা আছে তা দিয়া এক-দুই দিন চলতে পারুম। এর পর কী হইবে জানি না। অন্য কোনো কামও শিখি নাই, যে হেয়া করুম (সেটা করব)।’
বরিশাল জনসুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সব সুযোগ-সুবিধা থেকে মান্তা সম্প্রদায় বঞ্চিত। তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে। নদী-তীরবর্তী এলাকায় আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ী বসবাস নিশ্চিত করতে পারলে তাদের সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। তারা পাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বাসস্থানের অধিকার।’
মান্তাদের নিয়ে কাজ করা গণমাধ্যমকর্মী সাইদুজ্জামান পান্থ বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে তাদের আয়ের উৎস একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এই সময়ে তাদের খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’
উন্নয়ন সংগঠন আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল বলেন, ‘মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিষেধাজ্ঞার এই ২২ দিন বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের ফান্ড না থাকায় আমাদের পক্ষে খাদ্যসহায়তা দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এই ২২ দিন তারা যেন দু মুঠো ভাত খেয়ে বাঁচতে পারে, সে জন্য সরকারিভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া মান্তা সম্প্রদায় নিয়ে সরকার কাজ করছে। এরই মধ্যে আমরা চারটি উপজেলায় বসবাসকারী এমন ১ হাজার ২০০ পরিবারকে জেলে কার্ডের আওতায় এনেছি। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে। তারা যেন রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা পায়, সেটি নিশ্চিত করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘তারা নদীর তীরে নৌকায় থাকলে কোনো সমস্যা নেই। যদি নদীতে জাল ফেলে তাদের আটক করা কিংবা জরিমানা করারও সুযোগ নেই। তবে এই সময়ে নদীতে মাছ শিকার অবস্থায় আভিযানিক দলের সামনে পড়লে তাকে তো প্রচলিত আইনের আওতায় আনাটা স্বাভাবিক।’