চলতি অর্থবছরে (২৫-২৬) যমুনা রেল সেতু প্রকল্পে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সরকার বরাদ্দ দেয় ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। সেই বরাদ্দ থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে ৭৭৫ কোটি টাকা বা প্রায় ৫০ শতাংশ বরাদ্দ। পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে ১ হাজার ৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তা থেকে কমানো হচ্ছে ৩৩০ কোটি টাকা বা ৩০ শতাংশ বরাদ্দ। রেলের সব প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ৫৫ শতাংশ। মেট্রোরেলের এমআরটি-১ প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে সবচেয়ে বেশি, ৯১ শতাংশ। এমআরটি-৫ (উত্তর)-এর বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। এভাবে যোগাযোগের সব খাতেই প্রকল্পের মাঝপথে অর্থ বরাদ্দ কমছে ৩৫ শতাংশ।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ কমছে ৭৩ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে কাটছাঁট করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশ। এভাবে প্রায় সব খাতে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে অর্থ বাদ দেওয়া হচ্ছে ৩০ হাজার কোটির টাকার মতো। আজ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এই কাটছাঁটের বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে উপস্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্য বছরের মতো এবারও এডিপি সংশোধন করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের কারণে আগেই এই সভা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সেখান থেকে কাটছাঁট করা হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। ১ হাজার ১৭১টি প্রকল্পের বিপরীতে এই বরাদ্দ রয়েছে। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির অর্থের মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়া হয় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ১৬ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। আর মূল এডিপিতে বিদেশি ঋণ বা প্রকল্প সহায়তা হিসেবে ধরা হয় ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এখান থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, দেশি-বিদেশি অর্থে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি কমানো হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে, ৭৪ শতাংশ। এরপরই সামাজিক সুরক্ষা খাতে ৭৩ শতাংশ। পরিবহন, শিক্ষা খাতে ৩৫ শতাংশ করে অর্থ কাটছাঁট করা হচ্ছে। এরপর কৃষি খাতে ২১ শতাংশ অর্থ বাদ দেওয়া হচ্ছে। তবে ধর্ম খাতে ৩৫ শতাংশ এবং পরিবেশে ২০ শতাংশ অর্থ বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া প্রতিরক্ষায় ১৩ ও স্থানীয় সরকার বিভাগে ১২ শতাংশ অর্থ বাড়ানো হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ১০টি মেগা প্রকল্পের ৮টিতেই বরাদ্দ কমছে। এর মধ্যে মেট্রোরেলের এমআরটি-১ প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হচ্ছে সবচেয়ে বেশি– ৯১ শতাংশ। এমআরটি-৫ (উত্তর)-এর বরাদ্দ কমছে ৬০ শতাংশ। মেট্রোলাইনসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে গড়ে ৩৬ শতাংশ। এডিপিতে এসব প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে সেটি ১২ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা কমে হচ্ছে ২১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাতায়াত করলেও শেষ হয়নি এমআরটি-৬-এর কাজ। কমলাপুর পর্যন্ত কাজ চলমান। দেশের প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি (ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট) লাইন-৬-এর বরাদ্দ কমানো হচ্ছে ২৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ থেকে ৩২৪ কোটি টাকা কমানোর কথা বলা হয়েছে আরএডিপির খসড়ায়। চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা। কারণ এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্পে অর্থ বাড়ানো বা কমানো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা বাস্তবায়নকারী সংস্থার পক্ষ থেকে করা হয়। তারা যা বরাদ্দ চায় তার ভিত্তিতেই আমরা সংশোধিত এডিপি বা আরএডিপিতে চূড়ান্ত করার কাজটা করে থাকি। পরিকল্পনা কমিশনের তৈরি করা আরএডিপির খসড়া প্রতিবেদন এভাবেই চূড়ান্ত করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা, বাস্তবায়ন অগ্রগতি এবং সরকারের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ করে এনইসি সভায় উপস্থাপন করা হয়। এনইসির চেয়ারপারসন তাতে অনুমোদন দেন। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এনইসি বৈঠকে উত্থাপন পর্যন্তই পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের কাজ। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে আজ এনইসি সভায় চলতি অর্থবছরের আরএডিপির অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।
বিভিন্ন খাত ও প্রকল্পের এই কাটছাঁট নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘নানা কারণে অন্য বছরের মতো এবারও এডিপিতে অর্থ বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। প্রথমত, রাজনৈতিক কারণে মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ কমছে। দ্বিতীয়ত, গত ৬ মাসের এডিপি বাস্তবায়নের গতি অনেক স্লথ। গত ১০ বছরের মধ্যে এই হার সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। তৃতীয়ত, রাজস্ব আদায়ের নিরিখেই অর্থ ব্যয় করতে হয়। কারণ রাজস্ব আদায় করেই সরকার ব্যয় করে। তবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানো হচ্ছে, এটা দুঃচিন্তার কারণ।’