২০২৫ সাল জুড়েই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাকাল ছিল জনগণ। বছরের শুরুতেই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে প্রায় ১০ শতাংশ বা ডাবল ডিজিট দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১০০ টাকার পণ্য ২০২৫ সালে ১১০ টাকায় কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের। এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে রোজা শুরু হলে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে নিত্যপণ্যের দাম। বিশেষ করে সয়াবিন তেলের দাম অনেক বেড়ে যায়। ফল, সবজির দামও লাগামহীন হয়ে পড়ে। রোজার ঈদ শেষ হলেও কমেনি অধিকাংশ পণ্যের দাম। বরং সয়াবিন তেলের দাম লিটারে তিন দফায় ২০ টাকা বেড়েছে। প্রতি মাসের মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ভুগিয়েছে মানুষকে। চাল, আটা, মশুর ডাল, সয়াবিন তেল, মাছ, মাংস, বেগুনসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে সোয়া ৬ থেকে ২০ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকার নিত্যপণ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নেয়। মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তিন দফায় নীতিসুদ (রেপো) হার বাড়ান। তারপরও বাগে আসেনি মূল্যস্ফীতি। কারণ আলু ছাড়া প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে বছরজুড়ে। সয়াবিন তেলের দাম গত ১৫ এপ্রিল, ৩ আগস্ট ও ৫ ডিসেম্বর মোট তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে। ১৭৫ টাকার তেল ১৯৫ টাকা লিটার হয়েছে। এভাবে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে ২০২৫ সালে। প্রায় সব সবজির কেজি ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হয়। সবজির মধ্যে বেগুনের কেজি ২৪০ টাকা, শিম ৩০০ টাকা ছুঁয়েছে। এমনকি নতুন আলু প্রথমে ১৬০ টাকা কেজি কিনতে হয় ভোক্তাদের।
চালের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত ৬ ফেব্রুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে ‘মিল থেকে বাণিজ্যিকভাবে চাল সরবরাহের আগে বস্তার ওপর উৎপাদনকারী মিলের নাম, জেলা ও উপজেলার নাম, উৎপাদনের তারিখ, মিলগেটের মূল্য এবং ধান-চালের জাত উল্লেখ করতে হবে। এসব তথ্য হাতে লেখা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা ১৪ এপ্রিল থেকে। কিন্তু বছর শেষ হলেও তা কার্যকর হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার চালে আমদানি শুল্ক কমালেও কমেনি চালের দাম। দেশে মিনিকেট জাতের ধান না থাকলেও বোরো ধান ওঠার পরও সবচেয়ে বেশি দামেই মিনিকেট চাল বিক্রি হয়। কেজি ৮৫ টাকা। এমনকি বছরের শেষ সময়ে ডিসেম্বরে বোরো ধানের ভালো ফলন হলেও মোটা স্বর্ণা চালের দাম কমেনি। আগের মতো কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষকে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যও বলছে, ২০২৫ সালে চালের মূল্য বেড়েছে গড়ে সোয়া ৬ শতাংশ, আটায় ১০ শতাংশ, মশুর ডালে প্রায় ১৫ শতাংশ, সয়াবিন তেলে ১১ শতাংশ। এমনকি দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও কয়েক দফায় মূল্য বেড়েছে ২০ শতাংশ। সবজির মধ্যে বেগুনের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ। বছরের অধিকাংশ সময় করলা, টমেটো, কাঁচামরিচ, শসাসহ প্রায় সবজি ১০০ টাকার ওপরে কিনতে হয়েছে ভোক্তাদের।
শুধু তাই নয়, মাছ, মাংসের দামও চড়া ছিল বছরজুড়ে। মৌসুমের আগে এমনকি পরেও আড়াই হাজার টাকার কমে মেলেনি এক কেজি ইলিশ। বছরে এই মাছের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ। এমনকি গরিবের জনপ্রিয় চাষের পাঙাশ, কই, তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছও আড়াইশ টাকার কমে মেলেনি। এসব মাছের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১৪ শতাংশ। ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও সোনালি মুরগির দাম একটু কম থাকলেও দেশি মুরগি সারা বছরই চড়া দামে বিক্রি হয়। কেজি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকার কমে মেলেনি ভোক্তাদের। ফলের মধ্যে আপেল, বেদানা, কলাও সারা বছর বেশি দামে কিনতে হয় ভোক্তাদের। এসব ফলের দাম বেড়েছে ১২ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম কমছে। কিন্তু দেশে সিন্ডিকেটের ফলে সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা। শুধু তাই নয়, সরকার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর অনুমতি না দিলেও মিলমালিকরা লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে ১৯৮ টাকায় বিক্রি শুরু করেন। পরে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকার জানে না। কীভাবে তেলের দাম বাড়ে। শেষে তাদের নোটিশও দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে লিটারে ৬ টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৯৫ টাকা বিক্রির ঘোষণা দেয়।’
এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাজারে কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়। পরে সরকারের উদ্যোগে কমলেও দাম যতটা উঠে ততটা আর কমে না। সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম বাড়ানো তার বাস্তব চিত্র। প্রতিযোগিতার পরিবেশ রাখা হলে সিন্ডিকেট চক্র কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াতে পারবে না। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি থামানো যাবে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজার ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও বিশ্ববাজারে চালের দাম কমেছে। কিন্তু আমাদের দেশে বোরো ধানের পর আমনের ফলন ভালো হওয়ার পরও চালের দাম কমেনি।’
একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) একটি দ্রব্য বা সেবার পরিবর্তিত হারকে মূল্যস্ফীতি বলে। যেমন গত বছর এক কেজি মিনিকেট চালের দাম ছিল ৭০ টাকা। বর্তমানে সেই চালের দাম ৮৫ টাকায় ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি হয়েছে ২১ শতাংশ। দেশে দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও (২০২৫-২৬) বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্য ঘোষণা করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তারপরও দাম কমানো সম্ভব হয়নি।