ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে চালু হওয়া আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি ইতোমধ্যে ভোটের সমীকরণ পাল্টে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাঝপথেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে ভোটারদের ঠিকানা বিভ্রাট ও প্রচার ঘাটতি। প্রবাসী ভোটারদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হাজারও কর্মকর্তা পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধনই করতে পারেননি। ফলে বিপুলসংখ্যক পোস্টাল ব্যালট সময়মতো ভোটারের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ৭ লাখ ২৮ হাজার প্রবাসী ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে। অথচ পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপে নিবন্ধন করেছিলেন ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী ভোটার। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৪৫ হাজার নিবন্ধিত ভোটারের কাছে ব্যালট পৌঁছানো বাকি। ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, এর বড় কারণ হচ্ছে নিবন্ধনের সময় ভুল বা অসম্পূর্ণ ঠিকানা দেওয়া এবং পরে ঠিকানা পরিবর্তন।
ঠিকানা বিভ্রাট কাটাতে ইসির উদ্যোগ
ভোটার নিবন্ধনবিষয়ক ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই)’ প্রকল্পের টিম লিডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সালীম আহমাদ খান বলেন, পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধনকারীদের একটি বড় অংশ আবেদনের সময় সঠিক ঠিকানা দেননি অথবা পরবর্তী সময়ে ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন। ফলে ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যালট পাঠাতে গিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ঠিকানা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এর পর থেকে ভুল ঠিকানার সংখ্যা কিছুটা কমলেও এখনো সঠিক সংখ্যা নিরূপণের কাজ চলছে। শনাক্ত ভোটারদের সঙ্গে ই-মেইল ও ফোনে যোগাযোগ করে ঠিকানা সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইসির লক্ষ্য, ২১ জানুয়ারির মধ্যেই সব প্রবাসী ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পৌঁছে দেওয়া।
প্রবাসী ভোটে সংখ্যার হিসাব
ইসি সূত্রে জানা গেছে, পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোটে’ নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন। আর বিশ্বের ১০৪টি দেশ থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী। তাদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৭ লাখ ২৮ হাজারের বেশি ভোটারের কাছে ব্যালট পাঠানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যালট গেছে সৌদি আরবে (২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি), এরপর মালয়েশিয়া ও কাতার।
নিবন্ধন করতে পারেননি অনেক কর্মকর্তা
পোস্টাল ব্যালট চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। পোস্টাল ভোটিংয়ের জন্য দেশের ভেতরে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন। ইসির তৈরি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারের পাশাপাশি এবার দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তিরা নিবন্ধন করছেন। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে (কারাগারে) থাকা ভোটাররা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন।
এদিকে খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। নোয়াখালীর ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ১৭ হাজার ৭০২ জন ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলেও পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৩ হাজার ৭০৪ জন, যা মোট কর্মকর্তার ২১ শতাংশ। অর্থাৎ ৭৯ শতাংশ কর্মকর্তা ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকেই বাদ পড়েছেন। এই জেলার নির্বাচনি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, নিবন্ধন বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রচার ও দিকনির্দেশনার অভাব ছিল। অনেকেই সময়সীমা সম্পর্কে জানতেন না, কেউ কেউ প্রযুক্তিগত জটিলতায় পড়েছেন।
অন্যদিকে বরিশালে পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধনের চিত্র তুলনামূলক ভালো। এ বিভাগের ছয় জেলায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬৬ জন নির্বাচনি কর্মকর্তা পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটারের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, আনসার-ভিডিপি সদস্য ও কারাবন্দিরাও রয়েছেন। বরিশালের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথমবারের উদ্যোগ হিসেবে এই সাড়া সন্তোষজনক হলেও আরও সময় ও পরিকল্পনা থাকলে অংশগ্রহণ বাড়ানো যেত।
পোস্টাল ব্যালট: গেম চেঞ্জার নাকি ঝুঁকি?
বিশ্লেষকদের মতে, বহু সংসদীয় আসনে যেখানে অতীতে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল কয়েক হাজার ভোট, সেখানে এবার পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। ফেনী-৩ আসনে নিবন্ধন হয়েছে ১৬ হাজারের বেশি ভোটারের। ফলে পোস্টাল ব্যালট ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ঠিকানা বিভ্রাট, সময়মতো ব্যালট না পৌঁছানো এবং ফেরত ব্যালট আসার সময়সীমা–এই তিনটি বিষয় পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সময়ের সঙ্গে দৌড় ও গোপনীয়তা রক্ষা
প্রবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ইসি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পোস্টাল ব্যালট কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘ইতোমধ্যে বেশির ভাগ প্রবাসী ভোটারের কাছে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে এবং বাকিগুলোওও দ্রুততম সময়ে পাঠানোর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভোটারদের দেওয়া ঠিকানা অসম্পূর্ণ বা পরিবর্তিত হওয়ায় ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যালট পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে যেসব ঠিকানাজনিত সমস্যা শনাক্ত করা যাচ্ছে, সেগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ডাক বিভাগের হিসাবে দূরবর্তী দেশ থেকে চিঠি ফিরতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ২৮ দিন। সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা আগেভাগে পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে প্রবাসী ভোটাররা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ভোট দিতে পারেন। কারণ সময়মতো ব্যালট না পৌঁছালে বিপুলসংখ্যক ভোট কার্যত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। গোপনীয়তা লঙ্ঘন করলে ভোটারের এনআইডি ব্লক করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রবাসী ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পোস্টাল ব্যালট নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। তবে এ পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঠিকানা সঠিক করা ও শেষ মুহূর্তের ব্যবস্থাপনা। কিন্তু ঠিকানা বিভ্রাট, প্রচার ঘাটতি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন ইসির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো–সময়মতো ব্যালট পৌঁছানো নিশ্চিত করা। অন্যথায় ইতিহাসের এই প্রথম উদ্যোগ হয়তো সম্ভাবনার চেয়ে সমস্যার কথাই বেশি বলবে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে নোয়াখালী ও বরিশাল প্রতিনিধি তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।