মব ভায়োলেন্স, গণপিটুনি, হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বেশ প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এক শ্রেণির মানুষ আইন হাতে তুলে নিয়ে মব সন্ত্রাস, হেনস্তা, পিটিয়ে হত্যাসহ নানা ঘটনা ঘটালেও সরকারের পক্ষ থেকে সেভাবে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। এই দিবসকে সামনে রেখে আগামীর দিনগুলোতে রাষ্ট্রকে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার দাবিও জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।
তারা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হরহামেশাই ‘তৌহিদী জনতা’সহ নানা নামে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে আসলেও এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে খুবই কম। অভিযুক্ত মবকারীকে ফুলের মালা দেওয়াসহ নানা উদাহরণ সামনে এসেছে, যাতে তাদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল কামাল বায়েজীদ, মানবাধিকার ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থে করা বিভিন্ন মামলার আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক খবরের কাগজের কথা হয়।
জানতে চাইলে নাট্যব্যক্তিত্ব কামাল বায়েজীদ বলেন, ‘লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমানে নব্য মৌলবাদ যা কথিত তৌহিদী জনতার নামে ভিন্ন মতাবলম্বীসহ নারী নির্যাতন, নারীর স্বাধীনতায় অনাহূত হস্তক্ষেপ, বাউল শিল্পীসহ সব সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধা প্রদান ও আক্রমণ করছে। আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই। বাংলাদেশকে যারা পশ্চাদপদ আফগানিস্তানে পরিণত করবার পাঁয়তারা করছেন তারাই মূলত তৌহিদী জনতার নাম ধারণ করে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করছেন। রাষ্ট্রের দায় রয়েছে এসব তৌহিদী মব নির্যাতন বন্ধ করা। রাষ্ট্রের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি মব বন্ধে। সব নাগরিকের মানবাধিকার কায়েম হোক-সেই প্রত্যাশা করছি।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন ‘একটা সন্তোষজনক দিক হচ্ছে, ১৫-১৬ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর হলেও এখন মানুষ তাওহিদী জনতার নামে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের করা মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছে। যদিও সরকারের লোকজন বলছে, আগে যারা নিপীড়নের শিকার হয়েছিল, এটা তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সরকারের লোকজন বলতে চাচ্ছে, এমনটা চলতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি এমন যুক্তি কোনো আইনে কাভার করে না। শুধু তাওহিদী জনতা নয়, আরও নাম আছে, আস্তে আস্তে সেসব নামও আসবে। সরকার তাদের থামানোর চেষ্টা করেনি। কিন্তু তাওহিদী জনতা হোক আর ইনকিলাব মঞ্চ হোক, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একদিন তাদেরও বিচারের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। রাষ্ট্রের উচিত আইনের শাসন নিশ্চিত করা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন ‘মানবাধিকারের মৌলিক বিষয় হচ্ছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও চিকিৎসা। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় মানবাধিকার সংস্থাসহ, সুশীল সমাজ, সাংবাদিকদের নিকট মানবাধিকার বিষয়ক গুরুত্ব নির্ধারণে ভুল আছে। অনেকে মৌলিক বিষয়গুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ, দ্বিতীয় সারির- বিশেষত রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেন। এখন যারা তাওহিদী জনতার নামে মব করছে আগে তারা ছিল নিপিড়ীত। আবার এখন যারা নিপীড়িত, আগে তারা ছিল নিপীড়ক- এই দুই পক্ষেরই সুশিক্ষার অভাব আছে। দায়িত্বশীল সবাইকে বুঝতে হবে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের কোনো বিকল্প নেই। যখন যারা নিপীড়ক হচ্ছে, সমাজে-রাষ্ট্রে-বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। অঞ্চলভিত্তিক মানবাধিকারের সূচকে গুরুত্ব ভিন্নতা পাবে, এই উপলব্ধি জরুরি।
আজ মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, ‘আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভিত্তি হোক মানবাধিকার’। দিবসটিকে সামনে রেখে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবিগুলো তুলে ধরে আসক। আসকের সিনিয়র সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
দাবিগুলো হচ্ছে–
১.রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা যেকোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যেমন- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমের অভিযোগ, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এখতিয়ারবহির্ভূত আচরণ ইত্যাদির অভিযোগ উঠলে তা দ্রুততার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে এবং সম্পৃক্তদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শাস্তি প্রদান করতে হবে।
২. এ পর্যন্ত সংঘটিত সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. এ পর্যন্ত যতগুলো গুমের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটির যথাযথ তদন্ত সম্পূর্ণ করতে হবে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৪. দেশের যেকোনো নাগরিককে আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
৫. মিথ্যা মামলা সংক্রান্ত যে অভিযোগগুলো উঠেছে সেগুলো আমলে নিয়ে অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৬. নাগরিকের সমবেত হওয়ার অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকার যথাযথভাবে চর্চা করার পরিবেশ তৈরি এবং জনদুর্ভোগ এড়ানোর̈ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ কিংবা কোনো ধরনের ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেশাদারত্বের আওতায় রেখে তাদের কর্ম-পরিধি নিশ্চিত করতে হবে।
৮. নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক আইনগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে।
৯. ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি করে কোনো সহিংসতার ঘটনা যেন না ঘটে তার জন্য পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিজ বিশ্বাস ও রীতি চর্চার অধিকার এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. শিল্প সংস্কৃতির চর্চা নির্বিঘ্নে করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তাওহিদী জনতার নাম ধারণ করে মব সন্ত্রাস করে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও শিল্প-সাহিত্য চর্চা কেন্দ্র ভাঙচুর, নারী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের হেনস্তাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
১১. জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশন পুনর্গঠনে কমিশনের প্রধান ও সদস্যদের নিয়োগের জন্য একটি উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
১২. পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
১৩. কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মানবাধিকার সুনিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
১৪. অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও সহযোগিতায় বিদেশি দূতাবাসগুলোতে জরুরি হেল্পলাইন নম্বর চালুসহ অন্যান্য কল্যাণমূলক ব্যবস্থা বিস্তৃত করতে হবে।
১৫. সর্বোপরি, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করার জন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে হবে।