যার শুরু আছে, তার শেষও আছে। ১৯ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের খেলা দিয়ে যে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই ভারতের ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে আজ দুবাইয়ে পর্দা নামবে। এর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির নবম আসরের। তবে যে দলই চ্যাম্পিয়ন হোক, তা নতুন হবে না। ভারত জিতলে তৃতীয় (একবার যৌথভাবে), নিউজিল্যান্ড জিতলে হবে দ্বিতীয় শিরোপা।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ইতিহাসে এবারের মতো এত অনিশ্চয়তা আর বিতর্ক অতীতে কোনো আসরে হয়নি। শুরুটা হয়েছিল স্বাগতিক পাকিস্তানে গিয়ে ভারতের খেলতে অসম্মতি জানানোর মধ্য দিয়ে। অনেক বাগ্বিতণ্ডার পর শর্ত সাপেক্ষে পাকিস্তান ভারতের না আসা মেনে নেয়। শর্ত দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে ভারতের কোনো আইসিসি ইভেন্টে তারাও যাবে না। তারা খেলবে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। যে কারণে পাকিস্তান স্বাগতিক হওয়ার পরও আসর পরিচিতি পেয়েছিল হাইব্রিড মডেলে।
এই হাইব্রিড মডেলে খেলতে গিয় আইসিসি আবার ভারতকে দিয়েছে অবারিত সুবিধা। ভারতের সবগুলো খেলা একই ভেন্যুতে হওয়ার কারণে তারা উইকেটের বাড়তি সুবিধা পেয়েছে, যা অন্য দলগুলো পায়নি। শুধু তা-ই নয়, অন্য দলগুলো যেখানে এক ভেন্যুতে থেকে আরেক ভেন্যুতে যাতায়াত করেছে, সেখানে ভারত আরামদায়কভাবে এক স্থানে থেকে খেলেছে। ছিল না ভ্রমণজনিত ক্লান্তি। একই ভেন্যুতে খেলা হওয়ার কারণে ভারত তাদের দলও গঠন করে সে দৃষ্টিকোণ থেকে। দলে স্পিনারদের প্রাধান্য ছিল চোখে পড়ার মতো। সেমিফাইনালসহ শেষ দুটি ম্যাচ তারা খেলেছে চার স্পিনার নিয়ে। বাকি দলগুলো এই সুবিধা নিতে পারেনি। তারা সেরা একাদশে সর্বোচ্চ দুজন স্পিনার খেলিয়েছে।
ভারতকে এ রকম সুবিধা দেওয়ার কারণে সাবেক অনেক তারকা ক্রিকেটার কঠোর সমালোচনায় মেতে ওঠেন। কিন্তু ভারতীয় সাবেকরা এটিকে বাড়তি সুবিধা হিসেবে মানতে রাজি ছিলেন না। শুধু তা-ই নয়, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের আগ পর্যন্ত সেমিতে ভারতের প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত না হওয়ায় সেমিতে ওঠা অপর গ্রুপের দুই দলকেই ( অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা) দুবাইয়ে উড়িয়ে আনা হয়। পরে এক দলকে (দক্ষিণ আফ্রিকা) আবার পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে ভারতকে সর্বোচ্চ যতটুকু সুবিধা দেওয়া যায় আইসিসি তার সবটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত সব বিতর্ক, শঙ্কা দূর করে সফলভাবেই শেষ হতে চলেছে ২৯ বছর পর পাকিস্তানে আয়োজিত আইসিসির কোনো ইভেন্ট। এই আয়োজনে পাকিস্তানের শুধু আক্ষেপ থাকবে ফাইনালটা তাদের দেশে অনুষ্ঠিত হয়নি।
ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ ভারত ও নিউজিল্যান্ড একই গ্রুপ (‘এ’ গ্রুপ) থেকে উঠে এসেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই দলের এটি দ্বিতীয় মোলাকাত। গ্রুপ পর্বে দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল নিয়ম রক্ষার ম্যাচে। দুই দলই পরস্পরের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে নিজ নিজ ম্যাচে দুই প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে হারিয়ে বিদায় করে দিয়েছিল। যে কারণে দুই দলের ম্যাচটি ছিল নিয়ম রক্ষার আর গ্রুপসেরা হওয়ার। সেখানে জয়ী হয়েছিল ভারত, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের যা ছিল টানা ষষ্ঠ জয়। আজ দুই দলের ১২০তম বারের মতো মুখোমুখি হবে। ভারতের জয় ৬১টিতে, নিউজিল্যান্ডের জয় ৫০টিতে। একটি ম্যাচ টাই হয়েছে। বাকি সাতটি হয়েছে পরিত্যক্ত। এদিকে ভারতের কাছে টাান ছয় ম্যাচ হারলেও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলার আগে পাকিস্তানে তিন জাতির আসরে নিউজিল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ভারতের কাছে হারলেও তারা আছে দুর্দান্ত ফর্মে।
ভারত শিরোপা জিতলে তা হবে অপরাজিত, কিন্তু নিউজিল্যান্ড জিতলে তা আর হবে না। কারণ গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচে তারা ভারতের কাছে হেরেছিল ৪৪ রানে। আসরের সেরা দুই দলই উঠে এসেছে ফাইনালে। সেমিতে দুই দলের সামনেই প্রতিপক্ষরা পাত্তা পায়নি। ভারত ৪ উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে এবং নিউজিল্যান্ড ৫০ রানে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিধ্বস্ত করেছিল।
দুই দলের ব্যাটিং লাইনই শক্তিশালী। ভারতের ব্যাটিং অর্ডার এমনিতেই বিশ্বসেরা। লম্বা ব্যাটিং লাইন। কোহলি-রোহিত-রাহুল-শ্রেয়াস-গিল-পান্ডিয়া-অক্ষর। ফাইনাল পর্যন্ত আসতে তাদের ব্যাটিং লাইনকে খুব একটা কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়নি। চার ম্যাচের তিনটিই তারা জিতেছে রান তাড়া করে। যেখানে সর্বোচ্চ রান ছিল সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার করা ২৬৪। শুধু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তারা আগে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ২৪৯ রান করেছিল। এই রানের মাঝেই তাদের দলের পক্ষে সেঞ্চুরি হয়েছে দুটি। শুভমান গিল অপরাজিত ১০১ ও বিরাট কোহলি অপরাজিত ১০০ রান করেন। কিন্তু এই সেঞ্চুরির মিছিলে আবার এগিয়ে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা। চার ম্যাচের তিনটিতেই সেঞ্চুরি হয়েছে পাঁচটি। যেখানে দুটি করে সেঞ্চুরি আছে আবার দুই ম্যাচে। শুধু ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে তাদের কোনো ব্যাটার সেঞ্চুরি করতে পারেননি। পাঁচ সেঞ্চুরির দুটি আবার এসেছে রাচিন রবীন্দ্রর ব্যাট থেকে। এবারের আসরে একের অধিক সেঞ্চুরি করা একমাত্র ব্যাটার তিনি। তার দুটি ইনিংস ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে ১১২ ও সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১০৮ রানের। বাংলাদেশের বিপক্ষেই তাদের সেঞ্চুরি ছিল শুধু একটি। আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন টম লাথাম অপরাজিত ১১৮ ও ওপেনার উইল ইয়াং ১০৭ রানের ইনিংস খেলে। সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে রাচিন রবীন্দ্রর ১০৮ রানের ইনিংস ছাড়াও সেঞ্চুরি করেছিলেন কেন উইলিয়ামসন ১০২ রানের ইনিংস খেলে। আসরে ৩০০-ঊর্ধ্ব রানের ইনিংস হয়েছে আটটি। নিউজিল্যান্ডের ইনিংসই আছে দুটি। সেমিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাদের ৬ উইকেটে করা ৩৬২ রান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ইতিহাসেই সর্বোচ্চ। এ ছাড়া পাকিস্তানের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে তারা ৫ উইকেটে করেছিল ৩২০ রান।
বোলিংয়ে ভারত স্পিননির্ভর। গ্রুপ পর্বে নিয়ম রক্ষার শেষ ম্যাচে তারা এক পেসার কমিয়ে বরুণ চক্রবর্তীকে নিয়ে চার স্পিনার খেলেছিল। কিন্তু সুযোগ পেয়েই বাজিমাত করেন বরুণ ৫ উইকেট নিয়ে। সেমিতেও তারা একই একাদশ নিয়ে নামে। এবার বরুণ নেন ২ উইকেট। দুই ম্যাচে ৭ উইকেট নিয়ে তিনি চার ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে দলের হয়ে সবার ওপরে থাকা মোহাম্মদ শামির ঠিক পেছনেই আছেন। চার স্পিনার খেলানো হলে পেসার হর্ষিত রানাকে আজকেও দর্শক হয়ে থাকতে হবে। তখন হার্দিক পান্ডিয়াকেই আগের মতো দ্বিতীয় পেসারের কাজ সারতে হবে। ১০ উইকেট নিয়ে আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি নিউজিল্যান্ডের হ্যানরিকে নিয়ে দল আছে না খেলার দোলাচলে। সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লাসেনের ক্যাচ ধরতে গিয়ে তিনি কাঁধে চোট পেয়েছিলেন। যদিও পরে তিনি মাঠে ফিরে ২ ওভার বোলিংও করেছিলেন। কিন্তু তার খেলার বিষয়টি অধিনায়ক স্যান্টনার। তবে তার খেলার আশা তিনি ছেড়ে দেননি। হ্যানরি না খেললে তার পরিবর্তে জ্যাকব ড্যাফিকে খেলানো হবে। পেস আক্রমণে হ্যানরির সঙ্গে থাকা ও’রর্ক উইকেট নিয়েছেন ৬টি। জেমিসন নামের প্রতি সুবিচার করতে না পারলেও তাকে আজ দেখা যাবে সেরা একাদশে। নিউজিল্যান্ডের স্পিন আক্রমণ অবশ্য ভারতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো নয়। তকে অধিনায়ক স্যান্টনার (৭ উইকেট) ও ব্রেসওয়েলকে (৬ উইকেট) সামাল দিতে হবে ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনকে।
এবারের আসরে ৩০০-ঊর্ধ্ব ইনিংস যে আটটি হয়েছে তার সব কটি হয়েছে পাকিস্তানের বিভিন্ন ভেন্যুতে। তাই দুবাইয়ে আজকের ম্যাচে দুই দলের অধিনায়কই মনে করছেন ৩০০-ঊর্ধ্ব রানের ইনিংস হওয়ার সম্ভাবনা কমই?