জাতীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুজব, ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন) এবং অপপ্রচার (ডিসইনফরমেশন) রোধে বিশেষ হটলাইন সেবা আগেই চালু করেছে সরকার। এবার এ সুবিধা প্রত্যন্ত এলাকাতেও পৌঁছে দেওয়া হলো। অভিযোগ করতে পারবে দেশের যেকোনো জায়গা থেকে। সব ধরনের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি’কে (এনসিএসএ) বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই এজেন্সি আজ থেকে ইউনিয়ন পর্যায়েও নজরদারি করবে। অপপ্রচার ও গুজব বন্ধে দেশি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। অপপ্রচার ও গুজব বন্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছে এমন একাধিক প্রতিষ্ঠানকেও এবার দেশে কাজ করতে সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
অপপ্রচার ও গুজব বন্ধে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে যাবতীয় কার্যক্রম সমন্বয় ও নজরদারি করা হচ্ছে। অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানোর কাজে জড়িতদের দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আসন্ন নির্বাচন ঘিরে সব ধরনের অপপ্রচার ও গুজব বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হটলাইন সুবিধা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও পাবে এবং সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিকে শহরের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়েও নজরদারি করতে হবে।
এরই মধ্যে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আসন্ন নির্বাচন ঘিরে সব ধরনের অপপ্রচার ও গুজব বন্ধে প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ কাজে জড়িতদের প্রচলিত আইনে দ্রুত বিচারের কথাও বলেন।
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো হয়েছে। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। উসকানিমূলক অপপ্রচার ও গুজব অনেক ক্ষত্রে জনবিশৃঙ্খলা ও মবও সৃষ্টি করেছে। এসব অপপ্রচার ও গুজব বন্ধ করতে বর্তমান সরকার একগুচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যা গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণলায়, সকল বন্দরসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে সব ধরনের অপপ্রচার ও গুজব বন্ধে জোর বাড়ানো হয়েছে। সব রাজনৈতিক দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করছি। কিন্তু আমরা সবাই জানি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা নির্বাচন ভণ্ডুল করতে চেষ্টা করছে। অনেকে দেশের বাইরে থেকেও অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। সরকার কঠোরভাবে এসব অপপ্রচার ও গুজব বন্ধে কাজ করছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব খবরের কাগজকে বলেন, ‘‘৩৫টি প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ (সিআইআই) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।’’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গুজব ও সাইবার অপরাধ বাড়তে পারে। তাই এসব প্রতিরোধে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর মধ্যে নিবিড় সমন্বয় সাধনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমরা লক্ষ্য রাখছি কেমনভাবে এসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, কোন জায়গায় কাজে ত্রুটি আছে। কাজ করতে গিয়ে যেসব সমস্যা দেখা দিচ্ছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার সমাধান করা হচ্ছে।’
প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সারা দেশে বিশেষভাবে প্রত্যন্ত এলাকাতেও নজরদারি করা হচ্ছে। আমরা জানি বিগত ফ্যাসিস্টটদের অনেকে আত্মগোপনে আছেন। এসব ব্যক্তিদের অনেকে বিদেশে থেকেও অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে দেশের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এতে হানাহানি মারামারির সৃষ্টি হচ্ছে। এসব বন্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছে এমন সব প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হবে। এসব বিষয়ে যোগাযোগ চলছে।’
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় সূত্র জানায়, জাতীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুজব, ভুল তথ্য (মিসইনফরমেশন) এবং অপপ্রচার (ডিসইনফরমেশন) রোধে বিশেষ হটলাইন সেবা চালু করেছে সরকার। নাগরিকরা ০১৩০৮৩৩২৫৯২ নম্বরে কল করে অথবা [email protected] ঠিকানায় ইমেইল করে এই সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ জানাতে পারবেন।
সূত্র আরও জানায়, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ছড়ানো অপপ্রচার ও গুজব মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সহযোগিতা চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি এই আহ্বান জানান।
ফোনালাপে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর, গুজব ও জল্পনা-কল্পনার এক বিশাল জোয়ার তৈরি হয়েছে। দেশি ও বিদেশি উভয় মাধ্যম থেকেই এই পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’ তিনি এর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জবাবে হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক জানান, তারা এই সমস্যা সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ‘প্রচুর অপপ্রচার হচ্ছে এবং এটি মোকাবিলায় যা যা প্রয়োজন, জাতিসংঘ তার সবই করবে।’
তিনি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।