‘ব্লকবাস্টার’ শব্দটি সাধারণত সিনেমা জগতে ব্যবহার হয়ে থাকে। বিশাল বাজেটের ছবি। তুমুল হিট। ব্যবসায় সফল। বক্স অফিসে রেকর্ড পরিমাণ আয়। এই ব্লকবাস্টার বলা যায় বিসিবির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের খেলোয়াড়ি জীবনকে। যেখানে তিনি ব্লকবাস্টার মুভির মতোই সফল ছিলেন। কিন্তু বিসিবির সভাপতি হওয়ার পর তিনি আর বক্স অফিস হিট করতে পারেননি। যাকে বলে সুপার ফ্লপ। ব্লকবাস্টার শব্দটিকে সামান্য পরিবর্তন করে ‘বল্কমাস্টার’ করে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নামের আগে ব্যবহার করা যায়। মতের অমিল হলেই তিনি তার কল লিস্টে থাকা সেই ব্যক্তি ‘ব্লক’ করে দেন অথবা আনফ্রেন্ড করে দেন। তার এই ব্লকের শিকার অবশ্য অধিকাংশই সাংবাদিক।
ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের যোজন যোজন পাথর্ক্য। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার অমায়িক ব্যবহার। মিষ্টি হাসি। সাংবাদিকদের সঙ্গে তার ছিল খুবই হৃদ্যতাপূর্ণ। অভিষেক টেস্টে ভারতের বিপক্ষে তিনি ১৪৫ রানের ইনিংস যেদিন খেলেন, সেদিন পবিত্র শবে বরাত থাকায় দৈনিক পত্রিকা অফিসগুলো ছিল বন্ধ। কিন্তু সাংবাদিকরা বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে বুলেটিন বের করে বুলবুলের কীর্তিময় অর্জনকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার ব্যবস্থা করেন।
বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ দলের অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল ২০০২ সালে খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পর দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া বসত গড়েন। তখনো তার সঙ্গে সাংবাদিকদের সুন্দর সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের অবসান ঘটে বিসিবির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর। খেলোয়াড়ি জীবনে আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে নিয়ে সমালোচনা কম হতো। তারপরও কখনো কখনো তাকে নিয়ে সমালোচনা করা হলে তিনি ব্লক বা আনফ্রেন্ড করে দিতেন। কিন্তু তার এই বিশেষ গুণের কথা তখন সবাই তেমন একটা জানতেন না। যা প্রকাশ্যে আসে বিসিবি সভাপতি হওয়ার পর। ফুটে উঠে তার এই সুন্দর ব্যবহারের মাঝে একটি অসুন্দর মন মানসিকতা!
সভাপতি হওয়ার পর আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে সাংবাদিকরা নিউজ করা শুরু করেন। বুলবুলও একই হারে ‘ব্লক’ করা শুরু করেন। তার এই ব্লক থেকে বাদ যাননি দেশের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া হাউসের সাংবাদিক থেকে শুরু করে অনেক সিনিয়র সাংবাদিকও। একসময় বুলবুলের ব্লক করার সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে, ব্লক না করা সাংবাদিকদের তালিকা ছোট হয়ে আসে। এভাবে গণহারে সাংবাদিকদের ব্লক করার কারণে অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিসিবি সভাপতি হিসেবে তার মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না সাংবাদিকদের।
ফারুক আহমেদের পরিবর্তে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বিসিবির সভাপতি হওয়ার পর মাত্র কয়েক মাসের জন্য দায়িত্ব পাওয়া আমিনুল ইসলাম বুলবুল তার এই ছোট সময়কে টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সঙ্গে তুলনা করেন। কিন্তু পরে তিনি আর তার নিজের অবস্থানে থাকেননি। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই উপরের মহলের নির্দেশে তিনি টেস্ট ম্যাচ খেলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে নির্বাচন করার কথা জানান। দ্বিতীয়বার তিনি নির্বাচন করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ছত্রছায়ায় কাউন্সিলর হওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়া ছিল অবৈধ এবং প্রশ্নবিদ্ধ। দ্বিতীয় দফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পরই সাংবাদিক সম্মেলনে ব্লক করা নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি দেখবেন বলে জানিয়েছিলেন। পরে তিনি কিছু সংখ্যক সাংবাদিকদের ব্লকমুক্ত করে দেন। বাকিরা আগের অবস্থাতেই থেকে যান।
কিন্তু আমিনুল ইসলাম বুলবুল তার স্বভাবের পরিবর্তন করতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে নিউজ হলেই তিনি সেই আগের মতোই ব্লক করা অব্যাহত রাখেন। ফলে দ্বিতীয়বারের মতো অনেককেই তিনি ব্লক করে দেন। এতে করে ব্লক করা সাংবাদিকের সংখ্যা আগের মতোই বাড়তে থাকে। ফলে নিউজ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সাংবাদিকরা আবারও সমস্যায় পড়ে যান। কিন্তু এ নিয়ে বুলবুলের বিন্দুমাত্র অনুশোচনা ছিল না। কিংবা তিনি অনুতপ্ত হননি। বরঞ্চ তিনি যেন এভাবে ব্লক করতে পেরে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পান!
আমিনুল ইসলাম বুলবুল তার সাংবাদিকদের ব্লক করেও যখন তার বিরুদ্ধে নিউজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেননি, তখন তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। কঠোর পথে হাঁটেন। কোনো কারণ ছাড়াই ‘নিরাপত্তা’ বিষয়কে সামনে এনে তিনি তার একক সিদ্ধান্তে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে বিসিবির আমন্ত্রণ ছাড়া সাংবাদিকদের মিরপুর স্টেডিয়ামে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এ নিয়ে ক্রীড়া সংবাদিকদের তিন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও বুলবুলের ব্লক করার বিষয়টি উঠে। এর জবাব দিতে গিয়ে বুলবুল খুবই রাগান্বিত হয়ে উঠেন। সাংবাদিক নেতাদের তিনি জানান কাকে ব্লক করবেন, না করবেন এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে তিনি আর কথা বলেননি। এভাবে চলছে বুলবুলের ব্লক ব্লক খেলা।
ক্রীড়া সাংবাদিক ও নট আউট নোমানের নোমান মোহাম্মদ বলেন, ‘বুলবুল ভাই তার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে ফোন না ধরতেই পারেন। ব্লক করতেই পারেন। এমন কি বিসিবি সভাপতি হিসেবে তিনি কারও প্রশ্নের উত্তর নাও দিতে পারেন। এসবই বইয়ের কথা। কিন্তু বুলবুল ভাইয়ের মতো ব্যক্তির কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না। তিনি সভাপতি হওয়ার পর তার মাঝে একটা শক্রভাবাপন্ন মনোভাব তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকরা যেমন ক্রিকেটের শত্রু না, তেমনি বুলবুল ভাইও ক্রিকেটের শত্রু না। বুলবুল ভাই লেক অব কমিনিউকেশন তৈরি করে ফেলেছেন। এর ফলে কেউ যদি একটা নিউজ করতে যায়, তখন তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারার কারণে ক্লারিফাই করতে পারছেন না।
এতে করে তিনি তার মতো করে নিউজটি করে দিচ্ছেন। আমার কাছে খুবই ট্র্যাজেডি লাগে বিসিবিতে আসার আগে বুলবুল ভাইয়ের ক্যাারিয়ার, আইসিসিতে চাকরি করার সময় তিনি ছিলেন সাংবাদিকবান্ধব। তিনি যে অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন। শবে বরাতের কারণে পত্রিকা বন্ধ ছিল। সাংবাদিকরা উদ্যোগ নিয়ে সাপ্লিমেন্ট বের করে। যা তিনি এখনো যত্ন সহকারে রেখে দিয়েছেন। এটা না করলে কিন্তু কোনো দলিল থাকতে না। এতে বুঝা যায় সাংবাদিকরাও তাকে কতটা পছন্দ করত। কোনো সাংবাদিক কিন্তু তার নম্বর ব্লক করেনি। বিসিবির সভাপতি হওয়ার পর কী এমন হলো যে উনার কাছে সাংবাদিকরা অপ্রিয় হয়ে গেলেন?’
পলাশ/অনিক/