মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পরই বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিরাপত্তা ইস্যুতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এ নিয়ে আইসিসির সঙ্গে চলছে ই-মেইল যোগাযোগ। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের এক বক্তব্য ঘিরে বিসিবির এক পরিচালকের বিতর্কিত মন্তব্য দেশের ক্রিকেটে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। বোর্ড পরিচালকদের আচরণবিধি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। সংশ্লিষ্ট পরিচালকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে কোয়াব। ইতোমধ্যে বিসিবি থেকে বলা হয়েছে, সেই পরিচালকের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ না করা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে নিজের মতামত তুলে ধরেন তামিম ইকবাল। সেই বক্তব্যের একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে বিসিবির অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম লেখেন, ‘এইবার আরো একজন পরিক্ষিত (পরীক্ষিত) ভারতীয় দালাল এর আত্মপ্রকাশ। বাংলার জনগণ দু চোখ ভরে দেখলো।’ এই মন্তব্য ছড়িয়ে পড়তেই ক্রিকেট অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিসিবির চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বর্তমান ও সাবেক অনেক ক্রিকেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানান।
শুক্রবার কোয়াবের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালকে নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের একটি মন্তব্য আমাদের নজরে এসেছে। আমরা এতে স্তব্ধ, বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সফলতম ওপেনার, দেশের হয়ে ১৬ বছর খেলা ক্রিকেটারকে নিয়ে একজন বোর্ড কর্মকর্তার এমন মন্তব্য চরম নিন্দনীয়।’
কোয়াব জানায়, বিসিবি সভাপতির কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। ‘একজন দায়িত্বশীল বোর্ড পরিচালক পাবলিক প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের মন্তব্য করলে বোর্ড কর্মকর্তাদের আচরণবিধি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। আমরা সংশ্লিষ্ট পরিচালকের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং তাকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছি।’
মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ দলের ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গত শনিবার থেকেই দুই দেশের ক্রিকেট অঙ্গন উত্তাল। এই সংকট নিয়ে মিরপুরের সিটি ক্লাব মাঠে জিয়া আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ট্রফি ও জার্সি উন্মোচন অনুষ্ঠানে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তামিম।
তিনি বলেন, ‘মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়া অবশ্যই দুঃখজনক। কোনো সন্দেহ নেই।’ বোর্ডে থাকলে কী সিদ্ধান্ত নিতেন–এমন প্রশ্নে তামিম বলেন, ‘আমি যদি বোর্ডে থাকতাম, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ ও সবকিছু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতাম। হুট করে মন্তব্য করা জটিল। অনেক সময় আলোচনার মাধ্যমেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়। আজকের সিদ্ধান্ত আগামী ১০ বছর পর কী প্রভাব ফেলবে, সেটাও ভাবতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিসিবিকে আমরা একটি ইনডিপেনডেন্ট বডি মনে করি। সরকার বড় অংশীদার হলেও বোর্ডের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা থাকা উচিত। আমাদের ৯০-৯৫ শতাংশ অর্থ আইসিসি থেকে আসে। সবকিছু বিবেচনা করে যে সিদ্ধান্ত দেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের জন্য ভালো, সেটাই নেওয়া উচিত।’ এই বক্তব্যগুলোর ফটোকার্ড শেয়ার করেই নাজমুল ইসলাম বিতর্কিত মন্তব্য করেন।
গত ৬ অক্টোবর বিসিবি নির্বাচনে ক্লাব ক্যাটাগরি থেকে ৩৭ ভোট পেয়ে পরিচালক নির্বাচিত হন নাজমুল ইসলাম। পরদিনই তাকে অর্থ কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তামিমকে নিয়ে মন্তব্যের পর তাকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি পোস্ট দেন তিনি। সেখানে লেখেন, ‘মোস্তাফিজ ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন ভারতে নিরাপত্তা-ঝুঁকিতে, তখন মাননীয় ক্রীড়া উপদেষ্টা আইসিসির সঙ্গে আলোচনা করতে বলেছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের সেন্টিমেন্টের বাইরে গিয়ে ভারতীয়দের হয়ে ব্যাট করেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের জার্সিতে ১৫ হাজার রান করা এক লিজেন্ডারি ক্রিকেটার।’
সব মিলিয়ে মোস্তাফিজ ইস্যু থেকে শুরু হয়ে বিশ্বকাপ, বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং তামিম-বিসিবি বিতর্ক–এই তিন ধারার সংঘাতে দেশের ক্রিকেট আজ গভীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখে। মাঠের বাইরের এই দ্বন্দ্ব যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই প্রশ্নের মুখে পড়বে বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও ক্রিকেট সংস্কৃতি। এখন দেখার বিষয়, সংকট নিরসনে বিসিবি কতটা দ্রুত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে পারে।