বিশ্বের ১৭৬টি দেশে এখন প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। তাদের পরিশ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। তাদের নিদারুণ পরিশ্রমে আজ দেশের অর্থনীতি পেয়েছে এক ভিন্ন চেহারা। তার পরও বিদেশগামী কর্মীরা প্রতারণার হাত থেকে নিষ্কৃতি বা সঠিক বিচার পাচ্ছেন না। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চেষ্টা সত্ত্বেও অভিবাসন খরচ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এই সেক্টরটি স্বার্থান্বেষী নানা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, সরকারি উদ্যোগগুলো যেন ‘অসহায়’। এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস।
সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এই দিবসটি ঘটা করে পালন করলেও প্রবাসীরা আজও তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। তাই কত বেশি কর্মী পাঠিয়ে কত বেশি রেমিটেন্স আনা যায়, সরকারের সেদিকে নজর থাকলেও প্রবাসী কর্মীদের মানোন্নয়ন ও অধিকার রক্ষায় উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই। এখনো অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আমাদের কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর সময় অন্যায়ভাবে কয়েক গুণ বেশি টাকা রাখা হয়। এই অন্যায়ের সঙ্গে খোদ সরকারি লোকজনও অনেক ক্ষেত্রে জড়িত থাকেন। প্রতিটি গন্তব্যের জন্য অভিবাসন খরচ সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে তা কেউ মানে না। এই অন্যায় দেখারও কেউ নেই। এই সেক্টরটি এখন লুটেরাদের দ্রুত টাকা কামানোর সেক্টরে পরিণত হয়েছে। অথচ সেবার মান নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নেয়ামত উল্ল্যা ভূঁইয়া জানান, প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান ও সুরক্ষা দিতে ২৭টি দেশে ৩০টি শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্যও নীতিমালা ও প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু প্রবাসীদের অভিযোগ, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে শ্রমকল্যাণ উইং থেকে কার্যকর তেমন সেবা তারা পান না। কোনো সেবা নিতে গেলে দূতাবাসের একশ্রেণির কর্মচারী নানাভাবে হয়রানি করেন। সেবা দিতে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করেন। অনেক সময় প্রবাসী কর্মীদের দূতাবাসের ধারেকাছেই আসতে দেওয়া হয় না। প্রবাসীদের আশানুরূপ সেবা না পাওয়ার কারণ হিসেবে দূতাবাসের পক্ষ থেকে বারবার জনবল ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়। আবার প্রবাসীদের সেবা দিতে শ্রমকল্যাণ উইংগুলোতে দালাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও নতুন নয়। তারা দূতাবাসে সেবা নিতে আসা প্রবাসীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন এবং এ জন্য নানাভাবে হয়রানি করে থাকেন।
এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের একটি অংশ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও করেছেন। তাদের মতে, সরকারের ব্যর্থতায় গত এক বছরের বেশি সময়ে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি তো হয়নি, বরং পুরোনো বন্ধ হওয়া শ্রমবাজারগুলোও খুলতে পারেনি। বারবার আশ্বাস দিয়েও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান আজও চালু করতে পারেনি সরকার। এমনকি এই বাজারগুলোর আগে বন্ধ হওয়া ৯টি শ্রমবাজারের একটিও এ পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে প্রতিনিয়তই কমছে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার। এতে জনশক্তি রপ্তানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা দেখছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমবাজার নিয়ে গবেষণা করে নতুন বাজার চালু এবং পুরোনো বাজার খুলতে না পারলে যেকোনো সময় ক্ষতির মুখে পড়বে খাতটি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও দেখা দিচ্ছে নানা সংকট। প্রতিবছর মোট জনশক্তি রপ্তানির ৫০ থেকে ৬০ ভাগ কর্মী সৌদি আরবে যান। চলতি বছরেও এ পর্যন্ত যে ১০ লাখ ৭১ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন এবং এর মধ্যে ৭ লাখ ১২ হাজার গেছেন সৌদি আরবে। সৌদি আরবে এখনো সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী যান। সেখানকার বাজারেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নতুন আইনে সৌদি আরবে কাজ করতে গেলে কর্মীদের ‘তাকামুল’ নামের একটি সনদ নিয়ে যেতে হয়। তাকামুল সনদের পরীক্ষা খুবই জটিল এবং সেটা বাংলাদেশি কর্মীদের পক্ষে পাস করা দুরূহ বিষয়। এ ছাড়া দেশটিতে যাওয়ার পর ইকামা, চাকরি, বেতনসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশি কর্মীদের। সৌদি আরবে যাওয়ার পর এসব জটিলতায় কয়েক মাস বেকার বসে কাটাতে হয় কর্মীদের।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার একজন কর্মী বিল্লাল হোসেন খবরের কাগজকে জানান, তিনি যে কোম্পানিতে নিয়োগ পেয়েছেন, সেখানে ৭ মাসের বেতন বাকি। প্রায় ৭০ জন বাংলাদেশি বেতনের দাবিতে সোচ্চার হলে চাকরিচ্যুত করা হয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা না পেয়ে সেখানকার স্থানীয় আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। মামলা প্রায় ৬ মাস চলে। এখনো রায় হয়নি এবং কেউ কাজ ফিরে পাননি। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তেমন সহযোগিতা না পেয়ে প্রতিদিনই খালি হাতে দেশে ফিরছেন শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি, যারা নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসছেন, তারা সঠিক বিচার পাচ্ছেন না, এমনকি তাদের পরিসংখ্যানও নেই মন্ত্রণালয়ের কাছে।