‘প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনে পাঠাওতে চালাই। সংসারে আমিই একমাত্র আয় করি। আমি কলেজে ও ছোট দুই বোন স্কুলে পড়ে। বাবা-মা দুজনই অসুস্থ। আগামী বাজেটে মোটরসাইকেলের ওপর নতুন কর আরোপ হলে কিস্তি দেব কোথা থেকে? সংসার চালাব কীভাবে? মোটরসাইকেল কেনার সময়ই তো ভ্যাট-কর দিয়েছি। তাহলে আবার কেন? বড় লোকদের (ধনী) দেখে না সরকার? অল্প আয়ের মানুষের ওপরই যত অত্যাচার, জুলুম!’
- বাড়ির মালিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ান, কর ফাঁকি দিলেও ধরা হয় না
- মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয় না
- বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে কর ফাঁকি চলছে, আটকানো হয় না
- জ্বালানির দাম বাড়তি, গণপরিবহনে ভাড়া বেড়েছে
- বাণিজ্যের আড়ালে ৮০ ভাগ অর্থ পাচার হলেও কমাতে পদক্ষেপ নেই
রবিবার (১৭ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আসন্ন বাজেটে মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপ না করার দাবিতে রাজস্ব ভবনের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে খবরের কাগজের কাছে হতাশ সুরে এসব কথা বলেন সাইফুল ইসলাম নামের এক তরুণ।
শুধু মোটরসাইকেল না, সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত অনেক পণ্য ও সেবা খাতে আগামী বাজেটে খরচ বাড়ানো হচ্ছে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। দেশে বিনিয়োগে গতি নেই। শিল্প খাতে ধস নেমেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবাতাস নেই। কর্মসংস্থান নেই। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকটে দেশের অর্থনীতির সংকট আরও বেড়েছে। সাধারণ মানুষের আয় কমছে। সরকারের আয়ও কমেছে। রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বছর বছর বাজেটের আকার বাড়ানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে সরকারের ওপর অর্থ জোগাড়ের চাপও বাড়ছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সমাজের প্রভাবশালীরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। অতীতে দেখেছি প্রভাবশালীরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের ওপর কোনো ধরনের রজস্ব আরোপ হলেই তা বাতিল করতে বাধ্য করেন। এমন বহু নজির আছে। বাড়ির মালিকদের ওপর প্রস্তাবিত বাজেটে কর আরোপ করা হলে পরে চূড়ান্ত বাজেটে বাতিল করা হয়।’
অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, ‘এনবিআর সহজ পথ হিসেবে সাধারণ মানুষের ওপর রাজস্ব আরোপ করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে। ভ্যাট বাড়িয়ে থাকে। এতে অনেক পণ্য ও সেবা খাতে খরচ বেড়ে যায়। ধনীরা কিন্তু ঠিকই পার পেয়ে যান।’
সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘অতীতের ধারাতেই নতুন সরকার আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকার ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছে। ঠিকই খুঁজে খুঁজে সাধারণ মানুষের ওপর রাজস্ব আরোপ করা হচ্ছে। সরকারকে ভ্যাটের পরিবর্তে আয়কর বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। কিন্তু এনবিআর সেই রিস্ক নিতে চায় না। নিশ্চিত ভ্যাট আদায় হবে যেখানে, সেখানেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়ায়।’
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের মোট অর্থায়নের অর্ধেকের বেশি আদায়ের দায়িত্ব থাকছে এনবিআরের কাঁধে। এনবিআরের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত চেপে ধরা হয় সাধারণ আয়ের মানুষকে।
খোদ এনবিআরের বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আভিজাত এলাকার ৭০ ভাগ বাড়ির মালিক কর ফাঁকি দিলেও ধরা হয় না। এসব বাড়ির মালিকের কাছ থেকে স্বচ্ছতার সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন বিধান আনা হয়। কিন্তু প্রভাবশালী বাড়ির মালিকরা সেই বিধান বাতিল করতে বাধ্য করেন। চূড়ান্ত বাজেটে বিধানটি বাদ দেওয়া হয়। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চাপ থাকলেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয় না। কোটি টাকার বেশি দামের গাড়ি আমদানিতে বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি হয়। এখানে সরকারকে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। পরিবারে একাধিক কোটি টাকা দামের গাড়ি আছে–এমন ব্যক্তিদের ৬৫ ভাগই রিটার্নে প্রকৃত তথ্য উল্লেখ করেন না। অথচ মোটরসাইকেল, অটোরিকশার মতো সাধারণের ব্যবহৃত পরিবহনে আগামী বাজেটে নতুন করে কর বাড়ানো হচ্ছে। আগামী বাজেটে জ্বালানির দাম কমানো হচ্ছে না। জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে গণপরিবহনে ভাড়া বেড়েছে।
বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার
বাণিজ্যের আড়ালে ৮০ ভাগ অর্থ পাচার হলেও কমাতে পদক্ষেপ নেই। বড় মাপের ব্যবসায়ীদের কাছে এনবিআরে বকেয়ার পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব কর বছরের পর বছর আটকা থাকলেও আদায় হয় না। অথচ আসন্ন বাজেটে ছোট্ট মুদি দোকানদার আসছেন ভ্যাটের জালে। আর এতে উপজেলা, পাড়া-মহল্লায় প্রায় সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। আসন্ন বাজেটে ধনীর ওপর আরোপিত সারচার্জ বাতিল হচ্ছে। আরোপ হচ্ছে সাধারণের ওপর সম্পদ কর। এতে বাড়বে ফ্ল্যাট ও প্লটের দাম। অথচ অতিরিক্ত সম্পদ থাকার কারণে সারচার্জ আরোপ হয়। অন্যদিকে উত্তারাধিকার সূত্রে বা নিজের কেনা সম্পদ থাকলেই এর ওপর কর আরোপ হবে। আগামী বাজেটে মোবাইলে কথা বলায়, কম্পিউটার, ইন্টারনেটে খরচ কমছে না। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে নতুন বসছে কর। নাটক, সংগীতানুষ্ঠানের টিকিটের দাম বাড়বে। চাল, ডালসহ নিত্যপণ্য আমদানিতে কর থাকছে। ফলে বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমার পথ থাকছে না। বাজেট ঘোষণার পরই দাম বাড়বে হাজারের ওপর জিনিসপত্রের।
এনবিআর সূত্র জানায়, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১১১-১২৫ সিসির মোটরসাইকেলের জন্য বছরে ২ হাজার টাকা, ১২৬-১৬৫ সিসির জন্য ৫ হাজার টাকা ও ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের কথা বলা হয়েছে।
এ খবরে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশার সৃষ্টি হয়। সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবিতে গতকাল রাস্তায় নামেন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের অনেকে। বাইকারদের পক্ষে স্মারকলিপি জমা দিয়ে মানববন্ধনে নেতৃত্ব দিয়ে এ কে এম ইমন বলেন, ভারতে যে বাইকের দাম ১ লাখ টাকা, তা এখানে কিনতে হয় ৩ লাখ টাকায়। বাইক সাধারণ মানুষের পণ্য। রাইড শেয়ার করে কিংবা পণ্য ডেলিভারি দিয়ে দিনে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করা যায়। এই করারোপ করা হলে এসব মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে দেশের লাখ লাখ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইঙ্গিত দিয়েছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের কর-সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
যা জানা যাচ্ছে
সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে এনবিআর কৃষিপণ্যে উৎসে করের চাপ থাকছে। রপ্তানি প্রণোদনায় উৎসে কর দ্বিগুণ করা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা কমানোর প্রস্তাব করেছে এনবিআর। আসন্ন বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে স্থানীয় ঋণপত্র (এলসি) কমিশনের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ থাকছে। এতে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলা, মসুর ডাল, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, আটা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, দারুচিনি, লবঙ্গ, খেজুরসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ এবং সব ধরনের ফল আমদানিতেও একই করহার আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত এসব পণ্যের খরচ বাড়বে। আগামী বাজেটে রপ্তানি খাতেও করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি প্রণোদনা দিয়ে আসছে সরকার। বর্তমানে এ প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হলেও আগামী বাজেটে তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার চিন্তা করা হচ্ছে। নতুন এসব খাতে খরচ বাড়বে। ফলে সংশ্লিষ্ট খাতে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার আশঙ্কা থাকছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, সরকার অর্থনীতির এই মহাসংকটে নতুন করে রাজস্ব আরোপ করলে তা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর হবে। ব্যবসা করতে না পারলে জিনিসপত্রের দাম কমবে না। আয় বাড়বে না।