নিরাপত্তার কারণে ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার আবেদন আইসিসি গ্রহণ করেনি। ভারতে বাংলাদেশ দলের জন্য নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দেখছে না আইসিসি। তাই তারাও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ভারতেই খেলতে হবে বিশ্বকাপ। না হলে সেখানে অন্য দলকে তারা সুযোগ করে দিবে খেলার জন্য। পরে আইসিসি বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে নিয়েছে। এ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশরাফুল হক মনে করেন রাজনীতি জিতেছে ক্রিকেট হেরে গেছে। সৃষ্ট পরিস্থিতি’ বাংলাদেশ বোর্ড আরও ভালোভাবে সামলাতে পারত। ক্রিকবাজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অভিজ্ঞ সংগঠক আশরাফুল হকের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো খবরের কাগজের পাঠকদের জন্য-
বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ঘিরে বর্তমান সংকট নিয়ে আপনার মত কী?
খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে বর্তমান বোর্ড এমন একটি সরকারের সিদ্ধান্তের কাছে পুরোপুরি নতিস্বীকার করেছে, যে সরকার কয়েক সপ্তাহ পর আর থাকবে না। কিন্তু এর ফলে যে ক্ষতি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশকে ক্রিকেট বিশ্বে সম্ভাব্য ঝামেলাবাজ হিসেবে দেখা হবে। কোনো আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ক্রিকেট বোর্ড আইসিসির নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরত এবং তাদের সিদ্ধান্ত নিতে দিত, তারা নিরাপত্তাহীন বোধ করলে যেন না যায়। সিদ্ধান্তটা আসা উচিত ছিল খেলোয়াড়দের কাছ থেকে, সরকার বা বোর্ডের কাছ থেকে নয়। তারা খেলোয়াড়দের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ ছিনিয়ে নিয়েছে। শুধু একটি প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডার স্বার্থে।
আমি এটা একদমই পছন্দ করি না। প্রথমত, অন্য দেশগুলো কী করে তা ভাবুন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বোর্ডই নেয়, সরকার নয়। ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশে সরকার অনুমতি দেয় বিদেশ সফরের জন্য, আমি সেটা মানি। কিন্তু বেশির ভাগ দেশে নিরাপত্তা ইস্যু থাকলে তারা খেলোয়াড়দের ডেকে বলে, ‘এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আমাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিছু জায়গায় ঘাটতি থাকতে পারে বলে আমরা মনে করি, তবে সিদ্ধান্তটা তোমাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। যারা যেতে চাও, যাও; যারা চাও না, যেও না। কোনো শাস্তি হবে না।’ সাধারণত বোর্ড এটাই বলে।
ক্রিকেটারদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয় তারা যাবে কি যাবে না। কিন্তু এখানে সরকারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে; খেলোয়াড়দের শুধু ডেকে বলা হয়েছে তারা যেতে পারবে না। একজন খেলোয়াড়ের কথা ভাবুন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো বিশ্বকাপে খেলা, বিশ্বকাপের গৌরব পাওয়া। সেটা এখন পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ভবিষ্যতে এখন প্রতিটি দেশ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা হলেও শঙ্কিত থাকবে। তারা ভাববে বাংলাদেশ কোনো ঝামেলাবাজ দেশ।
আপনি কি মনে করেন এই হঠাৎ সরে দাঁড়ানো আইসিসির কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা ডেকে আনতে পারে?
হতে পারে, কারণ আমরা তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছি। আমি নিশ্চিত সেখানে একটি ধারা আছে যে নিরাপত্তা বিষয়গুলো আইসিসি তদারকি করবে। আমি নিশ্চিত এটি আছে এবং আমি যখন এসিসিতে ছিলাম তখনও আমরা এভাবেই করতাম। এ ঘটনায় রাজনীতি জিতেছে ক্রিকেটে হেরে গেছে।
দর্শকসংখ্যার বিষয়টি আছে। আধুনিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ থেকে দর্শক কমে গেলে আইসিসি কি বিসিবিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলতে পারে?
এটা হতে পারে, হ্যাঁ। কারণ যখন বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার স্বত্বের টেন্ডার ডাকা হয়, সেখানে উল্লেখ থাকে যে সম্প্রচার হবে- স্থলভিত্তিক সম্প্রচার অধিকার থাকবে। আমরা স্যাটেলাইট অধিকার বন্ধ করতে পারি না, কিন্তু স্থলভিত্তিক অধিকার থাকবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং অন্যান্য জায়গায়। এর ভিত্তিতেই দরপত্র দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশের দর্শকসংখ্যা সম্ভবত বিশ্বে তৃতীয় বা চতুর্থ বৃহত্তম। সুতরাং বাংলাদেশের দর্শকসংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি কি মনে করেন আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের একগুঁয়ে অবস্থান শুরুতেই তাদের দুর্বল করে দিয়েছে?
আমরা আগেই একটি অবস্থান নিয়েছিলাম এবং তখন আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। আমাদের অবস্থান ছিল- আমরা শ্রীলঙ্কায় খেলতে পারলে তবেই বিশ্বকাপ খেলব, অন্যথায় খেলব না। আমি বলতে চাইছি, আমাদের প্রথমেই এমন অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল না, এটা ঠিক নয়। হ্যাঁ বোর্ড আমাদের পক্ষে অবস্থান নেয়নি, ঠিক আছে। আগে কথা বলুন। সবকিছু আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়। তাহলে সেটা সবার জন্যই সুষ্ঠু সমাধানের মতো পরিস্থিতি হতো। কিন্তু আমরা ভারতের চরম ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ফাঁদে পা দিয়েছি। আমরা ভারতের চরম ডানপন্থি দলগুলোর পাতানো ফাঁদে হাঁটতে গিয়েছি। এটা তাদের জয়, আমাদের সরকারের নয়।
আপনি কি মনে করেন বিসিবি সরকারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে?
আমি তাই মনে করি। আর তারা এই সরকারের সঙ্গে কথা বলতে এত লজ্জা পাবে কেন? এই সরকার তো আর কয়েক সপ্তাহের বেশি নেই। আমরা চাপ সৃষ্টি করতে পারতাম এবং বলতে পারতাম, এই পথে গেলে আমরা দল পাঠাতে চাই বা পাঠাতে চাই না। কিন্তু আমাদের সরকারের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতা থাকা উচিত ছিল, বিশেষ করে যখন এই সরকারটি অস্থায়ী।
বাংলাদেশ কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
আমি সত্যিই জানি না। বাংলাদেশকে ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে দুর্দান্ত একটি পিআর (জনসংযোগ) কাজ করতে হবে। আপনি সম্ভবত বুঝতে পারছেন আমি কী বলতে চাই, কারণ আমাদের বুঝতে হবে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। সেই বৈঠকে (আইসিসির বোর্ড মিটিংয়ে) আমরা অন্য সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে মাত্র একটি ভোট পেয়েছি। শুরুতেই আমাদের কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল না।
শোনা যাচ্ছে, বিসিবি ক্রীড়া আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছে। আপনি কি মনে করেন এটা কোনো পথ হতে পারে?
আমরা যদি আদালতে, আমাদের কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কোনো সুযোগ নেই। কারণ তারা বলবে, আগের সব বিশ্বকাপই স্বাগতিক দেশের পক্ষ থেকে আইসিসিকে দেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার আশ্বাসের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আইসিসি সেটির একটি স্বাধীন মূল্যায়ন করে, তারপর দেশগুলোকে সুপারিশ করে। তাই আইসিসির সুপারিশ স্পষ্ট- এই মুহূর্তে ভারতে কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই। আমাদের একমাত্র যুক্তি হলো- মোস্তাফিজকে নিরাপত্তার কারণে খেলতে দেওয়া হয়নি, তাহলে তারা কীভাবে পুরো দলকে নিরাপত্তা দেবে? এটিই তাদের একমাত্র যুক্তি।
তাদের যুক্তি হবে, এটি (আইপিএল) একটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট। একটি ঘরোয়া টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা প্রোটোকল ও বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্ট এবং ভারতে সফরকারী দলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। এখানে এ, বি, সি স্তরের নিরাপত্তা থাকে। মূলত তারা এটি (কেকেআর স্কোয়াডে মোস্তাফিজকে রাখার) না করার কারণ হলো পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নির্বাচন। তারা নির্বাচন চলাকালে কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।
আপনি কি মনে করেন রাজনৈতিক সরকার এলে তারা পরিস্থিতি সামলাতে পারবে?
আমি আশা করি- পারবে। তাদের পারতেই হবে। না হলে এটা হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের মৃত্যু।
অনিক/