সক্রিয় চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড। চলছে আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধ। ঘটে চলেছে একের পর এক খুনের ঘটনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা, হুমকি, খুনসহ অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে। পুলিশ বলছে সন্ত্রাসীদের ধরার চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে বাস্তবে পুলিশের তেমন সফলতা চোখে পড়ছে না।
এদিকে বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক সাজ্জাদ আলী খানের একটি অডিওতে শোনা গেছে ৫ আগস্টের পর তিনি যে পরিমাণ অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন, তা চট্টগ্রামে তো নয়ই সারা দেশেও এককভাবে কারও কাছে নেই। তার এই অডিও ভাইরাল হওয়ার পর চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
অপরদিকে, সাজ্জাদ আলীর আরেক অনুসারী চট্টগ্রামের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান আবারও এক ব্যক্তিকে গুলি করে নয়, ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যার হুমকি দিয়েছে। মূলত ঢাকা থেকে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ এনে তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে রায়হান। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ায় বড় সাজ্জাদও ব্যবসায়ী মো. একরামকে হুমকি দিয়েছিল। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর থেকে বড় সাজ্জাদের হয়ে তার সাম্রাজ্য দেখাশোনা করছেন রায়হান। হুমকি দেওয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়েছে বলে ব্যবসায়ী আকরাম জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার কয়েকটি থানা এলাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর কয়েকটি থানা এলাকায় সন্ত্রাসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রায়হান। তিনি কাউকে হুমকি দেওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই সেখানে গুলির ঘটনা ঘটে। নগরীর বায়েজিদের চালিতাতলী এলাকায় গত ৫ নভেম্বর বিএনপির মনোনীত এমপি প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচনি জনসংযোগে অংশ নেওয়ার সময় খুন হওয়া সরোয়ার বাবলার মামলায়ও রায়হানের নাম রয়েছে। ঘটনার কয়েকদিন আগে বাবলাকে ফোনে হুমকি দিয়েছিলেন রায়হান। এর আগে ২৫ অক্টোবর রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চারাবটতল এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী আলমগীর আলমকে। তাকেও হত্যার আগে হুমকি দিয়েছিল রায়হান। এই দুই হত্যা মামলায় রায়হানকে আসামিও করা হয়েছে। ২৫ জুলাই নগরীর কালুরঘাট এলাকার এক ওষুধের দোকানিকেও মোবাইলে হুমকি দেন। তিনি দোকানিকে বলেন, আমি ঢাকাইয়া আকবর খুনের মামলার ২ নম্বর আসামি রায়হান, মাথার খুলি উড়ায় ফেলব। চাঁদা না পেয়ে গত ১ আগস্ট নগরীর চান্দগাঁও থানার মোহরা এলাকার ওই ব্যবসায়ীকেও গুলি করার অভিযোগ ওঠে রায়হানের বিরুদ্ধে। মো. ইউনুস নামে ওই ব্যবসায়ী নদী থেকে বালু তোলার কাজে ব্যবহৃত খননযন্ত্রের ব্যবসা করেন। রায়হানের বিরুদ্ধে ৭টি খুনসহ নগরীর জেলা ও মহানগরের থানায় অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে।
সাজ্জাদ আলীর ফোনালাপ
সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সাম্প্রতিক একটি ফোনালাপে শোনা যায়, ‘সরোয়ার বাবলাকে খুনের জন্য ২০ লাখ, ৫০ লাখ টাকাও অফার করেছিলাম। কাজটি এখন মক্ত (বিনাখরচে) হয়ে গেছে।’ বলতে শোনা যায়, সেখানে এরশাদ উল্লাহ নয়, খালেদা জিয়া থাকলেও সরোয়ার বাবলা বাঁচতে পারত না। ছেলেরা এতটাই ডিটারমাইন্ড ছিল বলেই সরোয়ারকে তার ঘরে গিয়ে মারতে পেরেছে। সরোয়ারকে খুন করাই ছিল লক্ষ্য। এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি গণসংযোগকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ডিজাইন করা হয়েছে বলে অডিওতে বলতে শোনা যায়।
সাজ্জাদ আলী দম্ভ করে বলেন, ‘প্রশাসনিক এত ঝড় তুফানের মধ্যেও আমি তাদেরকে কীভাবে দেখভাল করছি তা চিন্তা করে দেখেন। আমার ছেলেরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর আবার কীভাবে বের করছি।’ ওই ব্যক্তিকে সাজ্জাদ আলী বলেন, ‘আমার সঙ্গে থাকেন, কাজ করেন। টাকার কোনো অভাব হবে না।’ একজনকে খুন করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আধা ঘণ্টার মধ্যে ২০ লাখ টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওই ব্যক্তি উত্তরে বলেন, আমার কোনো টাকা লাগবে না। শুধু আমাকে একটু দেখবেন। বিনাপয়সায় আপনার কয়েকটি কাজ আমি করে দেব। এ সময় সাজ্জাদকে বলতে শোনা যায়, ৫ তারিখের পর যে পরিমাণ জিনিস (অস্ত্র) সংগ্রহ সে করেছে, পুরো চট্টগ্রাম তথা সারা দেশে এককভাবে সে পরিমাণ জিনিস আর কারও কাছে নেই।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের মুখপাত্র (গণমাধ্যম) ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (শিল্পাঞ্চল ও ডিবি) মো. রাসেল খবরের কাগজকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে সব ধরনের প্রচেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে রাউজান থেকে বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। আমরা কাজ করছি। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষজন যাতে নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে, তা নিশ্চিত করা। শিগগিরই ভালো ফল পাবেন।’
জানতে চাইলে সিএমপির মুখপাত্র (গণমাধ্যম) সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের ধরার চেষ্টা অব্যাহত আছে। বিদেশে বসে যাদেরকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তাদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অবগত আছেন। তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দেশে বসে যারা অরাজকতা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তাদেরও রেহাই নেই। তারা শিগগিরই ধরা পড়বে।’