স্বাধীনতার আগে স্থাপিত পাইপলাইন দিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে তিতাসের গ্যাস। এই সংস্থার মূল লাইনগুলো এখন জরাজীর্ণ। এ কারণেই বারবার গ্যাসলাইনে লিকেজ দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর তিন স্থানে পাইপলাইনে স্থাপিত ভালভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, এটি নাশকতা নয়, সাধারণ দুর্ঘটনা। তবে জরাজীর্ণ লাইন মেরামত করা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে জানান, সারা দেশে তিতাস গ্যাস সরবরাহের মূল যে পাইপলাইন রয়েছে, তা স্বাধীনতার আগে স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৬৮ সালে এসব পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। ফলে পাইপলাইনগুলো স্বাভাবিকভাবেই জরাজীর্ণ হয়ে আছে। এতে পাইপলাইনের অনেক স্থানে লিকেজ যেমন হচ্ছে, আবার ভালভগুলো পুরোনো হওয়ায় অনেক ভালভেই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি স্থানে তিতাস গ্যাস পাইপলাইনের ভালভ বিস্ফোরণসহ কয়েক স্থানে লিকেজের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। ফলে গ্রাহকরা সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হন।
তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ট্রান্সমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ জানুয়ারি টঙ্গীর তুরাগ নদের তলদেশে পাইপলাইনে ভালভ বিস্ফোরিত হয়। এর আগে গত ১০ জানুয়ারি মিরপুর রোডে গণভবনের সামনে একটি ভালভ ফেটে গেলে তিতাসের গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকার আমিন বাজারে তুরাগ নদের তলদেশে ট্রলারের নোঙরের আঘাতে গ্যাসের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি গ্যাস পাইপলাইনের কয়েক জায়গায় লিকেজ হয়ে গ্যাস বের হতে থাকে। এসব কারণে গত কিছুদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে শুরু হওয়া গ্যাস-সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
এসব বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, শীতের সময় সাধারণ নিয়মেই গ্যাসের সরবরাহ কম থাকে। ঠাণ্ডার কারণে এ সময় গ্যাস জমাট হওয়া শুরু করে। ফলে জমাট বাঁধা গ্যাস পাইপের অনেক স্থান দখল করে। এতে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া পরপর কয়েকটি দুর্ঘটনায় মেরামতের প্রয়োজনে সাময়িক সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। আবার নদীর তলদেশে গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরিত হওয়ায় পাইপে পানি প্রবেশ করে। পানি অপসারণ করে লাইনে স্বাভাবিক করে গ্যাস সরবরাহ রাখার প্রয়োজনেও সাময়িকভাবে পাইপলাইন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এসব কারণে রাজধানীতে গ্যাস-সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে তিতাস গ্যাসের গ্রাহকরা ভোগন্তির শিকার হন।
মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রাহক বিড়ম্বনার কথা মাথায় রেখেই বর্তমানে প্রতিদিন ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে পাইপলাইন ও ভালভগুলো পুরোনো হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত চাপ নিতে পারছে না। এ জন্য দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে দ্রুতই এসব ভালভ ও লিকেজ মেরামত করা হচ্ছে। এসবের কোনোটিই নাশকতা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কল্যাণপুরে গ্যাস পাইপলাইনে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা একটি নৌকার নোঙর ফেলার কারণে। সচিব বলেন, যে পাইপলাইনগুলো নদীর তলদেশের মাটির নিচে হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এসব লাইন নদীর তলদেশে ঠিকই আছে; কিন্তু মাটির ওপরে। তখন প্রযুক্তি এখনকার মতো এত উন্নত ছিল না। এ কারণে হয়তো তখন নদীর তলদেশে মাটির ওপরেই স্থাপন করা হয়েছে। ফলে এবার পাইপের ওপরে লোহার নোঙর ফেলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে।
সচিব বলেন, এ ছাড়া রাজধানী ও আশপাশের অনেক এলাকায় মূল গ্যাস পাইপলাইন থেকে অনেকে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়েছে। এসব কারণে এর আগেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতে আরও দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কা আছে।