দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় ক্রিকেটের আবেগ, স্থিরতা আর নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। কিন্তু এবার যেন প্রথমবারের মতো সত্যিই প্রশ্নটা সামনে চলে এসেছে- তাহলে কি শেষ হয়ে গেল এক যুগ?
চেন্নাই সুপার কিংসের (সিএসকে) ২০২৬ আইপিএল অভিযান শেষ হয়েছে নিঃশব্দে। ১৪ ম্যাচে মাত্র ১২ পয়েন্টে বিদায় নিয়েছে টুর্নামেন্ট থেকে। নীরবতার সবচেয়ে বড় কারণ, পুরো মৌসুমে একবারও মাঠে নামেননি ধোনি। ক্যারিয়ারের শেষদিকে যেসব কাফ ও হ্যামস্ট্রিং চোট তাকে ভোগাচ্ছিল, সেগুলোই এবার তাকে পুরো আসর থেকে দূরে রেখেছে।
শুরুতে গুঞ্জন ছিল, হয়তো টুর্নামেন্টের মাঝপথে ফিরবেন। কিন্তু সেই সম্ভাবনাও মিলিয়ে গেছে ধীরে ধীরে। সিএসকে বিদায় নিয়েছে, আইপিএল এগিয়ে গেছে নিজের ছন্দে, আর ধোনি ফিরে গেছেন রাঁচিতে। সবকিছুই যেন অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক।
অবশ্য ধোনির বিদায়ের ধরন সবসময়ই ছিল আলাদা। ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরের মাঝপথে হঠাৎ টেস্ট ক্রিকেট ছাড়েন। আবার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচও হয়ে যায় অনেকটা নিঃশব্দে- ২০১৯ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই রানআউট। আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা আসে আরও পরে, একটি ছোট্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে।
তাই এবারও হয়তো কোনো বিদায়ী ম্যাচ হবে না। এম. এ চিদাম্বরন স্টেডিয়ামে আবেগঘন শেষ ল্যাপ, দর্শকদের অশ্রু কিংবা আলাদা আয়োজন- কিছুই নাও থাকতে পারে। ধোনির গল্পের শেষটা হয়তো ঘোষণায় নয়, অনুপস্থিতিতেই লেখা হবে।
এটা আবার ধোনির ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও মানিয়ে যায়। ক্রিকেট যখন ধীরে ধীরে বিনোদন, ব্র্যান্ড আর অতিরিক্ত প্রচারের খেলায় পরিণত হচ্ছিল, তখনও ধোনি নিজেকে রেখেছিলেন দূরে। তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন, অথচ নিজের আবেগ বা ব্যক্তিগত গল্প খুব কমই সামনে এনেছেন।
তার ক্রিকেটীয় গুরুত্বও কেবল কিছু বিখ্যাত মুহূর্তে আটকে নেই। হেলিকপ্টার শট, বিদ্যুৎগতির স্টাম্পিং কিংবা অবিশ্বাস্য ফিনিশিং- এসবে ধোনি বদলে দিয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের মানসিক কাঠামো। একসময় চাপের মুহূর্তে ভারতীয় দলকে ভেঙে পড়তে দেখা যেত। ধোনির অধীনে সেই আতঙ্ক যেন হারিয়ে যায়। ম্যাচ যত কঠিন হয়েছে, তিনি তত শান্ত থেকেছেন।
ধোনির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিস্থিতিকে কখনও আবেগের নিয়ন্ত্রণ নিতে না দেওয়া। ব্যাটার হিসেবেও সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নিয়েছিলেন তিনি। তরুণ ধোনি ছিলেন বিস্ফোরক শক্তির প্রতীক। পরিণত ধোনি হয়ে ওঠেন হিসেবি, ধৈর্যশীল এবং কৌশলী। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তিনি বুঝেছিলেন- শুধু আক্রমণ নয়, ম্যাচ জিততে বিকল্প বাঁচিয়ে রাখাও জরুরি।
আজকের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট যেখানে প্রতি বলেই আগ্রাসন চায়, সেখানে ধোনি যেন অন্য এক যুগের প্রতিনিধি। তিনি সময়কে ব্যবহার করতেন কৌশল হিসেবে, চাপকে জমতে দিতেন প্রতিপক্ষের ওপর।
ধোনির উত্থানও ভারতীয় ক্রিকেটকে বদলে দেয় ভিন্নভাবে। রাঁচি থেকে উঠে এসে ভারতের অধিনায়ক হওয়া তখনও বিরল ঘটনা ছিল। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, নেতৃত্বের কেন্দ্র শুধু মুম্বাই বা দিল্লিতে সীমাবদ্ধ নয়।
সিএসকেতেও তার প্রভাব ছিল গভীর। দলটি ধীরে ধীরে ধোনির ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের প্রতি আস্থা, স্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা- এসবই হয়ে ওঠে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির পরিচয়। অন্য দলগুলো যখন বারবার বদলে গেছে, সিএসকে থেকেছে একই দর্শনে।
তবে শেষ অধ্যায়ে একটা বিষণ্নতা ছিলই। ধোনি ক্রমশ পূর্ণ ইনিংসের বদলে হয়ে উঠেছিলেন মুহূর্তের ক্রিকেটার। দর্শকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন তার কয়েক মিনিটের ব্যাটিং দেখার জন্য। একটি ছক্কাই হয়ে উঠত পুরো ম্যাচের আবেগ।
হয়তো তিনি আবার ফিরবেন। হয়তো এই অনুপস্থিতি সাময়িক। কিন্তু যদি সত্যিই শেষ ম্যাচটা অজান্তেই পেরিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলেও সেটি ধোনির ক্যারিয়ারের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানানসই। নিঃশব্দ, সংযত, অথচ গভীরভাবে স্মরণীয়।
অনিক/