ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসন চলছে জোড়াতালি দিয়ে। এ দুই সংস্থা নগর ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। প্রতিষ্ঠান দুটি এখন জনবল সংকটে ভুগছে। নেতৃত্বের অস্থিতিশীলতা, পদশূন্যতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় কার্যত দিশেহারা প্রতিষ্ঠান দুটি। এই সংকট কেবল প্রশাসনিক কার্যালয়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, এর প্রভাব প্রতিদিন ভোগ করছেন নগরবাসী। বর্জ্য অপসারণ, রাস্তা সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা- সব ক্ষেত্রেই এখন ধীরগতি। সাধারণ নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো মৌলিক সেবাও প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না, হতাশা বাড়ছে নগরবাসীর মধ্যে।
সরকার পতনের পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়রদের সরিয়ে উভয় সংস্থায় বসানো হয় ‘প্রশাসক’। সারা দেশেও তাই করা হয়েছে। এরপর থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসনিক নেতৃত্বে বারবার পরিবর্তন দেখা গেছে। ইতোমধ্যে তিনবার প্রশাসক বদল হয়েছে জনবহুল দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। সর্বশেষ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান দায়িত্ব নিয়েছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসকের। তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়েরও একজন কর্মকর্তা। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার শীর্ষ পদটিতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি, যা প্রশাসনিক কাজকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে শুরু থেকেই বিতর্কিত তকমা নিয়ে মোহাম্মদ এজাজ বসেছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।
দুই সিটি করপোরেশনের এমন অস্থিরতার কারণে নগর ভবনের অন্য কর্মকর্তারাও পড়েছেন বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার জালে। গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কর্মকর্তা সংকট, অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ এবং নেতৃত্বের অদক্ষ অবস্থান প্রশাসনিক কার্যক্রমকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোর অনুমোদিত পদের উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তাশূন্য হয়ে পড়ে আছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩ হাজার ১৬৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার পদই খালি। গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোয় নেই যথাযথ কর্মকর্তা। সচিব, সহকারী সচিব, দুটি মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারের পদ, নিরীক্ষা কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা এবং সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তার মতো অতি জরুরি পদগুলোও শূন্য পড়ে থাকার কারণে দপ্তরের কার্যক্রম চলছে জোড়াতালি দিয়ে। বাধ্য হয়ে একজন কর্মকর্তাকে দুই থেকে তিনটি দপ্তরের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।
উত্তর সিটি করপোরেশনেও একই চিত্র। ২ হাজার ৬৮০টি পদের মধ্যে প্রায় এক হাজারের মতো পদ শূন্য রয়েছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার চেয়ারটি দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। ফলে সংস্থার সচিব (উপসচিব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে দপ্তর পরিচালনা করানো হচ্ছে। প্রকৌশল বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পর্যায়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদসহ নগর ভবনের বহু দপ্তরেই নিয়মিত কর্মকর্তা নেই। এই পরিস্থিতিতে ফাইল অনুমোদন, মাঠপর্যায়ের তদারকি ও নাগরিক সেবা- কোনোটিই সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব পালন করছেন -এমন এক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, “আমাদের অনেক সমস্যা। অর্থসংকট রয়েছে। এ ছাড়া আমরা ‘অলটাইম প্রশাসক’ পাচ্ছি না, যিনি দায়িত্ব নিয়ে সিটি করপোরেশনের সমস্যাগুলো সমাধান করবেন। এ ছাড়া অর্থ ও জনবলসংকট বেশি ভোগাচ্ছে আমাদের।”
জনবলের অভাব প্রকট আঞ্চলিক অফিসগুলোতে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মাত্র ৫ জন নির্বাহী কর্মকর্তা দিয়ে ১০টি জোন পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতিজনের কাঁধে দুই বা তিনটি জোনের দায়িত্ব দেওয়া আছে। তাদের অনেকে আবার নগর ভবনের নিয়মিত দাপ্তরিক দায়িত্বও পালন করছেন।
কাজী সালেহ মুস্তানজির দক্ষিণ সিটির অন্তর্গত অঞ্চল ৪-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা। সেই সঙ্গে তিনি ১ নম্বর জোনে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা। মো. সুজাউদ্দৌলা অঞ্চল ৬-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, পাশাপাশি অঞ্চল ৩ ও ৭-এর দায়িত্বও পালন করছেন। অঞ্চল ৮-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী একাই তিনটি অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করছেন। অঞ্চল ৯ ও ১০-এর দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ৫ জন কর্মকর্তা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে নাগরিক সেবা দিচ্ছেন। এ ছাড়া কর্মকর্তারা নগর ভবনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করছেন।
উত্তর সিটিতেও ১০টি জোনে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৮ জন কর্মকর্তা, যা কার্যত অচল অবস্থা তৈরি করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়ার্ড পর্যায়ের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় সেবা কার্যক্রমে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের শূন্যতা। সাধারণ সময়ে একজন নির্বাচিত কাউন্সিলর একটি ওয়ার্ডের নাগরিক সমস্যার দেখভাল করতেন। কিন্তু এখন সেই জায়গায় ‘ওয়ার্ড সচিব’ নামে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা চেয়ারে বসেছেন। তাদের পরিচয় বা অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয়দের কাছে অজানা। একজন কর্মকর্তা তিন থেকে পাঁচটি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সব ক্ষেত্রেই নাগরিক ভোগান্তি বহুগুণ বেড়েছে।
দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরই ঢাকার দুই সিটির প্রায় সব ওয়ার্ড কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এরপর সরকার সিটি করপোরেশন কাউন্সিলরদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার, যার ক্ষত ওয়ার্ড সচিবদের দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা চলছে। তবে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, উত্তরাধিকার সনদ এবং বয়স্ক ও বিধবা ভাতার প্রত্যয়নপত্রের জন্য প্রতিদিনই চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন নগরবাসী। সচিবদের সঙ্গে স্থানীয়দের কোনো সম্পর্ক বা চেনা-জানা না থাকায় দিনের ফাইল দিনে ছাড় হচ্ছে না। ফাইল ছাড়ের ক্ষেত্রে মাসাধিককালও পেরিয়ে যাচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা সাধারণত ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন।
অচলাবস্থার কারণে রাজস্ব আদায়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও সংগ্রহ করতে পারেনি সংস্থাটি দুটি। পর্যাপ্ত জনবল না থাকা, নিয়মিত তদারকির অভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাজস্ব সংগ্রহ কমে গেছে। এর ফলে সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য কার্যক্রমসহ মৌলিক সেবা খাতে ব্যয় কমে গেছে। জরুরি প্রকল্পগুলোও থমকে আছে, আর অনেক কাজেই দেখা দিয়েছে তীব্র ধীরগতি। চাইলেও প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে যে প্রশাসনিকশূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সেবাব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছে, প্রভাব পড়েছে নাগরিক স্বাস্থ্য খাতে। মশক নিধন কার্যক্রম নিয়মিত না হওয়া এবং মাঠপর্যায়ে কেউ তদারকি না করায় প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী, বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি, অসম্পূর্ণ প্রকল্প এবং দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় রাজধানীতে স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও গর্ত, কোথাও জলাবদ্ধতা- নাগরিকদের প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তদারকি ও নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ব্যাহত হওয়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিস্থিতিও নাজুক।
দুই সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমন সংকটময় অবস্থায় বেরিয়ে আসার মতো কোনো কার্যকর উদ্যোগও এখনো দৃশ্যমান নয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে।
জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি, সব বিষয়ে অবগত নই। কর্মকর্তাদের শূন্যপদগুলো পূর্ণ করার জন্য মন্ত্রণালয়কে লিখিত আকারে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। এক কর্মকর্তাকে একাধিক দাপ্তরিক কাজ দেওয়া হয়েছে।’
এসব বিষয়ে জানতে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মতামত দেননি। তবে সংস্থাটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেনের কাছে জানতে চেয়ে প্রশ্ন পাঠালে তিনি প্রতিক্রিয়া পাঠান। জোবায়ের জানান, শূন্যপদে নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন-অনাপত্তি পেলে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।