‘পাকিস্তান-ভারত ম্যাচের জন্য আমাদের ইন্টারেস্টেড হওয়া আমাকে অবাক করেছে। যেখানে আমরা বিশ্বকাপ খেলতে পারছি না, সেখানে পাকিস্তানকে কেন আমরা অনুরোধ করব খেলার জন্য। এখানে আমাদের ইন্টারেস্ট কী? যেখানে আমরা বিশ্বকাপ খেলতে পারছি না, সেখানে পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছি। পাকিস্তানের অবস্থানের কারণে ভারত যে চাপে পড়েছিল, আমরাই সেটা রিলিফ করে দিলাম। এখানে পাকিস্তানকে রিলিফ করে দেওয়া হয়েছে। ভারতকে রিলিফ করে দেওয়া হয়েছে। খেলা না হলে আর্থিকভাবে যে বিশাল ক্ষতি হতো, তাতে ক্রিকেটে বিশ্বের সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতো। সবাই জানত বাংলাদেশের অবস্থানের কারণে এ রকম হয়েছে। কেন এ রকম করেছে তাও সবাই জানেন। ভবিষ্যতের জন্য একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকত’–সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর, কাউন্সিলর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
‘বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র পাকিস্তান সাপোর্ট দিয়েছে। আবার পাকিস্তানের না খেলার সিদ্ধান্তে আমার মনে হয় বিসিবির সভাপতির ওপর ব্যাপক চাপ আছে। সে জন্য তিনি দৌড়ে পাকিস্তান চলে গেছেন। এক কথায় বলব এটা হলো স্ববিরোধী। এই দৌড়াদৌড়ি যদি আগে করা হতো তাহলে দেশের ক্রিকেটের জন্য ভালো হতো, বিশ্বকাপ খেলা হতো। এমন স্ববিরোধী কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের ক্রিকেট কোথায় নেমে এল? এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে’–রফিকুল ইসলাম বাবু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বিসিবি।
‘পুরো বিষয়টা এতদূর যেত না, যদি ক্রিকেট বোর্ড এককভাবে সিদ্ধান্ত নিত। তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সরকার যেহেতু এটি চাপিয়ে দিয়েছে সরকারি হস্তক্ষেপই ধরে নেওয়া যেতে পারে। সরকারি হস্তক্ষেপই হয়েছে। কিন্তু ক্রিকেট বোর্ড এখানে ব্যর্থ হয়েছে সরকারকে তারা সঠিকভাবে বিষয়টা বোঝাতে পারেনি। চেষ্টা করেছে কিনা তাও জানি না’–আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি, সাবেক পরিচালক, বিসিবি।
তিনজনের এই বক্তব্য টি-টেয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানকে ম্যাচ খেলার জন্য বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অনুরোধ করা নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে পাকিস্তান যেখানে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে বাংলাদেশেরও পাকিস্তানের পক্ষে শক্তভাবে অবস্থান নেওয়ার কথা। সেখানে তিনি পাকিস্তানকেই অনুরোধ করেন ম্যাচ খেলার জন্য। দেশে ফিরে এসে আমিনুল ইসলাম বুলবুল খুবই গর্বিতভাবে এ নিয়ে মিডিয়ায় কথা বলেন। তার এমন অবস্থানকেই ক্রিকেট মহল স্ববিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। কারণ তিনি দেশের ক্রিকেটের জন্য এ রকম কৌশলী অবস্থান নিতে পারেননি। সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর বলেন, ‘এই কূটনীতিটা আমরা আগে করলাম না কেন? এটা কূটনৈতিক ব্যর্থতা। আমরা কেন পাকিস্তানের সঙ্গে আগে বসলাম না। কেন অন্য দেশগুলোকে আমরা কনভিন্স করলাম না। পাকিস্তান পরে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটি যদি আগে করত, বাংলাদেশকে যদি নিরপক্ষে ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলতে দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে না। পাকিস্তানের অবস্থানের কারণে আইসিসি এখন যে রকম প্রেসারে পড়েছে, তখন তারা এ রকম প্রেসারে পড়ত। এই প্রেসারটা আমাদের আগেই দেওয়া উচিত ছিল। আইসিসি তখন বাধ্য হয়ে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের খেলার সিদ্ধান্ত নিত। এটা আগে করতে পারলে আমাদের বিশ্বকাপটা মিস হতো না।’ রফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপালসহ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বসতে পারত। বসে জানতে চাইতে পারত আমাদের এখন করণীয় কী। এটা সুন্দর হতো না? নিজেরা ওয়ার্ল্ডকাপ বর্জন করে এখন অন্য দেশের জন্য ওকালতি করছেন। এখন উকিল হয়ে গেছেন। দেশের মানুষকে এখন কী জবাব দেবেন? দেশের মানুষ বিশ্বকাপ দেখার জন্য উন্মুখ হয়েছিল। খেলোয়াড়রা ২ বছর অপেক্ষায় ছিল খেলার জন্য।’
আমিনুল ইসলাম বুলবুল পাকিস্তান গিয়েছেন হঠাৎ করে। তার পাকিস্তান যাওয়ার বিষয়টা জানতেন না বিসিবির পরিচালকরাও। তিনি যাওয়ার পর এবং দেশে ফিরে এসে যেভাবে সফলতার কথা বলছেন এটাকে আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি সাজানো নাটক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিন থেকে শুরু করে লাহোরে গিয়ে শেষ হয়েছে। পুরোটাই হয়েছে তৃতীয় একটা দেশের এজেন্ডা ফুলফিল করার জন্য। আমরা সেই নাটকটা করে গিয়েছি তাদের পক্ষে।’
আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববির কথার মিল পাওয়া যায় আনন্দবাজার পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের এ রকম পাকিস্তান সফর নিয়ে সংবাদ সংস্থ পিটিআইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা উল্লেখ করেছে, ‘পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন নকভি নিজেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) বলেছিলেন, তারা যেন একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে যেন লেখা থাকে যে, বিসিবি-ই পাক বোর্ডকে অনুরোধ করছে ভারত-ম্যাচ খেলার জন্য।’
বিসিবির সভাপতির এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশও লাভবান হয়েছে। আইসিসি কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক জরিমানা করবে না, প্রয়োজনে তারা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির কাছেও যেতে পারবে, ২০৩১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে আইসিসির একটি ইভেন্ট আয়োজনের স্বত্ব পাবে বিসিবি। কিন্তু সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর বলেন, ‘এখানে পাকিস্তানও লাভবান হয়েছে।’
পিটিআইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনেও পাকিস্তানের লাভবান হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে, ‘ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে রাজি হওয়ায় কিছু সুবিধা পাবে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরেই প্রকাশ্যে তা জানাবে আইসিসি।’
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার জন্য নানা দিক থেকে পিসিবির ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল। শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রিকেট বোর্ড চিঠি দিয়ে পাকিস্তানকে ম্যাচ খেলতে বলেছিল। সব কিছুর সমাপ্তি হয় বিসিবির সভাপতিকে পাকিস্তান ডেকে নিয়ে গিয়ে! এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। আমরা পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানাই। আমাদের আর্থিক ক্ষতিগুলো সমন্বয় হবে এটার জন্য অবশ্যই তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা থ্যাঙ্কস লেটার দিতে পারতাম। ভারত আমাদের সঙ্গে এত বড় গাদ্দারি করল, বেইমানি করল। মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দিল। আমরা কেন গায়ে পড়ে খেলার কথা বলব। আমরা কেন ভারতের পারপাস সার্ভ করলাম। আমরা ভারতকে একটা উপহার দিলাম। আমার প্রশ্ন তাহলে ভারতের দালাল কে?’