উড়ছে কনফেত্তি, উড়ছে আনন্দের রেনু। এরই মাঝে সাদা ব্লেজারে রোহিত-কোহলিদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস বর্ণিল রঙে যেন রাঙিয়ে দিল দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পরিবেশ। শ্যাম্পেইনের ছিপি খুলতেই আরও যেন উত্তাল হলো নীল সমুদ্র। ট্রফি নিয়ে রোহিতরা যখন উল্লাসে ব্যস্ত, একটু দূরেই একজন নেচেই চলেছেন আপন মনে। পা দুলিয়ে শরীর কাঁপাচ্ছেন কৈশোরের পা দেওয়া ছোট্ট কিশোরের মতো। অথচ তার বয়স ৭৫। মানুষটি ভুলেই গেছেন ভারতীয় ক্রিকেটে তার ওজন কতটা। ভারত চ্যাম্পিয়ন, এই আনন্দে কিছুক্ষণের জন্য যেন শিশু বনে গেলেন সুনীল গাভাস্কার। টিভি চ্যানেল স্টার স্পোর্টস ভারতীয় এই কিংবদন্তির নাচের সেই ভিডিও এক্সে পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছে, ‘দিল তো বাচ্চা হ্যায় জি।’
শুধু গাভাস্কার নন, আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতার পর ভারতীয় দল থেকে শুরু করে দুবাই যেন হয়ে উঠেছিল এক খণ্ড ভারত। আর কোহলিদের নিজ দেশের আনাচে-কানাচে রীতিমতো হোলির আবহ। অথচ এটি কোনো বিশ্বকাপ নয়, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। কিন্তু প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড বলেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দ দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছিল ভারতের। কারণ আইসিসির টুর্নামেন্টের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর রেকর্ড আগে ছিল না রোহিতদের। দুইবারের মোকাবিলায় দুটিতেই হার (২০০০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, ২০২১ সালে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল)।
শুধু কী তাই, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত এখন সর্বোচ্চ তিনবারের (একবার শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথভাবে) চ্যাম্পিয়ন। পেছনে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়াকে (দুবার)। যদিও ওয়ানডে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে মোট ১০ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ব্যবধান কমিয়ে আনল ভারতও, সপ্তমবার। রোহিতদের উৎসবের উপলক্ষটা ছিল তাই নানা দিক থেকে।
প্রশংসার উল্টো পাশে থাকে সমালোচনা। অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন ভারতকে শুনতে হচ্ছে এখন সেটাও। দুবাইকে হোম গ্রাউন্ড বানিয়ে খেলা ভারত চ্যাম্পিয়ন হবে না তো অন্য কেউ হবে! এমন আলোচনা এখন তুঙ্গে। আদতে তা সত্যিই বটে। আয়োজক পাকিস্তান। তবে ফাইনাল হলো দুবাইয়ে। অন্য দলগুলো যেখানে এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে ছুটতে গিয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে হাজার হাজার মাইল। সেখানে ভারত স্থির, নির্ভার। একই ভেন্যুতে খেলেছে সব ম্যাচ। বাড়তি সুবিধাই বটে। উৎসবের মাঝে শেষের বিতর্কও জন্ম দিয়েছে। ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না পাকিস্তান ক্রিকেটের কোনো কর্তাব্যক্তি। ভারত দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন আইসিসি সভাপতি জয় শাহ ও বিসিসিআই প্রধান রজার বিন্নি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে, নিজ গৃহে অন্নপ্রাসন।
তাই বলে ভারত খারাপ দল, তা বলার অবকাশ নেই। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে প্রত্যেক ম্যাচেই দাপট দেখিয়েছেন রোহিত-কোহলিরা। যেখানে পাত্তা পায়নি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান,বাংলাদেশের মতো দলগুলো। ভারতের এমন সাফল্য শুধু ‘হোম গ্রাউন্ড দুবাই’ বলেই, তা বলাটা অত্যুক্তি। আসলে সাম্প্রতিক বছর তথা গত দেড় দশকের ক্রিকেট বিবেচনা করলে ভারত দুর্দমনীয় দল, তা বলাই বাহুল্য।
মাহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ দিয়েই মূলত ভারতের নতুন ক্রিকেট যুগে প্রবেশ। এরপর আইসিসির প্রতিটি ইভেন্টেই জোর দাপট দেখিয়েছে তারা। শিরোপা হাতেগোনা থাকলেও রোহিত-কোহলিদের আধিপত্য ছিল দেখার মতো। ২০১৫ ও ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট দল ভারত। সর্বশেষ আসরে ঘরের মাঠে রানার্স আপ (২০২৩)। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারত। এরপর তিন আসরে খারাপ করলেও ২০১৪-এ রানার্স আপ। পরের তিন আসরের দুটিতে খেলেছে সেমিফাইনাল, একটিতে সুপার টুয়েলভ। আর সর্বশেষ আসর গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজে, যেখানে চ্যাম্পিয়ন ভারত।
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও একই চিত্র। ২০০২ সালে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তিন আসরে গ্রুপ পর্বই পার হতে পারেনি ভারত। কিন্তু ২০১৩ সালেই দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন। ২০১৭ সালে অল্পের জন্য শিরোপা থেকেছে অস্পর্শ। পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন, ভারত রানার্স আপ। এবার সেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আবার রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন ভারত। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গত তিন আসরে ভারত চ্যাম্পিয়ন দুবার, রানার্স আপ একবার। বাদ যাবে কেন টেস্ট ফরম্যাট। গত ছয় বছরে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে দুবার ফাইনাল খেলেও ভারতের জেতা হয়নি ঐতিহাসিক সেই ‘গদা’। দুবার ভারতের প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। কী কাকতালীয়, এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিতে অস্ট্রেলিয়া ও ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সাফল্যের হাসি রোহিত-বরুণদের।
আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ বিবেচনায় নিলে দুই বছরের মধ্যে টানা চারটি আইসিসি ইভেন্টের ফাইনাল খেলল ভারত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দলকে আইসিসির বড় চারটি ইভেন্টের ফাইনালে তোলার কীর্তি রোহিত শর্মার। গুঞ্জন ছিল ফাইনালের পর ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিতে পারেন রোহিত শর্মা। সেই আশায় গুড়েবালি।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে রোহিতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চেয়েছিলেন। রোহিতের জবাবটা ছিল এমন, ‘কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই। যেভাবে চলছে চলবে।’ উত্তরটা সবার মনঃপূত হচ্ছে না ভেবেই চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগে মুচকি হেসে আবার বললেন, ‘একটা বিষয় আমি পরিষ্কার করতে চাই, আমি কোথাও যাচ্ছি না। এই সংস্করণ থেকে আমি অবসর নিচ্ছি না।’
আগামী ওয়ানডে বিশ্বকাপ ২০২৭ সালে। সহ-আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়া। কে জানে! বৈশ্বিক এই চৌদ্দতম আসরে সোনালি ট্রফির দিকেই হয়তো পাখির চোখ করে আছেন রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলি, তথা ফর্মের তুঙ্গে ফুটতে থাকা টিম ইন্ডিয়া।