দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত তৈরি পোশাকশিল্পে এবার ভূমিকম্পের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে ২০০ কারখানা রয়েছে ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে। এসব কারখানায় লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। ঢাকার মতো বড় ভূমিকম্পে নতুন ট্র্যাজেডির জন্ম নিতে পারে এসব কারখানায়। ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনা করার জন্য একজন স্ট্রাকচারাল বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে পোশাক কারখানা পরীক্ষা করার পাশাপাশি ভবনের লিফট, বয়লার রুম, জেনারেটর রুম, সাব-স্টেশন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার জন্য মালিকদের তাগাদা দিয়েছে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
জানা যায়, চট্টগ্রামে বিজিএমইএর তালিকাভুক্ত পোশাক কারখানা রয়েছে ৩৪৩টি। কালুরঘাট বিসিক শিল্প নগরী ও বায়েজিদ শিল্পাঞ্চলে আরও ২০০ কারখানা চালু রয়েছে। এ ছাড়া বেপজা নিয়ন্ত্রণাধীন শিল্পাঞ্চলে আরও শতাধিক পোশাক কারখানা রয়েছে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে চালু পোশাক কারখানার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের হিসাব মতে, ১৯৩টি পোশাক কারখানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব কারখানাকে জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার (ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ, এনআই) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘এনআই তালিকাভুক্ত পোশাক কারখানাগুলোয় ফায়ার হাইড্রিল, ভূমিকম্পের ঝুঁকিমুক্ত করা, শ্রমিকদের যেকোনো দুর্যোগে সেফ এক্সিট থাকা জরুরি। এখন যে একেবারে নেই তা নয়, আরও উন্নত করা বা আরও ভালো করা প্রয়োজন। তবে আমরা ঝুঁকির মধ্যে থাকা ১৯৩টি পোশাক কারখানার মালিককে তাগাদা দিচ্ছি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।’
চট্টগ্রামের শিল্পপুলিশের সুপার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত শুক্রবার ঢাকায় প্রাণহানির পর বর্তমানে ভূমিকম্পের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। কলকারখানার মধ্যে পোশাক কারখানায় বেশি শ্রমিক কাজ করেন। চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পোশাক কারখানা রয়েছে। পোশাক কারখানার মালিক কর্তৃপক্ষকে ভূমিকম্পের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কারখানা পরিচালনার জন্য তাগাদা দেওয়া হবে।’
গত ২১ নভেম্বর সকালে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন হতাহত হলেও বহু স্থানে ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশে ভয়াবহ ভূমিকম্প হওয়ার পর এবার নড়েচড়ে বসেছেন পোশাক কারখানার মালিক-শ্রমিকরা। বিজিএমইএর প্রত্যেক কারখানাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে ভূমিকম্পজনিত নিরাপত্তা জোরদার করা জন্য। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে বেশি শ্রমিক কাজ করা কারখানাগুলোকে। এর মধ্যে পোশাক কারখানা অন্যতম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, তৈরি পোশাক কারখানায় সব সময় বেশি শ্রমিকের উপস্থিতি থাকে। কিন্তু চট্টগ্রামে অধিকাংশ পোশাক কারখানা ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সব সদস্যকে ভূমিকম্পের বিষয়ে চিঠি দিয়ে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য কারখানা ভবনে কোনো ফাটল সৃষ্টি হয়েছে কি না বা অন্য কোনো স্ট্রাকচারাল ত্রুটি দেখা দিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতিসত্বর একজন স্ট্রাকচারাল বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা পরীক্ষা করার পাশাপাশি ভবনের লিফট, বয়লার রুম, জেনারেটর রুম, সাব-স্টেশন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বলা হয়েছে।
বিজিএমইএ থেকে পোশাক কারখানার মালিকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু পোশাক শিল্প কারখানাগুলোতে বহুসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন, তাই কারখানা ভবনগুলোর স্ট্রাকচারাল নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। কারখানা ভবনগুলোতে অনেক ধরনের মেশিনারিজ রয়েছে ,যা থেকে অবিরাম কম্পন তৈরি হয়। কারখানায় লিফট, বয়লার, জেনারেটর, সাব-স্টেশন ইত্যাদি সংবেদনশীল স্থাপনা রয়েছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে যেকোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে বহুসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী হতাহত হতে পারেন। বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটনের পর যেকোনো সময়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প ঘটার আশঙ্কা থাকে, যা জীবন ও সম্পদের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিস ওয়ার্কাস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান হাবিব খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকার মতো ভূমিকম্প পুনরায় হলে দেশের অনেক কারখানা ও ভবন ভেঙে পড়বে। বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। আমাদের প্রত্যাশা, সব পোশাক কারখানা ঝুঁকিমুক্ত হোক। নিরাপদ পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করুক। আমাদের দেশে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সচেতন হয়।’
বিজিএমইএ পরিচালক ক্লিফটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কারখানার মালিকদের সচেতন করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কারখানা যাতে আপডেট থাকে সে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে মালিকদের। সবার আগে শ্রমিকদের নিরাপত্তা। সেই জায়গায় কোনো ছাড় দিতে আমরা রাজি নই।’