শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর ঝুঁকি বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়ে শুরু হয়েছে আবারও আলোচনা। বিশেষ করে অতি ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা মহানগরের সাধারণ মানুষ ও ভবনগুলোর ঝুঁকির বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
যদিও দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞদের মতামত বা সতর্কতাকে কোনো সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গত শুক্রবারের শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং গতকাল শনিবার তিন দফায় মৃদ ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পরও সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো থেকে সেভাবে কোনো সতর্কতা বা সচেতনতা সৃষ্টিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে দেখেননি নগরবাসী।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, এর আগে ছোট বা মৃদু ভূমিকম্প যখন হয়েছে, তখন কিছুটা আলোচনা হলেও দ্রুতই আবার সবকিছু থমকে গেছে। ‘বিল্ডিং কোড’ শতভাগ বাস্তবায়ন, দুর্যোগে উদ্ধার তৎপরতা বা ব্যবস্থাপনাসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বরাবরই রয়ে গেছে উপেক্ষিত। কিন্তু গত শুক্রবার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ঘটা শক্তিশালী ভূমিকম্প আরও ভয়ানক কিছুর আগাম সংকেত কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।
‘আগামী ৮ থেকে ১০ দিন আমরা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছি’- এমন মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন যা হচ্ছে (দফায় দফায় ভূমিকম্প) সেটা প্রাকৃতিক ঘটনা। এটা ঠেকানোর সাধ্য কারও নেই। কিন্তু আগাম প্রস্তুতি বা সচেতন থাকলে ঝুঁকির মাত্রা বা ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। কিন্তু এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাজ করা হয়নি। প্রায় ২০ বছর ধরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে আমরা কথা বলে আসছি, দায়িত্বশীলদের সতর্ক করে আসছি, কিন্তু কোনো সরকারই ঝুঁকির বিষয়ে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। সরকারের উচিত ছিল রাজধানীসহ সব শহর-নগরে ‘বিল্ডিং কোড’ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। ঢাকার বেশির ভাগ ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। একশ্রেণির প্রকৌশলীও এসব অপকর্মে জড়িত। ফলে এসব চিহ্নিত করে নির্মোহভাবে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান আরও বলেন, গত দুই দিনে (শুক্র ও শনিবার) ভূমিকম্পের যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, সেগুলো ‘আফটার শক’ হিসেবে পরিচিত। এভাবে ছোট ছোট ‘শক’ হয়ে গেলে সাধারণত বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমে যায়। তবে চুপচাপ থেকে দুই-তিন দিন পর যদি আবার ভূমিকম্প হয়, সেটা বড় বা ভয়ানক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য কয়েকটা দিন সবাইকে খুব সতর্ক বা সচেতন থাকতে হবে। এই ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের সময়, বিশেষ করে রাজধানীর ক্ষেত্রে ভবনের বাইরে রাস্তায় গিয়ে অবস্থান না করাই ভালো। ঘর থেকে বের হলে এখন আরও বিপদ। ঢাকার উচ্চভবনগুলোর পাশে সরু রাস্তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য বাসার ভেতরেই নিরাপদ স্থান বেছে নিয়ে অবস্থান করতে হবে। অতি জরুরি সরঞ্জামগুলো হাতের কাছে রাখতে হবে।
সরকারি তথ্যমতে, শুক্রবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদী এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু ও ৬৮০ জন আহত হন। গত শুক্রবারের ওই ভূমিকম্প ও তার ভয়াবহতা নিয়ে গতকালও রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা ছিল। গতকাল তিন দফায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হলে ফের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যায়। অনেকেই মৃদু ভূমিকম্পের সময়েও দৌড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকে ভয়ানক পরিস্থিতি বা আতঙ্কের বিষয়গুলো প্রকাশ করেন।
কল্যাণপুরের বাসিন্দা রেজাউর রহিম গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের যে ভয়ানক পরিস্থিতির মাঝে পড়েছিলাম, তা বলার মতো নয়। কল্যাণপুরে একটি পুরোনো বাড়ির তৃতীয় তলায় পরিবারসহ অবস্থান করছিলাম। মনে হচ্ছিল, আজই সব শেষ হয়ে যাবে। আমরা আতঙ্কের মাঝে রয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘অধিক জনসংখ্যা, ভবন নির্মাণে অনিয়ম এবং ঠিকমতো রাস্তা না থাকায় ঢাকা শহর ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব বিষয়ে দায়িত্বশীলদের আন্তরিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।’
ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা নিয়ে গতকাল কথা হয় রাজধানীর উপকণ্ঠ গাজীপুরের টঙ্গী কাঁচাবাজারসংলগ্ন ১১ তলাবিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবনের বাসিন্দা এস এম মিন্টোর সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভবনটির দশমতলার ফ্ল্যাটে পরিবারসহ বসবাস করি। শুক্রবার সকালে ভূমিকম্পের সময় বাসায় খাটে বসে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ মনে হচ্ছিল ভবনটি হেলে পড়ে যাচ্ছে। বারবার ব্যাপক দোল খাচ্ছিল। স্ত্রী-সন্তানরা আতঙ্কে চিৎকার শুরু করে। সে এক ভয়ানক পরিস্থিতি। আমার জীবনে কখনোই এ রকম অবস্থায় পড়িনি।’
এসব বিষয়ে গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ) এ বি এম সফিকুল হায়দার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সম্ভাব্য বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমাদের একধরনের প্রস্তুতি সব সময়ই নেওয়া থাকে। কিন্তু বাস্তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ শুরু হয় দুর্যোগ-পরবর্তী সময় থেকে। তবে আগাম কিছু সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড এ মন্ত্রণালয় থেকে চালানো হয়, যার মধ্যে ঝুঁকি হ্রাসে জনগণের মাঝে সচেতনতামূলক তথ্য প্রচার, প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন পর্যায়ে মহড়াসহ নানা ধরনের কাজ অন্তর্ভুক্ত।’
এ বি এম সফিকুল হায়দার আরও বলেন, “ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাস বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত ‘বিল্ডিং কোড’ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি সিটি করপোরেশন, রাজউক বা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দেখার কথা। বিভিন্ন সভা-সেমিনারের আয়োজন হলে আমরাও এ বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়ে থাকি।”
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর আমরা বিভিন্ন এলাকার ভবন পরিদর্শন করেছি। সিটি করপোরেশনের একটা টিম এসব নিয়ে কাজ করছে। তারা মাঠে রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রবিবার (আজ) বিকেলে এ বিষয়ে আমাদের বিশেষ সভা রয়েছে। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।’