বিশ্বকাপ সাধারণত ফুটবলের উৎসব। কিন্তু কখনও কখনও এটি হয়ে ওঠে কূটনীতি, পরিচয় আর রাষ্ট্রীয় মর্যাদার এক জটিল মঞ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ইরানিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফআইআরআই) প্রধান মেহদি তাজ যে শর্ত সামনে এনেছেন, তা এই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে- খেলাটা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়।
তাজের বক্তব্যে মূল সুর একটাই- ‘নিশ্চয়ত’। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে ফিফাকে নিশ্চিত করতে হবে যে ইসলামিক রিভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) অপমান করা হবে না। এই বাহিনী ইরানের রাষ্ট্র কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের চোখে বিতর্কিত। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইতিমধ্যেই এটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই দ্বৈত বাস্তবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে ইরানের ফুটবল দল: একদিকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের স্বপ্ন, অন্যদিকে জাতীয় মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন।
কানাডা অধ্যায়: এক সতর্ক সংকেত
ঘটনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে ভ্যাঙ্কুভারে ফিফা কংগ্রেসে যাওয়ার পথে। তাজসহ এফএফআইআরআই প্রতিনিধিদল কানাডা সীমান্ত থেকে ফিরে আসে। তাদের অভিযোগ, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অসম্মানজনক আচরণের শিকার হয়।
তাজ বলেন, ফিরে আসার সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের ছিল। তবে পরে কানাডার অভিবাসনমন্ত্রী পার্লামেন্টে নিশ্চিত করেন, আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে তাজের ভিসা বাতিল করা হয়েছিল। এই ঘটনাই যেন ইরানের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সেটা হলো- বিশ্বকাপের পথে বাধা শুধু প্রতিপক্ষ দল নয়, বরং ভিসা, আইন আর রাজনৈতিক অবস্থানও।
কানাডা ২০২৪ সালে আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সত্তা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যা যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ বছর আগেই করেছিল। ফিফার সাধারণ সম্পাদক ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম একটি চিঠিতে কানাডায় ইরানিদের যে ‘অসুবিধা ও হতাশা’ হয়েছে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ২০ মে জুরিখে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠকের জন্য এফএফআইআরআইকে আমন্ত্রণ জানান।
গতকাল রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে তাজ জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আচরণ নিয়ে তিনি ফিফার কাছ থেকে নিশ্চয়তা চাইবেন, ‘আমাদের সফরের জন্য এমন নিশ্চয়তা দরকার, যাতে তারা আমাদের ব্যবস্থার প্রতীক, বিশেষ করে আইআরজিসিকে অপমান করার অধিকার না রাখে। এ বিষয়টি তাদের খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। যদি এমন নিশ্চয়তা থাকে এবং দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নেওয়া হয়, তাহলে কানাডায় যা ঘটেছিল, তেমন ঘটনা আর ঘটবে না।’
যদিও ফিফা পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে কি আস্থা পুরোপুরি ফিরেছে? প্রশ্নটা রয়ে গেছে।
আয়োজক কে- ফিফা না রাষ্ট্র?
তাজের আরেকটি বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ- ‘আমাদের আয়োজক ফিফা, আমেরিকা নয়।’ এই মন্তব্যে স্পষ্ট, ইরান বিশ্বকাপকে একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখতে চায়, যেখানে রাজনীতির প্রভাব সীমিত থাকবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো, যেখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন ও নিরাপত্তা নীতি প্রযোজ্য। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়ে দিয়েছেন, আইআরজিসি-সংযুক্ত কাউকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, ফিফা যতই নিরপেক্ষতার কথা বলুক, চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই রাষ্ট্রের হাতে।
ইসফাহান প্রদেশে আইআরজিসির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর ফুটবল প্রশাসনে আসা তাজ বলেন, শক্ত নিশ্চয়তা না পেলে ইরানি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত থেকেও ফিরে আসতে পারে, ‘আমরা বিশ্বকাপে যাচ্ছি, যেখানে আমরা যোগ্যতা অর্জন করেছি, এবং আমাদের আয়োজক ফিফা। মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্প বা আমেরিকা নয়।’
‘যদি তারা আমাদের আতিথ্য দেয়, তাহলে তাদের আমাদের সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনোভাবেই অপমান করা উচিত নয়। কারণ তা হলে কানাডার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই আমাদের নিশ্চিন্তে যাওয়ার জন্য এই ধরনের নিশ্চয়তা দরকার।’
অনিশ্চয়তার ছায়া
সার্বিক পরিস্থিতিতে ইরানের বিশ্বকাপ যাত্রা অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি এখন তাদের লড়াই করতে হচ্ছে কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও। তবুও প্রস্তুতি থেমে নেই। ঘরোয়া লিগ বন্ধ থাকলেও খেলোয়াড়রা তেহরানে ক্যাম্প করছে, সামনে প্রীতি ম্যাচের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফুটবল কি আলাদা থাকতে পারে?
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা পুরনো- ফুটবল কি রাজনীতি থেকে আলাদা থাকতে পারে?
এই ঘটনাপ্রবাহ বলছে, উত্তরটা সহজ নয়। বিশ্বকাপ যেমন বৈশ্বিক সংযোগের প্রতীক, তেমনি এটি বিভিন্ন মতাদর্শ, ক্ষমতা আর স্বার্থের সংঘর্ষের মঞ্চও। ইরানের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি এক ধরনের পরীক্ষা। আর ফিফার জন্যও, কতটা তারা খেলাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখতে পারে।
এক কথায়- মাঠে বল গড়ানোর আগেই, খেলা শুরু হয়ে গেছে কিন্তু এবার প্রতিপক্ষ শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দল নয়, বরং পুরো এক জটিল বিশ্ব বাস্তবতা।
অনিক/