অনেক প্রশ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচের আগে বেশি প্রশ্ন ছিল একজনকে ঘিরে। ৩৮ বছর বয়সে, ষষ্ঠ বিশ্বকাপে, পেশির চোট কাটিয়ে মাঠে নামা লিওনেল মেসি কি এখনো ম্যাচ বদলে দিতে পারেন? নাকি তিনি এখন কেবল স্মৃতির এক কিংবদন্তি? কানসাস সিটির রাত সেই সব প্রশ্নের উত্তর দিল গগনবিদারী বর্ণীল উৎসবে। তিন গোল, যেন তিন কবিতা।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে। তিনটি গোলই মেসির। হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে তার প্রথম, আকাশি-নীল জার্সিতে একাদশতম। তার সেই হ্যাটট্রিক শুধু ম্যাচ জেতায়নি; ফুটবল ইতিহাসের পাতায় খুলে দিয়েছে কয়েকটি নতুন অধ্যায়।
জায়ান্ট দলগুলোর হতাশার শুরু চলমান বিশ্বকাপকে ম্লান করে দিচ্ছিল। বিশেষ করে ব্রাজিলের টেনেটুনে ড্র ও নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে অপ্রতিরোধ্য স্পেনের গোলশূন্য ড্র; ভক্তদের নিরাশ করেছে পুরোদমে। তবে কুরাসাওকে বাগে পেয়ে জার্মান মেশিনের চকিত প্রভাব বিস্তার, ৭-১ গোলের জয় বিশ্বকাপে ভিন্ন আমেজ আনলেও ঠিক যেন জমছিল না সব। মেসির হ্যাটট্রিক এক ঝটকায় যেন গতি বাড়াল ইউনাইটেড বিশ্বকাপের।
কানসাস স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরুতেই বোঝা যাচ্ছিল রাতটা হতেও পারে মেসির। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বল জালে পাঠিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু অফসাইড। কিন্তু সেটা যেন ছিল ভূমিকা। মূল গল্প শুরু ১৭ মিনিটে। রদ্রিগো দি পলের পাসে মেসির জাদুকরি শট, ঝাঁপিয়ে পড়েও পারেননি আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। গোল। সেই গোলের পর গর্জে ওঠে স্টেডিয়াম। যেন দর্শক শুধু গোল উদ্যাপন করছে না, নিজেদের প্রিয় এক সত্যকে আবার ফিরে পাচ্ছে।
দ্বিতীয়ার্ধে আবারও হাজির মেসি। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জিদানপুত্র, কিন্তু ফিরতি বলে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের ‘ডাল-ভাত’ গোল। এরপর আসে সেই মুহূর্ত; ৭৭ মিনিটে তিন ডিফেন্ডারের ফাঁক গলে বক্সের বাইরে থেকে মেসির মাটি কামড়ানো শট, গোল। পূর্ণ হয় হ্যাটট্রিক। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া গোটা স্টেডিয়াম যেন উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় জীবন্ত এক কিংবদন্তিকে।
এই রাত শুধু তিন গোলের নয়। মাঠে নামার মধ্য দিয়ে মেসি বনে যান বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার, যিনি ছয়টি আলাদা আসরে খেললেন। হ্যাটট্রিকের পর বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়াল যৌথভাবে সর্বোচ্চ ১৬; ছুঁয়ে ফেললেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে। আর এক গোল হলেই নতুন ইতিহাস হবে মেসির। একই সঙ্গে ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড়ও এখন তিনি। আর ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
তবে এই রাতে একটা অপ্রত্যাশিত দৃশ্যও ছিল। গোলের পর ক্যামেরায় দেখা যায় মেসির চোখ অশ্রুসিক্ত। হ্যাটট্রিকের আনন্দে এমন কান্না? না, পরে মেসি জানান, এর সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক নেই। গত কয়েকটা দিন ব্যক্তিগতভাবে তার জন্য কঠিন গেছে। সেই সময়ে সতীর্থদের পাশে পাওয়া তাকে শক্তি দিয়েছে।
জয়ের পরও মেসির কণ্ঠে ছিল শান্তি। তিনি বলেন, প্রথম ম্যাচ সব সময় কঠিন। আলজেরিয়ার গতিময়তা সম্পর্কে তারা জানতেন, তবে শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ায় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছেন। একই সঙ্গে সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আর্জেন্টিনা ফুটবলকে তারা আবারও কতটা ভালোবাসে, সেটা প্রমাণ করেছে।
আর আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি? তিনি যেন ভাষাই হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার কথায়, ‘মেসিকে নিয়ে কী বলব? আমি যা-ই বলি, অপ্রয়োজনীয় মনে হবে। ২০ বছর ধরেই সে এমন করছে। শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো ফুটবলবিশ্বের উচিত তাকে উপভোগ করা।’
সতীর্থ ম্যাক অ্যালিস্টার বললেন, ‘যদি কেউ ভেবে থাকে তাকে ছাড়া দল ভালো, আজ উত্তর পেয়ে গেছে।’ আর রদ্রিগো দি পলের অনুরোধ, ‘এই জার্সিতে মেসির একটি মিনিটও মিস করবেন না।’
গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার পরের ম্যাচ ২২ জুন, প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। শেষ মহাকাব্য লিখতে আসা মেসি কেমন করবেন সেই ম্যাচে, তা কোটি টাকার প্রশ্ন। কারণ শুরুর ম্যাচেই তিন গোল করা মেসিকে নিয়ে ভক্তদের প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে। সেই চাপ মেসি তো বটেই, টিম আর্জেন্টিনাও বেশ ভালো করে জানে। মার্কিন মুলুকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এসেছে তো শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়েই। যদিও সেই রাস্তাটা অনেক বন্ধুর। কিন্তু মেসি নামক জাদুকর যদি কোনো স্কোয়াডে থাকে, অসম্ভব সম্ভব হতে কতক্ষণ।