রাজধানীর ব্যস্ততম বিজয় সরণি সিগনালে মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুর সোয়া ১টার দিকে ছিল যানবাহনের বেশ চাপ। ফার্মগেট থেকে জাহাঙ্গীরগেটমুখী গাড়ির জন্য জ্বলছিল লাল বাতি। কিন্তু দুটি প্রাইভেট কার ও দুটি মোটরসাইকেল নিয়ম অমান্য করে সামনে জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপরে উঠে যায়। ট্রাফিক পুলিশের একজন কনস্টেবেল এগিয়ে গিয়ে গাড়ি দুটির চালকদের সতর্ক করেন এবং দাগের পেছনে অবস্থান করতে বলেন। কিন্তু তারা কোনো গুরুত্ব দিলেন না। বাগবিতণ্ডায় না গিয়ে সিগনাল পয়েন্টে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে ওই কনস্টেবল যেন বলছিলেন- ‘সতর্ক করার ছিল করলাম, শুনল না, যা করার এআই ক্যামেরাই করবে।’
সামনে গিয়ে পরিচয় দিয়ে আলাপ করলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানে (বিজয় সরণি মোড়ে) আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) সমৃদ্ধ ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ট্রাফিকব্যবস্থা এখন এই ‘এআই’ ক্যামেরা দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ট্রাফিক আইন না মানলে অনেককেই স্বয়ংক্রিয় মামলা দিচ্ছে এআই।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, শুধু বিজয় সরণি মোড় নয়, রাজধানীর এমন ২৫টি পয়েন্টে ট্রাফিক সিগনাল না মানলেই চালকদের বিপদ, এখন স্বয়ংক্রিয় মামলা দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত ক্যামেরা। রাজধানীর গুলশান-১ ও ২ নম্বরে দুটি পয়েন্টে, জাহাঙ্গীরগেট থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল পর্যন্ত সাতটি পয়েন্টে, হাইকোর্ট ক্রসিং থেকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিং পর্যন্ত ছয়টিসহ আরও ১৫টি পয়েন্টে ডিজিটাল ট্রাফিক সিগনাল লাইট স্থাপন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্রসিংয়ে বসানো হয়েছে এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা। সেগুলো হলো শাহবাগ, হাইকোর্ট ক্রসিং, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, পুলিশ ভবন, পুরাতন রমনা থানা ক্রসিং, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, রামপুরা ট্রাফিক বক্স, মিরপুর রোডের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এলাকা, গাবতলী, শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে ই-প্রসিকিউশন বা ডিজিটাল মামলাব্যবস্থাও যুক্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এসব পয়েন্টে এআই ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করছে ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ)। এরপর সিগনাল অমান্যকারীদের শনাক্ত করে ডিজিটাল মামলা দেওয়া হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই প্রযুক্তি সবেমাত্র শুরু হয়েছে। এর সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সদস্যদের সিগনাল নিয়ন্ত্রণে কিছুটা চাপ কমবে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করছি।’
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয় এআই প্রযুক্তি ও ই-প্রসিকিউশন। গত সোমবার পর্যন্ত আইন অমান্যের তিন হাজারের বেশি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রথম তিন দিনেই ৩০০-এর বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এমন ফুটেজ যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুযায়ী মামলা বা নোটিশ পাঠানো হবে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছে। পুলিশ বাহিনীর বাইরে (সরকারি কর্মকর্তা) একজন সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্টের তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হচ্ছে ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট। তার অধীনে চারজন উপপরিদর্শক ও কয়েকজন কনস্টেবল এসব ফুটেজ বিশ্লেষণের কাজ করছেন। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক অটোমেশন সিস্টেমের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের জন্য বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠান ‘বি-ট্র্যাক সলিউশনস লিমিটেড (B-Trac Solutions Ltd.)’-এর সঙ্গে চুক্তি করা হয়।
ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের সংশ্লিষ্টরা জানান, এআই প্রযুক্তির এসব ক্যামেরা লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং ও অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো বিভিন্ন অপরাধ শনাক্তের নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। এগুলো ভাঙা হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফুটেজ সার্ভারে সংরক্ষণ হয়ে যাবে।
ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বলছেন, ডিজিটাল ও এআই প্রযুক্তির ট্রাফিক সিগনাল লাইট স্থাপনে চালকরা অনেকটা সচেতন হতে শুরু করেছেন। কারণ সিগনাল পোস্টের বাতি লাল হলে চালকরা দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। আগের মতো হুট করে কেউ সিগনাল অমান্য করতে পারছেন না। তবে ব্যতিক্রম অনেকে রয়েছেন, যারা সিগনাল ভেঙে চলে যাচ্ছেন। সড়কে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও ওই চালকদের ‘সিগনাল ভায়োলেশনের’ ফুটেজ এআই ক্যামেরা ধারণ করে ফেলছে। যেটা সরাসরি সফওয়্যারে সংরক্ষণ হচ্ছে। সেখান থেকে ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মামলা হয়ে যাচ্ছে।
বিজয় সরণি ট্রাফিক সিগনালে দায়িত্বরত সার্জেন্ট আসলাম খবরের কাগজকে বলেন, কে রাজনৈতিক নেতা, কে পুলিশ, কে সাংবাদিক বা কে ভিআইপি ব্যক্তি- এসব কিছুই এআই ক্যামেরা বোঝে না। যে-ই ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করবে, এআই তাকেই শনাক্ত করে ফেলবে এবং ‘অটো’ (স্বয়ংক্রিয়) মামলা হয়ে যাবে। এতে মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা বা পরিচয় দিয়ে মামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার সুযোগ এখন আর নেই।
মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার সোনারগাঁও ট্রাফিক সিগনাল মোড়ে দেখা যায়, সড়কে যানবাহনের চাপ অনেক। পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলও বেশি। তবে অধিকাংশ যানবাহন সিগনাল মেনে চললেও কিছু যানবাহনচালক তা মানছেন না। এদিকে জেব্রা ক্রসিংয়ে লাল বাতি জ্বলে থাকলেও পথচারী তার তোয়াক্কা করেননি। এই সড়কে কিছু যানবাহনকে (মোটরসাইকেল) উল্টো পথেও যেতে দেখা যায়। সোনারগাঁও ট্রাফিক সিগনালে দায়িত্বরত সার্জেন্ট সারওয়ার খবরের কাগজকে বলেন, ‘যারা ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করছেন, তাদের বিরুদ্ধে এআই প্রযুক্তির ক্যামেরার মাধ্যমে ডিজিটাল মামলা হবে। তবে আমরা ডকুমেন্ট বা কাগজপত্র তল্লাশি আগের মতোই ম্যানুয়ালি করছি। প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার ফলে সড়কে ট্রাফিক পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপ কিছুটা করেছে।’
গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর ক্রসিং সৌরশক্তির ‘ট্রাফিক সিগনাল লাইট’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীর সড়কে পূর্ণাঙ্গরূপে স্বয়ংক্রিয় মামলা চালু সম্ভব হবে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে রাজধানীর ৩০ পয়েন্টে এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মামলা বা অটোমেটিক মামলা করা শুরু হয়েছে।