তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ধসের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে সময় লেগেছে। সে সময়ে অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে যায়। এবারে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার ঘটনায় আগের মতোই ভাবমূর্তি-সংকটে পড়তে পারে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। বিশেষভাবে রপ্তানি বাণিজ্যে ধাক্কা লাগার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
এ বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল রবিবার খবরের কাগজকে বলেন, তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ধসের পর তৈরি দেশের পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ওই সব ঘটনার পর অনেক দিন পর্যন্ত দেশের বেশির ভাগ তৈরি পোশাক কারখানা নতুন করে অর্ডার পায়নি। আগের অনেক অর্ডারও বাতিল হয়ে যায়। তখন তৈরি পোশাক কারখানার মালিকরা সংকটে পড়েন। এবার বিমানবন্দরে আগুন লাগার ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠছে- যে দেশে এমন ঘটনা ঘটে, সেখানে নিশ্চিত মনে কীভাবে অর্ডার দেবে!
ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, ‘বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগায় বিভিন্ন ব্যবসা খাতের প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার পণ্যের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া যেসব কাঁচামাল পুড়ে গেছে, তা দিয়ে পণ্য বানিয়ে রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। নতুন করে এসব কাঁচামাল কীভাবে জোগাড় করব? এ ক্ষতি ব্যবসায়ীরা কীভাবে পুষিয়ে নেবেন বুঝতে পারছি না। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব না।’
ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে আগুন লাগার ঘটনায় ব্যবসা-বাণিজ্যে অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে এবং পোশাকশিল্পের জন্য তা মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। ফলে স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আস্থা কমে যাবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, এবারের আগুন লাগার ঘটনায় বেশির ভাগ ব্যবসায়ী আতঙ্ক বোধ করছেন। অনেক পণ্য আগুন লেগে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছেন। বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ নতুন করে কোনো চুক্তি করতে আগ্রহী হলে অবশ্যই বিমানবন্দরে আগুন লাগার বিষয়টি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগুন লাগার ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হবে- এটিই প্রত্যাশা। এ ধরনের ঘটনা স্বল্প মেয়াদে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর খাতগুলো যেমন- ফার্মাসিউটিক্যাল, রেডিমেড গার্মেন্টস, কৃষিপণ্য ও পচনশীল পণ্য পরিবহনে সাময়িক বিঘ্ন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আমদানি কার্যক্রমেও বিলম্ব হতে পারে। বিশেষ করে কাঁচামাল, শিল্প যন্ত্রপাতি ও ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত সক্রিয় উপাদান (API) আমদানিতে বিলম্ব উৎপাদন প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। এ-সংক্রান্ত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি ও রপ্তানির ক্ষতিপূরণ বা বিমা দাবির প্রক্রিয়া যেন দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং সে বিষয়ে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। পাশাপাশি তৃতীয় টার্মিনাল ব্যবহারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সাময়িক স্বস্তি দেবে ব্যবসায়ীদের। আমরা বিশ্বাস করি, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সময়োচিত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর সমন্বয়ের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মাধ্যমে বিমানবন্দরের কার্গো কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্ভাব্য ক্ষতি যথাসম্ভব কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’
জুলাই গণআন্দোলনের পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও আশানুরূপ সফলতা আসেনি। ব্যবসায়ীদের প্রায় সবাই নির্বাচিত সরকারের দাবি জানিয়েছেন। সামনে বছরের শুরুতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় কথা। ব্যবসায়ীরা আশায় আছেন নির্বাচিত সরকার এলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। এমন পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরে আগুন লাগার ঘটনায় গোটা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক ব্যবসায়ী।
কার্গো ভিলেজ পরিদর্শন করেছেন ব্যবসায়ীরা
গতকাল দুপুরে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইনামুল হক খানের নেতৃত্বে ব্যবসায়ীদের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায়। তারা দাবি করেন, আগুনের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি হবে। এ দুর্ঘটনায় দেশের রপ্তানি বাণিজ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সামনে লিখিত বক্তব্যে ইনামুল হক বলেন, ‘সাধারণত উচ্চমূল্যের পণ্য এবং জরুরি শিপমেন্টের ক্ষেত্রে আকাশপথে জাহাজীকরণ করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের ফলে তৈরি পোশাক, মূল্যবান কাঁচামাল এবং নতুন ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্যাম্পল পণ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আগুনে যে পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়েছে, তা শুধু বর্তমান রপ্তানির ক্ষতি নয়, ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সুযোগও ব্যাহত করবে। বিজিএমইএ ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কাজ শুরু করেছে। সদস্যদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফরমে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যের তালিকা চাওয়া হয়েছে। দ্রুত তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল খোলা হয়েছে।’
প্রতিদিন ২০০-২৫০টি কারখানার পণ্য আকাশপথে রপ্তানি হয় জানিয়ে ইনামুল হক খান বলেন, ক্ষতির পরিমাণ বিপুল হতে পারে। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে শিগগিরই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, কাস্টমসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে একটি সমন্বয় সভা করবে বিজিএমইএ।
এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, ‘আমরা ভেতরে গিয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখেছি। পুরো ইমপোর্ট সেকশন পুড়ে গেছে। আমাদের অনুমান, ক্ষতির পরিমাণ ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) টাকার বেশি।’
তিনি জানান, ঘটনাস্থলে বাণিজ্য উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। উপদেষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে নতুন পণ্যের আমদানি কার্যক্রমে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। আপাতত টার্মিনাল-৩-এর নতুন স্থানে আমদানি পণ্য রাখার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা। এ ছাড়া ৭২ ঘণ্টার পরিবর্তে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত পণ্য খালাস করার নির্দেশ দিয়েছেন উপদেষ্টা।
ফয়সাল সামাদ আরও বলেন, ‘কাস্টমসের সঙ্গে যৌথভাবে একটি ওয়ার্কিং কমিটি করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত মালামাল খালাস করা যায়। এমনকি শুক্র-শনিবার কাজ চলবে। ব্যবসার স্বার্থে এখন আর সাপ্তাহিক ছুটি থাকবে না।’