সরকারি চাকরিবিধি ও কোম্পানি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মো. ফারুক আহমেদকে। বাংলাদেশের নাগরিকত্বের পাশাপাশি ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব রয়েছে তার, যার প্রমাণ খবরের কাগজের হাতে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব তথ্য গোপন করে ডিএমটিসিএলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদের জন্য আবেদন করেছিলেন মো. ফারুক আহমেদ।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪০নং ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না। কোনো কর্মচারী বিধান লঙ্ঘন করে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে বা এমন প্রমাণ মিললে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া যাবে।
ডিএমটিসিএল এমডি মো. ফারুক আহমেদের বহু-নাগরিকত্বের প্রমাণ পাওয়ার পরও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নীরব রয়েছে। আর এই নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দুদক এক চিঠিতে জানিয়েছিল, কয়েকজন অসাধু সরকারি কর্মচারী আইনি ব্যবস্থা থেকে রক্ষা পেতে তথ্য গোপন করছেন। তারা বাংলাদেশ ছাড়াও কয়েকটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি কর্মচারীদের একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণের অন্যতম লক্ষ্য হলো- বাংলাদেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত তাদের অবৈধ সম্পদ গোপন করে বিদেশে পাচার ও ভোগ করা। তাই সরকারি, আধা সরকারি, কোম্পানির সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে কেউ দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে কি না, তা স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানকে অনুসন্ধানের অনুরোধ জানায় দুদক। সেই তথ্য দুদককে জানাতেও চিঠি দেওয়া হয় সব প্রতিষ্ঠানে।
কিন্তু দুদকের এই অনুরোধ সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ রাখেনি বলেই এখন অভিযোগ উঠেছে। এদিকে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক আহমেদ মেট্রোরেলের এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ প্রকল্প দুটি থেকে জনবল হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে প্রকল্প দুটির অস্থায়ী কর্মচারীরা বিপদে পড়েছেন। ডিএমটিসিএলে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান মো. ফারুক আহমেদ। এরপর গত ৩০ জুলাই তিনি যখন সরকারি সফরে দক্ষিণ কোরিয়া যান, তখন আবেদনপত্রে অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট নাম্বার ব্যবহার করেন। এ বিষয়টি তখনো জানাজানি হয়নি। এর কিছুদিন পর জানা যায়, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্পে তিনি প্রকল্প পরিচালক পদে আবেদন করেছিলেন। সেই প্রকল্পটি ছিল ঢাকা-কক্সবাজার রেল প্রকল্প। সেই প্রকল্পের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনায় রেলপথ মন্ত্রণালয় দেখতে পায়, ফারুক আহমেদ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হিসেবে আবেদন করেছিলেন।
মো. ফারুক আহমেদ ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ভারতের সিস্ট্রা কনসালটিং ফার্মে কর্মরত ছিলেন। এর আগেও ভারতের আহমেদাবাদ, চেন্নাইসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলওয়ের নানা প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি ভারতের আধার কার্ড নেন।
সিস্ট্রা কনসালটিং ফার্ম বাংলাদেশের মেট্রোরেলের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহযোগী হিসেবে রয়েছে। ইতোমধ্যে মেট্রোরেলের মতিঝিল থেকে কমলাপুর সেকশনের বৈদ্যুতিক-কারিগরি (ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেম- ইঅ্যান্ডএম) কাজ দেওয়া হয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্রোকে। মেট্রোরেলের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের কাজের জন্য ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি দ্বিতীয় সংশোধনী) কাজের জন্য ২৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজের জন্য ৬৫০ কোটি টাকা দাবি করে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে এত বেশি দরে কাজ করাতে অনীহা প্রকাশ করলে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ দর-কষাকষির পর ঠিকাদারি কাজের বিল ৪৬৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। হিসাব কষে দেখা গেছে, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের কাজের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে এই দর ৬৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি।
ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি এখন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের ৬৪ ধারা ব্যত্যয়ের অভিযোগ উঠেছে ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে।
এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির যখন ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থ কোনো ক্রয়কারীকে মিতব্যয়িতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা, সুবিচার এবং দরপত্র বা প্রস্তাবগুলোর ওপর প্রতিকূল প্রভাব বিস্তার করে, তখন ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) দেখা যায়।
এসব বিষয়ে জানতে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হয়। বার্তা পাঠানো হয় হোয়াটসঅ্যাপে। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি।
পরে এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইনউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি এটা ঠিক বলতে পারব না। কারণ আমি নিজেও এই আইন সম্পর্কে পুরোপুরি জানি না। তিনি (ফারুক আহমেদ) বাংলাদেশের বাইরে থেকে এসেছেন। তাকে এমডি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে সরকারি চাকরিবিধি পুরোপুরি প্রযোজ্য কি না, এটা আমি বলতে পারব না।’
জনবলসংকট, এর মধ্যেই ছাঁটাই-আতঙ্কে কর্মচারীরা
ডিএমটিসিএলের বর্তমান অর্গানোগ্রাম অনুসারে অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ১ হাজার ৩৩৬ জন এবং কর্মরত জনবলের সংখ্যা ৮৪৭ জন। এ হিসাবে ৪৮৯টি পদ এখনো শূন্য রয়েছে।
এসব শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে জানা গেছে, এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ প্রকল্প থেকে জনবল ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ডিএমটিসিএল পরিচালনা পর্ষদের ৭১তম সভার কার্যবিবরণীতেও সে তথ্য উঠে এসেছে।
এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (সাউথ, নর্থ) প্রকল্পে বাস্তবায়নে বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রাক্কলিত দর থেকে বহুগুণ দর হাঁকছে। এমন বাস্তবতায় তিন প্রকল্পের সব ধরনের কাজ স্থবির হয়ে গেছে। ডিএমটিসিএল এখন ব্যয়-সংকোচনের নীতি গ্রহণ করেছে। এ নীতির আওতায় প্রকল্পে নিয়োগ হওয়া কর্মচারীদের ছাঁটাই করতে তোড়জোড় শুরু করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
এর পাশাপাশি তিন প্রকল্পের ৮৩টির কার্যক্রমে যে দুই শতাধিক কর্মকর্তা প্রেষণে ও সরাসরি নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এখন।
জানা গেছে, মো. ফারুক আহমেদ সম্প্রতি মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন), মহাব্যবস্থাপক (অর্থ), মহাব্যবস্থাপক (স্থায়ী কাঠামো-পি ওয়ে) পদ শূন্য ঘোষণা করেছেন। পরে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। যুক্তি হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন, ওই কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা ভালো নয়। এই নিয়ে ডিএমটিসিএলে এখন চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
ডিএমটিসিএলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরে কোনো ফাইল পাঠানো হলে তা দুই সপ্তাহ পর ফেরত আসে।
এমডির দপ্তরে ফাইল পাঠানো হলে দুই সপ্তাহ পর ফেরত আসে, তাও ব্যাকডেট (কাজ সম্পাদনের আগের তারিখ) দিয়ে। এতে দায় পড়ছে অধস্তন কর্মচারীদের ওপর। কারিগরি, প্রশাসনিক অনেক কাজও থমকে গেছে।
ডিএমটিসিএলের অর্গানোগ্রামে কোম্পানি সচিবের পদটি পঞ্চম গ্রেডের। কিন্তু খোন্দকার এহতেশামুল হক প্রশাসন ক্যাডারের তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা। তিনি সরকারের যুগ্ম সচিব। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিবের পদটি নবম গ্রেডের। কিন্তু সেখানে প্রশাসন ক্যাডারের পঞ্চম গ্রেডের উপসচিব মো. জাহিদুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়েও বার্তার কোনো উত্তর দেননি ডিএমটিসিএলের এমডি ফারুক আহমেদ। কোম্পানি সচিব খোন্দকার এহতেশামুল হকও অর্গানোগ্রাম নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
থমকে আছে নিয়োগ
এ বছরের এপ্রিলে ডিএমটিসিএল ২৪টি ক্যাটাগরিতে ১২০টি শূন্য পদে জনবল নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। এর মধ্যে ২৩টি ক্যাটাগরিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু দশম গ্রেডভু্ক্ত সেকশন ইঞ্জিনিয়ার ক্যাটাগরিতে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া যায়নি। কারণ বিএসসি ডিগ্রিধারী প্রকৌশলীরা এই পদে আবেদন করতে না পেরে হাইকোর্টে রিট করেন। হাইকোর্ট আদেশ দেন, এই পদে ওই প্রকৌশলীরা পরীক্ষা দিতে পারবেন। কিন্তু ডিএমটিসিএলের প্যানেল আইনজীবী এই আদেশের বিপরীতে আপিল বিভাগে আপিল করেন। এই আইনি জটিলতায় সেকশন ইঞ্জিনিয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।
অন্য ২৩টি ক্যাটাগরিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও প্রশাসনিক জটিলতায় কাউকে নিয়োগ দেওয়া যায়নি। নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ডিএমটিসিলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে খবরের কাগজকে জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন।