বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সংক্ষেপে বিসিবি। কিন্তু নাজমুল হাসান পাপনের শাসনামলে বিসিবিকে অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলতেন বেক্সিমকো ক্রিকেট বোর্ড! এ রকমটি হয়ে ওঠার কারণ ছিল নাজমুল হাসান পাপনের একক রাজত্ব আর স্বেচ্ছাচারিতা। তিনি যখন যেমন চাইতেন, তেমনটিই হতো। এর বাইরে কিছু হওয়ার উপায়ই ছিল না। আবার তার সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সাধ্যও কারও ছিল না।
বেক্সিমকো ফার্মা ছিল নাজমুল হাসান পাপনের কর্মস্থল। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আর এটিই ছিল মূলত বিসিবি বেক্সিমকো হওয়ার মূল কারণ। আবার বিসিবির পরিচালকদের মাঝে সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিচালক ডা. ইসমাইল হায়দার মাল্লিকেরও কর্মক্ষেত্র ছিল। মূলত তার পরামর্শেই নাজমুল হাসান পাপন চলতেন।
বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার সুবাদে নাজমুল হাসান পাপন যখন-তখন বিসিবিতে ডেকে নিতেন প্রধান নির্বাহীসহ অনেক পরিচালককে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্তও আসত বেক্সিমকো অফিস থেকে। পরিচালনা পরিষদের অনেক সভা, জরুরি সভাও নাজমুল হাসান পাপনের ইচ্ছাতে বেক্সিমকো অফিসে অনুষ্ঠিত হতো। এ নিয়ে পরিচালকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ থাকলেও তাদের বলার বা করণীয় কিছু ছিল না। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য অনেক পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি।
নাজমুল হাসান পাপন চার মেয়াদে ১২ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালনকালীন যে পরিমাণ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, অতীতে আর কোনো সভাপতিকে এ রকম করতে দেখা যায়নি। একান্ত প্রয়োজন না হলে আগের সভাপতিরা নিজ অফিসে বিসিবির কোনো সভা করতেন না। বেক্সিমকোতে সভা করার কারণে বিসিবি থেকে সব ধরনের নথিপত্র নিয়ে যেতে হতো। এতে করে বিসিবির অনেক গোপনীয়তাও হুমকির মুখে পড়ত। আবার পরিচালনা পরিষদের সভায় শুধু পরিচালকরাই উপস্থিত থাকতেন না, সভাসংশ্লিষ্ট বিসিবির অনেক স্টাফকেও যেতে হতো বেক্সিমকোতে। এটা ছিল অনেকের কাছেই বিব্রতকর।
নাজমুল হাসান পাপন শুধু তার অফিসকেই বিসিবির কার্যালয় বানাননি, গুলশানের বাসাকেও বিসিবির কার্যালয় বানিয়েছিলেন। বেক্সিমকোর মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেননি কিংবা বিসিবির কোনো সভা গুলশানের বাসায় হয়নি। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য তিনি তার বাসায় সবাইকে ডাকতেন। ২০১৫ সালে নিরাপত্তার কারণে অস্ট্রেলিয়া দলের বাংলাদেশে না আসার ব্যাপার নাজমুল হাসান পাপন সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন তার গুলশানের বাসায়। আবার জুয়াড়ি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাকিবের চুক্তির বিষয় নিয়ে যখন তুমুল সমালোচনা চলছে চারদিক, সে সময় পরবর্তী করণীয় জানাতে নেওয়া সিদ্ধান্তও নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছিলেন তার গুলশানের বাসায়। সেখানে তিনি সাকিবকে শাস্তির পরিবর্তে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক বানিয়েছিলেন। ক্রিকেটের ব্যাপাক চাহিদার কথা বিবেচনা করে সাংবাদিকরা তার দুই জায়গাতেই গিয়ে ভিড় জমাতেন। কিন্তু সেখানে সাংবাদিকদের জন্য ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা রাখা হতো না। বেক্সিমকো অফিসে কথা বলতেন রিসিপশনে। আর গুলশানের বাসায় কথা বলতেন নিচতলায় গ্যাড়ি রাখার গ্যারেজে।
এ ব্যাপারে বিসিবির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘দেখুন একজন সভাপতি তার অফিসে সভা করতেই পারেন। সেটা মাঝেমধ্যে হতে পারে। কিন্তু তারটা লাগামছাড়া হয়ে গিয়েছিল। বিসিবি অফিস থেকে তার অফিসে সভা করতে হলে এখানে আরও অনেক কিছুই জড়িত থাকে। অতিরিক্ত, অতিরঞ্জিত কোনো কিছুই ভালো না। অনেক পরিচালকও সেখানে যেতে আগ্রহী হতেন না। তার যেতেন নিজেদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। আমরা লবি (আলী আজগর লবি, সাবেক সভাপতি) ভাইকে পেয়েছিলাম। যতটুকু মনে পড়ে তিনি একবার মাত্র তার অফিসে সভা করেছিলেন।’
আ হ ম মুস্তফা কামালের বোর্ডে পরিচালক ছিলেন মঈনউদ্দিন চৌধুরী কামরু। তিনি বলেন, ‘আমাদের সময় সভাপতি ছিলেন কামাল ভাই। তিনি কখনো কোনো সভা তার অফিসে করেননি। এটা অগণতান্ত্রিক, অকল্পনীয়। বেক্সিমকোর একটা উইং হয়ে গিয়েছিল বিসিবি। একটা অটোনোমাস বডিকে এভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের উইং বানিয়ে ফেলা মোটেই ঠিক হয়নি।’