অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। দাবি আদায়ে বড় ধরনের আন্দোলনও হয়েছে। এই টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের গত সাত মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
রাজস্ব সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব খাতে গতি আনতে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির অনেক সুপারিশ আমলে আনা হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এনবিআরের মতো বড় মাপের একটি প্রতিষ্ঠান বিভক্তীকরণের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মেনে নিতে পারেননি। তারা আন্দোলন করেছেন। প্রায় ছয় মাস রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বন্ধ ছিল। আলোচনার মাধ্যমে কাজটি করা হলে আন্দোলন হতো না। রাজস্ব আদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ত না।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ও রাইজিং ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান (বাবু) খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমরা আশা করেছিলাম যে শিল্পবান্ধব রাজস্বনীতি ও এনবিআর হবে। অথচ সরকার সেদিকে না গিয়ে উল্টোপথে হেঁটেছে। এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আমাদের হয়রানি করেছেন। বিভিন্নভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের আবেদন হয়রানিমুক্ত এনবিআর গড়ে তোলার।’
নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, বিনিয়োগবান্ধব এনবিআর গড়ে তুলতে হবে। এনবিআর বিভক্ত করে সুফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচিত সরকারকে এনবিআরের বিষয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার অনেক খাতে নতুন করে রাজস্ব আরোপ করেছে। এতে বেসরকারি খাতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। খরচ বেড়েছে। বিনিয়োগবিমুখ হচ্ছেন অনেকে।
বেসরকারি খাতের বেহাল দশায়ও অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে ১২ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায় বাড়াতে শতাধিক পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ করে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য উৎপাদনের খরচ আরও বেড়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব (আয়কর-ভ্যাট-শুল্ক) অব্যাহতি বাতিল করে। এতেও অনেক খাতের রাজস্ব বেড়ে যায়। এসব পদক্ষেপের ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ে। ব্যবসার খরচ বাড়ে।
অন্যদিকে এনবিআর বিভক্তীকরণ নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কলমবিরতি করে রাজপথে নেমে আসেন। সারা দেশে রাজস্বসংক্রান্ত কার্যক্রম বন্ধ করে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা করা হয়। সব বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করা হয়। এনবিআর বিভক্তীকরণের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে কয়েক ধাপে প্রায় ছয় মাস আন্দোলন চলে। এ সময় কার্যত রাজস্ব আদায় কার্যক্রম চলেনি।
চট্টগ্রামের লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণে ও ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিল এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও বে-টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণ, পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল ইজারা এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও বে-টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কর্মচারীরা তীব্র আন্দোলন ও কর্মবিরতি পালন করেছেন। ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে এই আন্দোলন চলে, যার ফলে বন্দরের কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন জানিয়েছে, সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকারকদের অতিরিক্ত জরিমানা দিতে হয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। কর্মবিরতিতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ১ হাজার ২৪১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার এসব চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে করা উচিত ছিল, সরকার তা করেনি। এই অল্প সময়ে এসে কেন সরকার এসব চুক্তি করবে?
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দরসহ যেকোনো চুক্তি ব্যবসায়ীদের এবং প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণ করা উচিত। চট্টগ্রাম বন্দরকে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের লাইফলাইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি ও রপ্তানির পণ্য এই বন্দরের মাধ্যমে খালাস হয়। আমদানি ও রপ্তানির জন্য এই বন্দর থেকে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২ দশমিক ৬ লাখ টিইইউ এবং প্রতিদিন গড়ে ৯ হাজার টিইইউ খালাস হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ের জন্য এসে এত বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক হয়নি।