‘আমরা গুপ্ত ছিলাম বলে আজকে তোমরা সরকারে। অতএব আমরা গুপ্ত, এটা আমাদের সম্মানের।’–বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা একটি ভিডিওতে একজনকে এসব কথা বলতে শোনা যায়। গতকাল রবিবার এই পোস্ট দেন তিনি।
বেসরকারি একটি টেলিভিশনের লোগোযুক্ত ওই ভিডিওর পোস্টে রাকিব লিখেছেন, ‘গুপ্ত টাইটেলের সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকুক, সেই প্রত্যাশা রাখছি। কিন্তু আপনার সমগোত্রীয় শ্রেণির প্রাণীদের গুপ্ত বললে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়, হামলা করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল ও নোংরা গালি দেয়।’
এদিকে ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক দিনের নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় চলছে ‘বটবাহিনী’র অপতৎপরতা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বর্তমান সময়ে তিনি বটবাহিনীর আক্রোশের শিকার হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগেও তিনি রাজনীতিবিদদের মধ্যে ভুয়া তথ্যের কবলে পড়েন সবচেয়ে বেশি। তবে বর্তমান সময়ে ওই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বটবাহিনীর শিকার হচ্ছেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানিয়ে বটবাহিনীর মাধ্যমে ছড়ানো এসব কন্টেন্টে তারা দীর্ঘ ১৭ বছর তারেক রহমানের দেশে না আসা, বিএনপি আমলে বিদ্যুৎ সংকটের বিপর্যস্ত অবস্থাকে ‘খাম্বা’ শিরোনামে তুলে ধরা, বিগত বিএনপির সরকার আমলে গুলশান অফিস, হাওয়া ভবনে চাঁদাবাজি ও কমিশন বাণিজ্য করা হতো বলে অভিযোগ করে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের বিগত দেড় যুগে বিএনপি আন্দোলন করে সরকার ফেলতে না পারা, বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসার সামনে থেকে বালুর ট্রাক সরাতে না পারার কথাও উল্লেখ করে।
‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা-সমালোচনাও শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। ওই পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে বিভিন্ন জায়গায় মিছিল করে ছাত্রদল। মিছিলে তারা ‘গুপ্ত রাজনীতি, চলবে না চলবে না’, ‘স্বৈরাচার আর রাজাকার মিলে মিশে একাকার’, ‘লুঙ্গির তলে রাজাকার, লুঙ্গির মালিক স্বৈরাচার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেয়।
ছাত্রদলের দাবি, তারেক রহমান ও জাইমা রহমানকে নিয়ে তৈরি একটি বিতর্কিত ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরপন্থি প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। তবে রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, ভাইরাল হওয়া স্ক্রিনশটটি ভুয়া। এসব অভিযোগ-পাল্টাঅভিযোগের মধ্যে সংঘর্ষেও লিপ্ত হয় ছাত্রদল-ছাত্রশিবির।
প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে ছড়ানো ২০০-এর মতো ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। নির্বাচনের আগে ছড়ানো ভুয়া তথ্যগুলোর শিকার মূলত রাজনৈতিক দল ও নেতারাই হয়েছেন। ভুয়া তথ্যের মধ্যে তখন একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছিল বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে।
ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার, ফ্যাক্ট ওয়াচ, ডিসমিসল্যাব, বাংলা ফ্যাক্ট ও দ্য ডিসেন্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই সাত দিনে ১৯০টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ৯৩টি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এর মধ্যে ২৯টি রয়েছে তারেক রহমানকে নিয়ে। এ ছাড়া তখন তার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসও ভুয়া তথ্যের শিকার হন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের পর সবচেয়ে বেশি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়েও তখন ছড়ানো হয়েছে ভুয়া তথ্য।
তথ্যগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারেক রহমানের বক্তব্য বিকৃত করে ও ভুয়া উদ্ধৃতি দিয়ে প্রচার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর খবরের কাগজে বটবাহিনীর তৎপরতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের জন্য ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক (শাকিল চৌধুরী) বলেছিলেন, ‘ফেসবুককে পুঁজি করে ফেসবুকেই নানা পোস্টের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড। এতটুকু পর্যন্ত সবকিছুই খুব স্বাভাবিক, বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। কিন্তু অবাক করা কিছু অতিরঞ্জিত বিষয়ও সামনে চলে আসে। বিশেষ ইস্যুকে পুঁজি করে বটবাহিনী রাজনীতিকে নিজের দিকে নিয়ে আসতে চায়। অনেকেই তাদের নাম দিয়েছেন বটবাহিনী।’ শাকিল চৌধুরী বলেন, ‘এই বাহিনীর কাজই হলো ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অন্য দলগুলো নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো।’
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর তানভীর হাসান জোহা তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। দৈনিক খবরের কাগজকে তিনি বলেছিলেন, “ইংরেজি রোবট (Robot) শব্দের শেষাংশ থেকে এই বট শব্দটি এসেছে। রোবট যেমন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে, এই ‘বট’ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এতে প্রোগ্রাম সেট করে যদি কমান্ড দিয়ে দেওয়া হয়, বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কমেন্টের ঘরে গিয়ে ওমুককে গালি দিতে (বা নির্দিষ্ট করে অন্য কিছু বলতে), সে তাই করবে। আবার যদি বলা হয়, অমুক অমুক ফেসবুক পোস্টে গিয়ে ‘লাইক’ দিতে, সে তাই করবে। হাজার হাজার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এ ধরনের পোস্ট, লাইক, ডিসলাইক (হাসির ইমো) বা কমেন্ট দেওয়া যায়।”
জোহা বলেন, ‘একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সাধারণত একজন মানুষের হয়, এটি মানুষ পরিচালনা করে। তবে বটের অ্যাকাউন্টগুলো কোনো মানুষ পরিচালনা করে না। সেট করে দেওয়া প্রোগ্রাম/কমান্ড অনুসারে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এর পাশাপাশি আবার নিজ দলের হয়ে দলীয় বিষয়গুলো বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় দ্রুত ভাইরাল করার কৌশলেও বেশ পটু এই বটবাহিনী। দ্রুত লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারে রীতিমতো প্রশংসার ফুলঝুরিতে রূপান্তর করতে পারে যেকোনো নেগেটিভ পোস্টকেও। বিশেষ এই গোষ্ঠীর বটবাহিনী অপপ্রচার চালায় তাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে কমেন্ট বক্সে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্য দলগুলোর পোস্টে বাজে বাজে সব কমেন্ট করে।’