‘১২ কেজির এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার দেড় হাজার টাকায় কেনা। তা বিক্রি করা হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়। এখনো সংকট কাটেনি। বেশি দামেই কেনাবেচা করতে হচ্ছে। এতে আমাদেরও খারাপ লাগছে।’ তেজগাঁও থানার নিমতলার খুচরা এলপি গ্যাস বিক্রেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম এভাবেই দামের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভোক্তাদের সিলিন্ডারপ্রতি এখনো ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
ডিলাররা বলছেন, আগের তুলনায় এলপি গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। তবে কোম্পানি থেকে কমিশন না দেওয়ায় বেশি দামেই বেচাকেনা করতে হচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ার ব্যাপারে কোম্পানিগুলো দুষছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে। তারা বলছে, গভর্নরের স্বেচ্ছাচারিতায় এলপি গ্যাস সংকট দূর হচ্ছে না। দেশে হইচই পড়লেও ২২টি কোম্পানিকে এখনো গ্যাস আমদানির জন্য এলসি খুলতে দেওয়া হচ্ছে না। গতকাল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতি মাসেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। জানুয়ারি মাসে কম থাকলেও ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। তবে সেই দামে ভোক্তাদের ভাগ্যে জুটছে না। এখনো নির্ধারিত দামের তুলনায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
মোহাম্মদপুর ফিউচার হাউজিংয়ের খুচরা গ্যাস বিক্রেতা মো. শাকিল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। তবে ডিলাররা এখনো দাম কমাননি। ১২ কেজির পেট্রোম্যাক্স সিলিন্ডার ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তবে বসুন্ধরার দাম বেশি, ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
তার কথার সত্যতা যাচাই করতে একই এলাকার পেট্রোম্যাক্স এলপি গ্যাস কোম্পানির ডিলার মেসার্স এমএন ট্রোডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। আগে দিনে ২ থেকে ৩ গাড়ি এলপি গ্যাস এলেও এখন ১ গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। ১ গাড়িতে ৫৮৮টি সিলিন্ডার থাকে। ১২ কেজির সিলিন্ডারে ১ হাজার ৩৫৫ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা জমা দিতে হচ্ছে। তাই একটু বেশি দামে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।’ নির্ধারিত দামের তুলনায় বেশি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কমিশন পাওয়া যায় না। গাড়ি ভাড়া, দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন রয়েছে। তাই দাম বেশি রাখতে হচ্ছে। তবে এই দাম জানুয়ারি মাসের তুলনায় কম রাখা হচ্ছে। কোম্পানি থেকে কমিশন দিলেই দাম কম রাখা হবে।’
কারওয়ান বাজারের জনতা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুল হকও বলেন, ‘আমি পেট্রোম্যাক্স, বিএম, সেনা কল্যাণ কোম্পানির এলপি গ্যাসের ডিলার। তারা আগে ঠিকমতোই গ্যাস দিত। কিন্তু গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে সংকট শুরু হয়েছে। তারা আগে পরিবহন বাবদ কমিশন দিত। কিন্তু জানুয়ারি মাস থেকে আর দিচ্ছে না। এ জন্য নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫৬ টাকা দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তবে গ্যাসের সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে।’
রাজধানীর মালিবাগ, পান্থপথসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতেও বেশি দাম ছাড়া মেলে না এলপি গ্যাস। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান না থাকায় সিন্ডিকেট চক্র মিলেমিশে ভোক্তাদের পকেট কাটছে। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কেউ বলতে পারে না। এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও বিইআরসি বলছে, দেশে বর্তমানে এলপিজির চাহিদা বছরে কম-বেশি ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা তা বিক্রি করেন। ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের এলপিজি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম সরকার জানুয়ারিতে নির্ধারণ করে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গত মাসে এর দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২৫৩ টাকা। কিন্তু সেই দামে মেলে না।
লোয়াব বলছে, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। ৪ থেকে ৫টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে। অন্যদের বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি করতে দিচ্ছে না। এ জন্য আগের মতো আমদানি স্বাভাবিক হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে লোয়াবের সহসভাপতি ও এনার্জি-প্যাক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার টনের মতো। ডিসেম্বরে আমদানি কম হয়েছে। জানুয়ারিতে কিছুটা বাড়ে। এই মাসে গত ২৩ দিনে ৯১ হাজার টন আমদানি হয়েছে। পথে আরও ৩০ হাজার টন আছে। চাহিদার তুলনায় একটু কম আছে। তাই সংকট দূর করার জন্য লোয়াব থেকে বেশি করে আমদানির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করা হয়। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এলসি খোলার অনুমতি দিচ্ছেন না। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়ার পরও তার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বেক্সিকো, বসুন্ধরাসহ অন্য আরও ২২টি এলপি গ্যাস কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না। সংকট লেগেই আছে।’
ডিলারদের কমিশন না দেওয়ার কারণে নির্ধারিত দামে গ্যাস পাচ্ছেন না ভোক্তারা–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণ করা দরকার। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়তি। তাই বেশি দামে কেনার কারণে ডিলারদের কমিশন দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’